সেদিনের পর থেকে জবান একেবারে বন্ধ হয়ে গেছে। রুফাসের, ব্যাখ্যা করল কারটার। অনেক চেষ্টা করা হয়েছে… একটা শব্দও উচ্চারণ করেনি বাচ্চাটা।
সাত
অদ্ভুত! নিজের মনে মন্তব্য করল আয়মান।
কীসে বিস্মিত হয়েছে, দেখার জন্য ভাইয়ের কাঁধের উপর দিয়ে ঝুঁকে এল অন্য জন।
লেক ম্যানিটোঅক ট্রিবিউন-এর উইণ্ডো খোলা ছোট ভাইয়ের ল্যাপটপে। ইন্টারনেট ব্রাউজ করছে ও মোটেলের ওয়াই-ফাই দিয়ে।
লেক-ট্র্যাজেডি এই তিনটাই না… আরও আছে!
কী বলিস! চেয়ারের পিঠে হাত রেখে আরও ঝুঁকল আয়মানের সহোদর।
এই যে দেখ- প্রথমটা। স্ক্রিনে আঙুল দেখাল আয়মান।
আইস-ফিশিং ফেস্টিভ্যালে বিষাদের ছায়া। প্রথম পাতার প্রধান শিরোনাম। নিচে সাব-হেড: পানিতে ডুবে ১২ বছরের শিশুর মৃত্যু।
তা দ্রুত পড়ল আয়ান খবরটা। ভালো করে দেখল নিহতের ছবি। হতভাগ্যের নাম ভিনসেন্ট মোমোয়া।
এরপুর পঁয়তিরিশ বছরে আরও ছয়টা আছে এমন ঘটনা। তফাত কেবল, প্রথম লাশটাই খালি পাওয়া গেছে, [ বাকিগুলো বেমালুম গায়েব। কোনও চিহ্ন না, কিছু না! হানড্রেড পারসেন্ট শিয়োর, কিছু আছে ওই পানির নিচে। লক নেস কিংবা লেক চ্যাম্পলেইনের মতো।
ল্যাপটপের দিকে তাকিয়ে আছে আয়ান। কিন্তু ওর মনটা চলে গেছে দূরে। ঝাপসা হয়ে গেছে কমপিউটারের পরদা। সংবিৎ ফিরে আসতেই জিজ্ঞেস করল: বাই দ্য ওয়ে… ওসব জায়গার মতো মিথ-টিথ নেই লেক ম্যানিটোঅককে নিয়ে?
সেটাও খুঁজলাম। …নাই, পাইনি এমন কিছু, বলল। আয়মান মাথা নেড়ে।
ভাবছি, কী দেখেছিল সেদিন রুফাস। ছেলেটার সাথে একবার দেখা করা দরকার।
লাভ কী? ও তো নাকি কথাই বলে না!
কথা না বললেও লিখতে পারে নিশ্চয়ই!
আঁই! এটা তো ভাবিনি, ভাইয়া! …কিন্তু… উত্তেজনাটা থিতিয়ে এল পরক্ষণে। ওরাও কি চেষ্টা করেনি?
ওদেরটা ওরা করেছে। আমরা আমাদের মতো করব। পার্কে যাবে, বলেছিল না?
আট
পার্কটা আদতে প্লেগ্রাউণ্ড। পর্যাপ্ত স্পেস রাখা হয়েছে খেলাধুলার জন্য। বিকেলের নরম রোদে দস্তুরমতো সময়টা উপভোগ করছে নানান বয়সী শিশু-কিশোররা। ছুটোছুটি, ছোঁয়াছুঁয়ি চলছে; দড়ি লাফাচ্ছে মেয়েদের দু -চারজন। বিচ্ছিরি কাঁচ-কুঁচ আওয়াজে দুললেও দোলনা নিয়ে অভিযোগ নেই কারও। স্লিপারে উঠে পিছলে নামছে কেউ মনের আনন্দে, কারও-বা আনন্দ সি-স র দুই প্রান্তে বসে উপর-নিচ করাতে। হাওয়ায় ভাসছে রং-বেরঙের ফ্রিসবি। বাদ নেই ফুটবল-ক্রিকেটও। একটু বেশি বয়সী মেয়েরা এখানে-ওখানে জমে গেছে আঁড়ায়। মেলা বসেছে যেন সবুজে ঘেরা গোল জায়গাটায়। হাসি-হুঁল্লোড়ে মুখর পরিবেশ। অভিভাবকদের বেশির ভাগই গল্প জমিয়েছে ছোট ছোট জটলা তৈরি করে। অল্প কিছু লোক টাইম পাস করছে পত্রিকা বা সেলফোনে।
এসবের মধ্যে নেই রুফাস। পার্কের ঘেসো এক অংশে উবু হয়ে বসে মগ্ন হয়ে আছে ছবি আঁকায়। হইচই কম ওদিকটায়। রোদ নেই।
এলিজা কারটারের পাশে দাঁড়িয়ে দৃশ্যটা দেখল কিছুক্ষণ আয়ান। একটু দূর থেকে ছেলের খেয়াল রাখছে ওর মা। মেয়েটার অনুমতি নিয়ে পা বাড়াল ও রুফাসের উদ্দেশে।
ভাইয়ের বদলে বিধবা তরুণীকে সঙ্গ দেয়াটাই বেটার মনে করল আয়মান। তা ছাড়া বাচ্চাদের সঙ্গে বনে না ওর খুব একটা।
হেই, চলছে কেমন? কথাটা বলেই ঝপ করে আসন পিড়ি হয়ে বসে পড়ল ইকরামুল্লাহ মাস্টার রুফাসের পাশে।
ড্রইং খাতায় এক মনে ক্রেয়ন ঘষছিল বাচ্চাটা, তাকিয়ে পর্যন্ত দেখল না। শরীরী ভাষাতেও ফুটে উঠল না কোনও পরিবর্তন। পাশে যেন অস্তিত্বই নেই কারও। ক পাশে হেলে খাতাটায় চোখ রাখল আয়ান। কী আঁকছে। এটা রুফাস? জিলাপি? এ ছাড়া মাথায় এল না অন্য কিছু। সাদা কাগজের বুকে বড়সড় এক স্পাইরাল।
নাইস, ভেরি নাইস, বোদ্ধার মতো মন্তব্য করল আয়ান। আসলেও বোধ হয় দারুণ কিছু। কালো রঙের জিলাপি! বাচ্চাটা বোধ হয় বিমূর্ত চিত্রশিল্পী হবে বড় হলে।
না, প্রশংসায় ভাবান্তর হয়নি রুফাসের।
রঙের প্যাকেটের পাশে ছড়ানো এক গাদা ক্রেয়ন থেকে বেছে নিল একটা আয়ান। কিছুটা ইতস্তত করে বলল, কাগজ হবে, রুফাস?
জবাব না দিয়ে নিজের কাজই করে চলল বাচ্চাটা।
অসহায় চেহারা হলো আয়ানের। ওকে একটুও পাত্তা দিচ্ছে না ছেলেটা।
ওকে দেন। উঠে পড়তে গেল ও। ডিসটার্ব করার জন্য এ দুঃখিত।
কাজ হলো এবারে। জিলাপি আঁকা থামিয়ে ফড়াত করে একটা পৃষ্ঠা ছিঁড়ল ছেলেটা খাতার পিছন থেকে। না তাকিয়েই বাড়িয়ে দিল ওটা আয়ানের দিকে।
থ্যাঙ্কস! থ্যাঙ্কস, এটুকুই বলতে পারল ও কাগজটা হাতে নিয়ে।
আশপাশে তাকিয়ে কোনও কিছু দেখতে পেল না আয়ান পাতাটার নিচে রাখার জন্য। আঁকার সুবিধার জন্য ভাঁজ করতে হলো ওটাকে। কাগজটা উরুর উপরে রেখে আঁচড় কাটতে লাগল ও ক্রেয়নের। কী আঁকছে, সে-ই জানে। বিন্দু মাত্র আগ্রহ দেখাল না রুফাস। জি মিনিট দুয়েক কেটে গেল নীরবে।
তোমার মনের অবস্থাটা বুঝতে পারছি, রুফাস, বলল আয়ান আঁকা না থামিয়ে। হয়তো ভাবছ, কেউ তোমার কথা বিশ্বাস করবে না। ভুল ধারণা। আর-কেউ না করুক, আমি করব। বিশ্বাস করো! কাজেই, সব কথা খুলে বলতে পারো আমাকে। …মুখে বলাটা যদি সমস্যা মনে হয়, লিখে দিলেও চলবে তা হলে… চাও না, তোমার আব্বুর মৃত্যুরহস্যের কিনারা হোক?
