মেজো বউ শীলা ও বাড়িতে এলে দাইয়ের ঝঞ্ঝাটও চুকে গেল। বেচারি হাসপাতাল থেকে পালিয়ে পালিয়ে আসত। ফিস তো দূরের কথা, উল্টে ছয় দিনের দিন কোর্তা আর টুপি নিয়ে এল।
.
কিন্তু আজকে যখন ছাব্বা মারামারি করে এল, তখন তার সংবর্ধনাটা এমনি হল, যেন গাজি পুরুষ লড়াই জিতে এসেছে। সবাই খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে তার বীরত্বের কথা শুনতে লাগল। অনেকগুলো গলার সামনে মা’র গলা চুপ হয়ে রইল। আজ থেকে নয়, পনেরোই আগস্ট থেকে– যেদিন ডাক্তারবাবুর বাড়িতে তিরঙা ঝাণ্ডা, আর, আমাদের বাড়িতে লীগের ঝাণ্ডা ওড়ানো হয়, সেইদিন থেকেই মা’র মুখ বন্ধ হয়ে গেছে। এই দুটি ঝাণ্ডার মাঝখানে মাইলের পর মাইল প্রসারিত উপসাগর এসে দেখা দিয়েছে। চিন্তিত দৃষ্টিতে তার ভয়ঙ্কর গভীরতাটা দেখে দেখে মা কেঁপে ওঠেন। তারপর এল শরণার্থীর জোয়ার। বড় বউয়ের বাপের বাড়ির লোকজন যখন ভাওয়ালপুর থেকে মালপত্র লুটারুর হাতে খুইয়ে এবং কোনোরকমের প্রাণ বাঁচিয়ে এসে উঠল, তখন উপসাগরের মুখ প্রশস্ত হয়ে গেল। তারপর, রাওয়ালপিণ্ডি থেকে যেদিন নির্মলার শ্বশুরবাড়ির লোকজন আধমরা অবস্থায় এসে পৌঁছল, সেদিন এই উপসাগরে অজগর ফোঁস ফোঁস করতে লাগল। ছোট ভাবী ছেলের পেট দেখাতে পাঠালে শীলা বউদি অমনি চাকরকে হাঁকিয়ে দিলেন।
এ ব্যাপার নিয়ে কেউ তর্কবিবাদ করল না। সারা বাড়ির রোগ হঠাৎ সেরে গেল। বড় ভাবি হিস্ট্রিরিয়ার মূর্ছা ভুলে ঝটপট বিছানাপত্র বাঁধাছাঁদা শুরু করে দিলেন।
: আমার ট্রাঙ্কে তোমরা হাত দিও না।– অবশেষে মা’র মুখে কথা ফুটল। সবাই হকচকিয়ে গেল।
বড় ভাই তিক্ত স্বরে বললেন, আপনি যাবেন না নাকি?
: তওবা! আমি সিন্ধুতে মরতে যাব? আল্লার গজব পড়ুক ওদের ওপর। পর্দা-পুশিদার ধারও ধারে না ওরা।
: তাহলে সেজোর কাছে ঢাকায় চলে যান।
সেজো মামি-শাশুড়ি খোঁটা দিলেন, উনি কেন ঢাকায় যাবেন? বললেন, হতচ্ছাড়া বাঙালিরা হাত দিয়ে চটকে চটকে ভাত খায়।
খালা-মা বললেন, তাহলে রাওয়ালপিন্ডি চল ফরিদার ওখানে।
: তওবা! আল্লাহ পাক যেন পাঞ্জাবিদের হাতে কারো গোরের মাটি নাপাক না করায়।
মুখে তো জাহান্নামিদের ভাষা।– আজ স্বল্পবাক মা পটপট করে বলে যান।
: ওপরেও চিতাবাঘ, নিচেও চিতাবাঘ, বোম্বাই তোমার বাড়ি নয়, তোমার তো হল, বুবু, সেই বিত্তান্ত। আরে বোন, এ যে কাঠবেড়ালের মতো খুঁতখুঁতানি! বাদশাহ ডাক দিল তো ‘কী করি, কী করি!’ হাতি পাঠাল তো ‘ছি, ছি, এ যে কালো!’ ঘোড়া পাঠাল তো ‘ছি, ছি, এ তো পিছাড়া মারে!’…
করুণ পরিবেশ। তবু সবাই হো হো করে হেসে উঠল। মা’র মুখখানা আরো গম্ভীর হয়ে গেল।
ন্যাশনাল গার্ডের সর্দারে-আ’লা বললেন, কী ছেলেমানুষের মতো কথা বলছেন! মাথাও নেই, মুণ্ডুও নেই। ইচ্ছেটা কী? এখানে থেকে ছুরি খেয়ে মরবেন?
: তোমরা যাও। আমি এখন কোথায় যাব? আমার শেষ সময়।
: তাহলে শেষ সময়ে কাফেরদের হাতে ধোলাই হবে!– খালা-মা বলেন।
খালা-মা পোঁটলা-পুঁটলি গুণে চলেছেন। পোটলার মধ্যে সোনা-রুপোর গয়নাগাটি থেকে শুরু করে হাড়ের মাজন, শুকনো মেথি এবং মুলতানি মাটি পর্যন্ত রয়েছে। এইসব জিনিস এমনভাবে বুকে ধরে যাচ্ছেন, যেন পাকিস্তানি স্টার্লিং-ব্যালান্স কম হয়ে যাবে এগুলো না গেলে। বড় ভাই তিনবার চটে উঠে তাঁর পুরনো চাদরের পোঁটলাগুলো ফেলে দিলেন। কিন্তু খালা-মা এমনভাবে আর্তনাদ করে উঠলেন, যেন এ দৌলত না গেলে পাকিস্তান গরিব থেকে যাবে। বাধ্য হয়ে ছেলেপুলের পেশাবে-ভেজা গদির তুলোর পোঁটলা বাঁধতে হল, বাসন-কোসন বস্তায় ঢুকল, খাটের পায়া-কাঠামো খুলে খাটেরই দড়ি দিয়ে বেঁধে নেয়া হল। দেখতে দেখতেই সাজানো-গোছানো সংসার বাঁকা-ট্যাড়া গাঁঠরি-বোঁচকায় রূপান্তরিত হয়ে গেল। যেন সমস্ত জিনিস আপনা-আপনি বাঁধাছাঁদা হয়ে নেচে-কুঁদে বেড়াচ্ছে। একটুখানি জিরোতে বসেছে এবার। এক্ষুনি আবার উঠে নাচ শুরু করে দেবে।
কিন্তু মা-র ট্রাঙ্ক যেমন ছিল, তেমনি পড়ে রইল।
শেষে ভাই বললেন, আপনার যদি এখানে মরবার ইচ্ছে থাকে, তাহলে আর কে ঠেকাতে পারে!
সরলদর্শন, আপনভোলা মা শূন্য-দৃষ্টিতে ঘোলাটে আকাশের দিকে চেয়ে রইল। বুঝি-বা নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করতে লাগলেন, কে মারবে? কখন?
মেজো ভাই ফিসফিস করে বললেন, মা’র বুদ্ধিসুদ্ধি শেষ হয়ে গেছে। এ-বয়েসে মাথার ঠিক নেই।
: কাফেররা নির্দোষ মানুষের ওপর আরো বেশি করে অত্যাচার করে। তা উনি কী জানবেন! নিজের দেশ হলে জানমাল নিরাপদ থাকবে।
স্বল্পবাক্ মা’র মুখে যদি জোর থাকত, তাহলে নিশ্চয়ই বলতেন, নিজের দেশ আবার কোন চিজের নাম? ওগো, তোমরা বল তো, কোথায় সেই নিজের দেশ? যেখানকার মাটিতে জন্ম নিলাম, যেখানে গড়াগড়ি দিয়ে মানুষ হলাম, সেই দেশই যখন নিজের দেশ হল না, তখন যেখানে দুদিনের জন্যে গিয়ে বাস করব, সে নিজের দেশ হবে কী করে? তারপর, ওখান থেকে যে আবার কেউ তাড়িয়ে দেবে না, তাই-বা কে জানে! বলতে থাক তোমরা নতুন দেশ বানানোর কথা। আমি এখানে বসে আছি শেষ রাত্তিরের বাতিটা হয়ে। একটুখানি দমকা বাতাস এলে হয়। ব্যস, দেশের কথা খতম। দেশ ধ্বংস করবার আর বানানোর এই খেলাও তো এমন কিছু মিষ্টি বস্তু নয়। একদিন মোগলরা নিজের দেশ ছেড়ে নতুন দেশে এসে উঠেছিল। আজ আবার চল নতুন দেশে। দেশ তো নয়, পায়ের জুতো। একটু পুরনো হল কি, দাও ছুঁড়ে ফেলে, আর-এক জোড়া পায়ে ঢুকিয়ে নাও।
