প্রতিক্রিয়া নেই। শ্রবণ-প্রতিবন্ধীর মতো নির্বিকার রইল বাচ্চাটা।
হয়ে গেছে! ছবির নিচে নিজের নামটা সই করল। আয়ান। কাগজটা ঘাসের উপর রেখে তার উপরে রাখল ও কফি-কালারের ক্রেয়নটা। উঠে দাঁড়িয়ে চাপড় মারতে লাগল। প্যান্টের পিছনে। আসি, কেমন? দেখা হবে আবার।
আলাপরত আয়মান আর এলিজার সঙ্গে মিলিত হতে চলল ও।
আয়ানের রেখে যাওয়া ছবিটা মাটি থেকে তুলে নিল রুফাস। ক্যারিকেচার করে আঁকা একটা পোর্ট্রেট। দাঁত বের করে থাকা চেহারাটা নিজের বলে চিনতে পারল ছেলেটা।
…ওই ঘটনার পর একটা কথাও বলেনি আমার বাচ্চাটা, এলিজা বলছে, শুনতে পেল আয়ান। ইভেন আমার সাথেও না।
এক ধরনের পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস, বলল ও মেয়েটার মুখোমুখি হয়ে। আবছা ভাবে মাথা নাড়ল ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে। বোঝাল, কাজ হয়নি।
নড় করল এলিজা। হা… ডাক্তারও তা-ই বলেন… শকটা কাটিয়ে উঠলে নাকি ঠিক হয়ে যাবে সব কিছু…
অবশ্যই ঠিক হয়ে যাবে, ভরসা দিল আয়ান। ছোট মানুষ তো, এজন্য একটু সময় লাগছে। দেখবেন- থেমে যেতে হলো ওকে জ্যাকেটের ঝুলে টান পড়ায়। তাকিয়ে দেখে- রুফাস।
হ্যাঁ, রুফাস?
খাতা থেকে ছেঁড়া একটা ছবি ওর দিকে বাড়িয়ে ধরল বাচ্চাটা। আগেই আঁকা ছিল এটা।
নিল আয়ান ছবিটা। আমার জন্য?
উত্তর না দিয়ে এক দৌড়ে আগের জায়গায় ফিরে গেল ছেলেটা।
নয়
প্রবল শোকও এক সময় ফিকে হয়ে আসে পেটের খিদের কাছে। জিউস অ্যানিসটনকে তাই এখন জোগাড়যন্ত্র করতে হচ্ছে রাতের খাবারের।
কিচেন-সিঙ্কে ভালো করে ধুয়ে নিল ও মাছটা। ওটাকে বেসিনের পাশে ট্রেতে রেখে চাকুটা তুলে নিল হাতে ট্যাপটা বন্ধ করল না। অবিরল ধারায় অপচয় হতে লাগল পানি।
মাছের মাথাটা কেটে আলাদা করেছে, এসময় সোঁদা একটা গন্ধ ছড়িয়ে পড়তেই খেয়াল করল ছেলেটা, বদলে গেছে ট্যাপের পরিষ্কার পানি। শেওলা-সবুজ রং ধরেছে এখন।
হয় অনেক সময় এরকম। আধ মিনিট অপেক্ষা করার পরেও যখন স্বাভাবিক হয়ে এল না পানি, চাবি টিপে বন্ধ করে দিল ট্যাপটা।
কিন্তু সেকেণ্ড কয়েক বাদেই আরেক বিপত্তি। ভলকে ভলকে ময়লা পানি উঠতে লাগল সিঙ্কের ফুটোটা দিয়ে! এ ঘাবড়ে গেল জিউস। এ আবার কোন্ ধরনের সমস্যা! কালচে পানিতে ভরে যাচ্ছে বেসিন, এক হাতের হাতা টেনে কনুইয়ের উপরে তুলে ফেলল ফুটোয় প্লাগ-চাপা দেয়ার জন্য। নোংরা পানিতে ডুবে থাকায় দেখতে পাচ্ছে না ওটা।
গলগল করে উপচে উঠছে পানি। ছিটে এসে লাগছে। জিউসের চোখে-মুখে। এরই মধ্যে আধা-আধি পরিমাণ এসেছে বেসিনটা। দুধের সরের মতো ভাসছে ফেনা পানির উপরে।
মুখখানা বিকৃত করে হাত ডোবাল ও পানির মধ্যে।
দশ
হলফ করে বলতে পারি এবার, নেসি কিংবা চ্যাম্প না আমাদের কালপ্রিট! তুবড়ির মতো কথাগুলো বেরিয়ে এল আয়ানের মুখ দিয়ে।
মরনিং-ওঅকে বেরিয়েছিল। মিনিট দশেকও হয়নি, মাথায় উঠেছে প্রাতঃভ্রমণ। ছুটতে ছুটতে ফিরে এসেছে মোটেলে। ধড়াম করে দরজা খুলে ঢুকেছে কামরায়। মাত্রই ঘুম থেকে উঠে ফেসবুকে বসেছিল আয়মান, চমকে গিয়ে আধহাত লাফিয়ে উঠল চেয়ারে।
আস্তে! আস্তে! ভাইয়ের উপরে খিঁচড়ে উঠল আয়মানের মেজাজটা। সুস্থির হয়ে বল, কীসের তাড়ায় ফিরে এলি!
জিউস!
কোন্ জিউস? হারকিউলিসের বাপটা?
রসিকতা রাখ! অবস্থা কিন্তু সিরিয়াস!
আরে, বলবি তো, কী হয়েছে!
মারা গেছে ছেলেটা!
কীই! বিস্ফারিত হলো আয়মানের দৃষ্টি।
হ্যাঁ। যাচ্ছিলাম পুলিস-স্টেশনের পাশ দিয়ে। সাতসকালে ওদের অস্বাভাবিক কর্মচাঞ্চল্য দেখে কৌতূহল হলো। পেয়ে গেলাম শেরিফকে। সারা রাত ঘুমায়নি লোকটা। ওর কাছেই জানতে পেরেছি খবরটা ।
আহ! আক্ষেপ ঝরল আয়মানের কণ্ঠে। মরল কীভাবে?
ডুবে!
মাথা নাড়ছে আয়মান। যা ভেবেছিলাম…
কোথায় ডুবেছে, জানতে চাইলি না?
লেকের পানিতে না?
ওখানেই তো রহস্য প্যাঁচ খেয়ে গেছে, ভ্রাতা!
তা হলে কোথায়?
কিচেনের সিঙ্কে!
হোয়াট!? কেউ যেন চড় কষিয়েছে আয়মানকে।
বেসিন ভর্তি পানিতে চেপে ধরা হয়েছে মুখটা! সেজন্যই তো বলছি, নেসি-ফেসি নিয়ে কারবার না আমাদের!
কিন্তু… কিন্তু… এটা তো তা হলে মার্ডার!
এগারো
অ্যানিসটনদের বাড়ি আর থানা- চোখের পলকে উড়ে গেল। যেন সকালটা। নিজেদের গাড়ি নিয়ে ঘুরল ওরা এরপর এদিক-সেদিক। সূত্র পাওয়ার আশায় জায়গায় জায়গায় থেমে জিজ্ঞাসাবাদ করল কয়েকজনকে।
লাভ হলো না বিশেষ।
শেষ পর্যন্ত আশার আলো দেখাল লাল-সাদার কমবিনেশনে তেকোনাকৃতি এক দালানবাড়ি। ওটার সামনে, রাস্তাটার উলটো দিকে থমকে দাঁড়াল ধূসর ইমপালা।
উঁচু টাওয়ার-বিশিষ্ট স্থাপনাটাকে চিনিয়ে দিচ্ছে মিনারের মাথায় বসানো খ্রিস্টানদের পবিত্র যোগচিহ্ন।
কোথায় দেখেছি গির্জাটা, বল তো, ভাইয়া! নিজের ভিতরটা হাতড়াচ্ছে আয়মান।
গত কাল, মনে করিয়ে দিল বড় ভাই।
ওহ, ইয়েস! চটাস করে তুড়ি বাজাল ছোট জন।
রুফাসের আঁকা ছবিটায়! যেটা তোকে উপহার দিয়েছে।
আমিও ভেবেছি- উপহার। কিন্তু এখন…
কেন, ভাইয়া?
ওকে তো বললাম, সেদিন কী অভিজ্ঞতা হয়েছিল, লিখে দেয়ার জন্য। বদলে দিয়েছে ছবিটা। তার মানে কি, কোনও মেসেজ দিতে চাইছে ওটা দিয়ে?
সম্ভাবনাটা ধরতে পেরে শিরদাঁড়া সোজা হয়ে গেল আয়মানের।
