রাত্রির নিঃসঙ্গতায় দুশ্চিন্তার সীমা রইল না। রাস্তাতেই সব চুকে না যায়। আজকাল তো একটা-দুটো নয়, গোটা রেলগাড়ির সমস্ত লোককেই কেটে ফেলছে। পঞ্চাশ বছর ধরে রক্ত ছেঁচে ছেঁচে ক্ষেত আবাদ করেছে লোকে। আর, আজ তারা দেশ থেকে তাড়া খেয়ে পড়ি-কি-মরি করে নতুন জমির সন্ধানে বেরিয়ে পড়েছে। এই চারাগুলোর ভাগ্যে নতুন জমি জুটবে কিনা, কে জানে! শুকিয়ে তো যাবে না চারাগুলো! এরা দেশ-কাঙাল। ছোট বউয়ের তো খোদার মর্জি যখন-তখন। কোনো জঙ্গলেই প্রসব হয়ে যায় কিনা, কে জানে! ঘরবাড়ি, চাকরি-বাকরি, ব্যবসা-বাণিজ্য– সবকিছু ছেড়ে চলে গেছে ওরা। নতুন দেশে চিল-কাকে কিছু রাখলে হয় আবার! নইলে ওদেশের মুখখানা দেখেই ফিরে আসবে। তারপর ফিরে এসে নতুন করে শেকড় গাড়বার সুযোগ পায় কি না পায়। বসন্ত ফিরে আসতে আসতে এই বুড়ো গুঁড়িতে জান থাকবে কিনা, তাই-বা কে বলতে পারে!
পাগলের মতো দেয়ালে আর দরজার কোণায় হেলান দিয়ে বসে উলটে-পালটে কত কথাই যে দুজনে বললেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে! তারপর শ্রান্ত হয়ে গা এলিয়ে দিলেন। কিন্তু ঘুম আসে কই? সারারাত জোয়ান ছেলেদের কাটা লাশ, কাঁচা বয়েসী বউদের আহাজারি আর নাতি-নাতনির ছিন্নভিন্ন দেহ দেখে মা’র জরাগ্রস্ত শরীরটা থরথর করে কাঁপতে লাগল। এরই মধ্যে কখন জানি তন্দ্রা এসে পড়েছিল। হঠাৎ মনে হল, দরজার সামনে সারাদিনের হাঙ্গামা ভেঙে পড়ল বুঝি-বা। প্রাণের মায়া নাই-বা থাক। তবু, তেলহীন প্রদীপও নিভবার আগে একবার কেঁপে ওঠেই। সাদাসিধে মরণই বা কী এমন স্বাদের জিনিস। তার উপর আবার মানুষের প্রেত হয়ে আসে! শুনেছি, বুড়িদেরও চুল ধরে রাস্তার ওপর হেঁচড়ে নিয়ে বেড়ায়। এমনকি, ছাল ছড়ে গিয়ে হাড় বেরিয়ে পড়ে। তারপর যে আজাবের কথায় দোজখের ফেরেশতারও মুখ শুকিয়ে যায়, পথের উপরেই সেই আজাব নেমে আসে।
ঘন ঘন টোকার আওয়াজ উঠছে দরজায়। মালেকুল-মউতের তাড়াতাড়ি পড়েছে যে! তারপর, আপনা-আপনিই সমস্ত ছিটকিনি খুলে গেল, বাতিগুলো জ্বলে উঠল এবং দূরে কোন অতল থেকে কার যেন আওয়াজ এল। বোধহয়, বড় ছেলে ডাকছে। না, এ ছোট্ট সেজো ছেলের ডাক। আর এক জগতের শূন্য কোনো কোণ থেকে ডাক আসছে।
তাহলে পেয়েছে সবাই দেশ? এত শিগগির? এখানে সেজো ছেলে, তারপর ছোটটি। পরিষ্কার দাঁড়িয়ে আছে। কোলে ছেলে নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে বউয়েরা। তারপর হঠাৎ সারা বাড়ি প্রাণ ফিরে পায়। সমস্ত প্রাণ জেগে উঠে দুখিনী মা’র চারপাশে ভিড় করে দাঁড়ায়। ছোট-বড় হাত ভালোবাসায় দুলতে থাকে। সহসা শুকনো ঠোঁটে ছোট ছোট কুঁড়ি ফুটে ওঠে। পরিপূর্ণ আনন্দে সারা চেতনা আত্মহারা হয়ে অন্ধকারে পাক খেতে খেতে তলিয়ে যায়।
চোখ যখন খুলল, কব্জিতে পরিচিত আঙুল নড়ে বেড়াচ্ছে।
: ও ভাবী, আমায় এমনি ডেকে পাঠিও, আমি চলে আসব। এরকম ঢং কর কেন? পর্দার আড়াল থেকে রূপচাঁদজি বলে চলেছেন।– আর, ভাবী, আজ ফি দিয়ে দাও তো। এই দেখ, তোমার কুপুত্তুরদের কলোনি জংশন থেকে ধরে এনেছি। পালাচ্ছিল, বদমাশের দল কোথাকার! পুলিশ-সুপারিন্টেন্ডেন্টকেও বিশ্বাস করছিল না।
আবার জরাগ্রস্ত ঠোঁটে কুঁড়ি ফুটে উঠল। মা উঠে বসলেন। কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন তিনি। তারপর রূপচাঁদজির লোলচর্ম হাতের উপর দুটি উষ্ণ মুক্তাবিন্দু ঝরে পড়ল।
অনুবাদ : আতোয়ার রহমান
খানবাহাদুর – আয়াজ আস্মি
সায়েবদের প্রতি, সায়েবি ভাষার প্রতি, এমনকি যেসব জিনিস রঙে সাদা, তাদের প্রতি একটা গভীর টান ছিল নুরুল হুদার। বন্ধুরা তাঁকে বলতেন, ‘যেহেতু ওঁর নিজের চামড়ার রং একেবারে নিকষ-কালো, তাই সাদা রঙের এত ভক্ত উনি।’
সায়েবদের প্রতি তাঁর ভালোবাসার হেতু গায়ের রং কালো হওয়া ছাড়া আর কিছু থাক বা না-ই থাক, গাঁয়ের লোকেরা কিন্তু পাকাপাকিভাবে একথাটা জেনে নিয়েছিল যে, চৌধুরী সাদা-চামড়াঅলাদের প্রেমে অন্ধ হয়ে গেছেন। কথা বলতেন তিনি মাতৃভাষাতেই, কিন্তু ঢংটা ছিল সায়েবি। শিক্ষাগত যোগ্যতা ‘শ্যুড্’ ‘উ্যড’-এর সীমানা পেরোতে পারেনি ঠিকই, কিন্তু কথা বলার সময় ‘ইয়েস’ ‘নো’ ‘থ্যাংকিউ’ ‘সরি’ ইত্যাদি কথার ঘন ঘন প্রয়োগে তিনি পারদর্শিতা অর্জন করেছিলেন। তাঁর পড়ার ঘরে ইংরেজ লেখকদের রাশি রাশি বই পরম যত্নে সাজানো থাকত। এগুলোর দিকে নজর পড়লেই নুরু চৌধুরীর ছাতি যেন ফুলে উঠত। এইসব গ্রন্থের রচয়িতা যেন তিনি নিজেই।
নুরু চৌধুরীর শোবার ঘরে বিলিতি লর্ড এবং সম্রাটদের খোদাই করা প্রতিকৃতি আর ছবি ছিল। সম্রাট ষষ্ঠ জর্জের মস্ত এক মূর্তি তাঁর ঠিক শিয়রের ওপর থাকত। আরেকটা বিরাট ছবির নিচে চমৎকার অক্ষরে লেখা ছিল– ‘গড় সেভ্ দি কিং!’ ছবিটা এমন জায়গায় টাঙানো ছিল যে, সকালে ঘুম ভাঙতেই বিছানার উপর চোখ মেলে নুরু চৌধুরীর দৃষ্টি ঠিক ছবিটার ওপর পড়ত। নুরু চৌধুরী ইংরেজ লেখকদের বহুতর বাণী মাতৃভাষায় তর্জমা করে মুখস্থ করে রেখেছিলেন। আলাপ-আলোচনার সময় এগুলো যুৎসইভাবে প্রয়োগ করতেন তিনি।
নুরু চৌধুরীর এইসব গুণপনা নিয়ে গাঁয়ে প্রায়ই আলোচনা চলত; কিন্তু যেদিন তিনি সদরে হাকিমের কাছে খবর পাঠিয়ে লতিফ আর শব্বিরকে গ্রেফতার করালেন, সেদিন তাঁর নাম প্রতিটি শিশুরও মুখে মুখে ফিরতে লাগল।
