কিন্তু মা চুপ করে রইলেন। তাঁর মুখখানা আগের থেকে আরো ক্লান্ত দেখাতে লাগল। যেন কত-শত বছর পাতি পাতি করে দেশ খুঁজে বেড়াবার পর ক্লান্ত হয়ে এসে বসে রয়েছেন এবং সেই খোঁজাখুঁজি করতে গিয়ে নিজেকেও হারিয়ে ফেলেছেন।
কত কী এল, গেল। কিন্তু মা নিজের জায়গাটি আঁকড়ে বসে রইলেন। ঠিক যেমন করে বটের শেকড় দাঁড়িয়ে থাকে ঝড়-তুফানের মধ্যে।
কিন্তু যখন ছেলেমেয়ে, বউ-জামাই, নাতি-নাতনির পুরো দলটি বড় ফাটক পার হয়ে পুলিশ-পাহারায় লরিতে উঠতে লাগল, তখন তাঁর বুকখানা খানখান হয়ে গেল। অধীর দৃষ্টিতে অসহায়ভাবে ওপারের দিকে তাকালেন তিনি। দুখানা বাড়ির মাঝখানে শুধু একটি রাস্তার ব্যবধান। কিন্তু ওধারের বাড়িখানা এত দূরে বলে মনে হল, যেন দূর দিগন্তে ভাসমান একফালি মেঘ। রূপচাঁদজির বারান্দা খাঁ খাঁ করছে। দুই-একবার ছেলেপুলে বাইরে এল। কিন্তু হাত ধরে টান দিয়ে ভেতরে নিয়ে যাওয়া হল তাদের। তবু, মা’র ছলছল চোখদুটি দরজার ফাঁক আর চিকের আড়ালের বিষণ্ন চোখগুলো দেখে ফেলল। লরিগুলো যখন দলবল নিয়ে ধুলো উড়িয়ে রওনা হয়ে গেল, তখন বাম দিকের নিষ্প্রাণ চিকটির দীর্ঘনিশ্বাস পড়ল। দরজা খুলে চোরের মতো দৃষ্টিতে সামনের শূন্য, নিস্তব্ধ বাড়িটার দিকে তাকিয়ে ভারি পায়ে রূপচাঁদজি বেরিয়ে এলেন।। ধুলোর মেঘের মধ্যে হারানো মূর্তিগুলো খুঁজলেন তিনি কিছুক্ষণ। তারপর তাঁর ব্যর্থ দৃষ্টিটা অপরাধীর মতো নিঝুম দেয়ালে প্রত্যাহত হয়ে ফিরে এসে মাটিতে গিয়ে লুটিয়ে পড়ল।
সারাজীবনের সঞ্চয় খোদার দয়া এবং অনুগ্রহের ওপর ছেড়ে দিয়ে মা যখন নিঝুম বারান্দাটায় এসে দাঁড়ালেন, তখন বৃদ্ধ মনটা ছোট্ট শিশুর মতো ভয়ে কুঁকড়ে গেল। যেন চারদিক থেকে ভূত এসে গলা টিপে ধরবে। টলতে টলতে তিনি থাম ধরে নিজেকে সামলে নিলেন। সামনের দিকে চাইতেই প্রাণটা পাঁজরে আছড়ে পড়ল। এই ঘরটিতেই তো তিনি নববধূরূপে স্বামীর স্নেহময় কোলে লাফিয়ে এসে উঠেছিলেন। এইখানেই তো কাঁচা বয়েসের ভীরু-চোখ আপনভোলা বধূর চাঁদের মতো মুখ থেকে ঘোমটা সরিয়ে সারাজীবনের জন্যে দাসখত লিখে দিয়েছিলেন। সামনের দিকের ওই ঘরটায় প্রথম মেয়ের জন্ম হয়েছিল। বড় মেয়ের স্মৃতি অকস্মাৎ তীর হয়ে তাঁর অন্তরে গিয়ে বিঁধল। ওই কোণের দিকটায় তার ফুল পোঁতা রয়েছে। একটি নয়, দশটি। দশটি রুহ এইখানেই প্রথম নিশ্বাস ফেলেছিল। দশটি রক্তমাংসের মূর্তি, দশটি কাহিনী এই পবিত্র ঘরেই জন্ম নিয়েছিল। এই পবিত্র জঠর থেকে, যে-জঠর ছেড়ে আজ ওরা চলে গেছে। যেন তিনি পুরনো খোলস, সে-খোলস কাঁটায় আটকে রেখে তরতর করে সরে গেছে ওরা। গেছে শান্তির সন্ধানে, টাকায় চার সের গমের আশায়। কচি কচি সেই প্রাণগুলোর মধুর কলধ্বনি যেন কামরাটিতে এখনো গুঞ্জরিত হচ্ছে। লাফ দিয়ে তিনি কোল বাড়িয়ে কামরাটির দিকে ছুটে গেলেন। কিন্তু কোল ভরল না। যে-কোল এয়োতিরা ভক্তি ভরে ছুঁয়ে ছুঁয়ে পেটে হাত ঠেকাত, সে-কোল আজ শূন্য। শূন্য ঘরটা খাঁ খাঁ করছে। আতঙ্কিত হয়ে মা ফিরে এলেন। কিন্তু মনের সন্দেহ আর মেটাতে পারলেন না। টলতে টলতে তিনি অন্য ঘরে চলে গেলেন। এইখানেই তো জীবনের সাথি পঞ্চাশটা বছর কাটিয়ে চোখ বুজেছিল। তার কাফন-পরানো লাশ এইখানেই দরজার সামনে রাখা হয়েছিল। বাড়ির সমস্ত লোক তার চারদিক ঘিরে দাঁড়িয়ে ছিল। তার নসিবের জোর ছিল, আপনজনদের মাঝখানে গিয়ে পৌঁছেছে। কিন্তু জীবনের সাথিকে সে ফেলে গেছে। জীবনের সাথি তার আজ কাফনহীন লাশের মতো লা-ওয়ারিশ হয়ে পড়ে রয়েছে। পা দুখানা আর চলে না। বাবা যেখানে মারা গিয়েছিলেন, সেইখানটিতেই বসে পড়লেন মা। দশটি বছর তিনি এক কম্পিত হাতে মৃতের জায়গায় শিয়রে বাতি দিয়ে এসেছেন। কিন্তু আজ বাতির তেল ফুরিয়ে গেছে। বাতিও গেছে নিভে।
সামনে রূপচাঁদজি নিজের বাড়ির বারান্দায় জোরে জোরে পায়চারি করে বেড়াচ্ছিলেন। তিনি একবার গালাগালি দেন, তারপর আবার জোরে জোরে পায়চারি করতে থাকেন। সবাইকে গালাগালি দিচ্ছেন তিনি। নিজের স্ত্রী, ছেলেমেয়ে, চাকর-বাকর, সরকার, সামনে প্রসারিত মূক রাস্তাটি, ইট-পাথর, ছুরি-চাকু– এমনকি গোটা সৃষ্টিই তাঁর গালাগালির বোমাবাজির সামনে ভয়ে কুঁকড়ে পড়ে রয়েছে। বিশেষ করে গাল দিচ্ছেন তিনি রাস্তার ওপারের খালি বাড়িটিকে। সে যেন তাঁকে মুখ-ভ্যাঙচানি দিচ্ছে, যেন তিনিই নিজের হাতে এর এক-একখানা ইট ভেঙে ফেলেছেন। কী একটা জিনিস যেন মন থেকে ঝেড়ে ফেলতে চাইছেন তিনি। সমস্ত শক্তি প্রয়োগ করে তিনি তাকে টেনে বার করে ফেলতে চাইছেন। কিন্তু না পেরে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠছেন। পারিবারিক সম্পর্কের রূপে যে জিনিসটি তাঁর ভেতর দৃঢ়মূল হয়ে বসে গেছে, সর্বশক্তি প্রয়োগ করে তাকে ধরে টানছেন তিনি। কিন্তু সেই সাথে যেন তাঁর মাংসও ছিঁড়ে চলে আসছে, আর, তিনি আর্তনাদ করে উঠে টান ছেড়ে দিচ্ছেন। তারপর হঠাৎ তাঁর গালাগালি বন্ধ হয়ে গেল। মোটর নিয়ে তিনি বেরিয়ে গেলেন।
রাত্তিরে গলির মোড়টা নিস্তব্ধ হয়ে গেলে রূপচাঁদজির স্ত্রী খাবারসুদ্ধ দুখানা থালা ওপরে-নিচে করে সাজিয়ে খিড়কি দরজা দিয়ে চোরের মতো ভেতরে এসে ঢুকলেন। দুই বৃদ্ধাই নির্বাক। দুজনে মুখোমুখি বসে পড়লেন। মুখ বন্ধ রইল, চোখই সবকিছু বলতে আর শুনতে লাগল। থালা দুখানার খাবার যেমন ছিল, তেমনি পড়ে রইল। মেয়েরা কারো নিন্দে করতে বসলে জিভ চলতে থাকে কাঁচির মতো। কিন্তু মনে আবেগ এলেই মুখে তাদের তালা পড়ে যায়।
