এই তো… এক শ গজের ভিতরেই। এমনটাই জানি আমরা।
কোনও ধরনের আলামতই পাওয়া যায়নি? অস্বাভাবিক কোনও আওয়াজ… চিৎকার… প্রত্যক্ষদর্শী?
উম… না। আমাদের অন্তত জানা নেই। রানিং সুট-টুট খুলে পানিতে নেমেছিল। ডকের উপরে পাওয়া গেছে ওগুলো।
হুম।
এখানকার পানি নিয়ে কোনও সমস্যা নেই তো? প্রশ্ন করল আয়মান।
অবাক মনে হলো লিয়ানার ভাইকে। কী রকম?
এই আর কী… কিছু দেখা-টেখা যায় কি না পানিতে…
কী দেখা যাবে! আরও অবাক হয়েছে ছেলেটা।
হিংস্র কোনও প্রাণীর কথা ভাবছি। মাছ-টাছও হতে পারে। এরকম কিছুই হয়তো ঘাপটি মেরে আছে জলের তলায়।
আরে, নাহ! অবিশ্বাসের হাসি হেসে উড়িয়ে দিল জিউস। তবে হাসিটা নিষ্প্রাণ। পরক্ষণেই আগের মতো করুণ হয়ে উঠল মুখটা। ছোট থেকেই বড় হয়েছি এখানে। ওরকম কিছু থাকলে জানতে পারতাম।
তার পরও… স্বাভাবিক নয়, এরকম কিছু কি চোখে পড়েনি কখনও? মনে করে দেখুন তো! এই ধরুন, লেকের আশপাশে? এত তাড়াতাড়ি নিজের থিয়োরি থেকে সরে আসতে রাজি নয় আয়মান।
দপ করে আলো জ্বলে উঠল জিউসের চোখে। ঠিক কী আশা করছেন আপনারা, বলুন তো! লক নেস মনস্টার জাতীয় কিছু?
না, মানে…
বাবা কেমন আছেন আপনার? প্রসঙ্গটা ঘুরিয়ে দিল আয়ান। কথা বলা যাবে ওঁর সাথে? পত্রিকা থেকেই জেনেছে, কে-কে আছে অ্যানিসটনদের পরিবারে।
ওই তো… চোখের ইঙ্গিতে দূরের ডক দেখাল জিউস অ্যানিসটন। শীত লাগছে। শক্ত করে দু হাত বাঁধল বুকে। সেই অবস্থাতেই কাঁটা দিয়ে উঠল সারা গায়ে।– তাকাল ছেলেরা। লগ-কাঠের এক মাত্র বেঞ্চিটায় বসে আছে একলা একজন মানুষ। মেঘের পরে মেঘ জমেছে। অবেলায় আঁধার হয়ে আসছে চারপাশটা। বিবর্ণ আকাশ আর পানির ফাঁকা পটভূমিতে কী রকম নিঃসঙ্গ দেখাচ্ছে মানুষটিকে! পরাজিত, বিধ্বস্ত। মূর্তির মতো তাকিয়ে আছে। পাইনের দেয়ালের দিকে।
আব্বুকে আপাতত ডিসটার্ব না করাই ভালো, বলল পুত্র। কান্নাভেজা ঢোক গিলল ঠোঁটে ঠোঁট চেপে। বুঝতেই তো পারছেন…
মাথা দুলিয়ে সহানুভূতি প্রকাশ করল আয়ান। একটা হাত রাখল ছেলেটার কাঁধে। ঠিক আছে। পরেই কথা বলব না হয়।
পাঁচ
ঠিক বুঝলাম না। সন্দেহের ভাজ শেরিফ নিক কারটারের কপালে। বন্যপ্রাণী সংস্থার আগ্রহ কেন এই কেসে? এটা তো একটা দুর্ঘটনা।
ও ছাইরঙা হাফ-শার্টের দুই বাহুতেই সেলাই করে সাঁটা কাপড়ের ব্যাজ। কালো ঢাকনাঅলা এক জোড়া বুকপকেট উর্দিতে। বাঁ দিকের পকেটের উপরে ঝুলছে ধাতব হেক্সাগ্রাম। ডানে নামফলক। দুই পকেটের মাঝখানে ভাঁজ করা বোতামের-ঘর। বোতাম লাগানো কালো স্ট্রাপ দুই কাঁধে।
শার্টের নিচে সাদা টি-শার্ট পরেছে অফিসার। রেশমি ধূসর চুলের কাটিং প্রাচীন আমলের রোমান অভিজাতদের মতো। চেহারার আদলও তা-ই।
অ্যানিসটনদের ওখান থেকে সোজা পুলিস ডিপার্টমেন্টে চলে এসেছে দুই ভাই। দরজার মুখেই দেখা শেরিফের সঙ্গে। ইউএস ওয়াইল্ডলাইফ সার্ভিসের এজেন্ট হিসাবে পরিচয় দিতেই কুঁচকে উঠেছে আইন রক্ষকের ভুরু। এতটাই অবাক হয়েছে যে, খেয়ালেই এল না দুই তরুণের আইডি সম্বন্ধে কনফার্ম হওয়ার বিষয়টা।
অল্প পরিসর নিয়ে অফিস করা একতলা দালানটায় লোকজন নেই বললেই চলে এ মুহূর্তে। ফাঁকা পড়ে রয়েছে। কয়েকটা ডেস্ক। রিসেপশনে ফাইল চেক করছে আঁটসাঁট শার্ট পরা সুশ্রী এক মহিলা। পুরো মনোযোগ কাগজে।
অ্যাকসিডেন্টের ব্যাপারে পুরোপুরি নিশ্চিত আপনারা? আয়মানের জিজ্ঞাসা। জবাবটা গুরুত্বপূর্ণ।
আর কী হবে! অকারণেই বিরক্ত হচ্ছে কারটার।
না, মানে… কিছু যদি পানির নিচে নিয়ে যায় মেয়েটাকে,
আরও বিরক্ত হলো অফিসার। তা, সেই কিছু-টা কী?
কত কিছুই তো হতে পারে…
যেমন?
হাঙর… কুমির… তারপর ধরেন, পিরানহা…
ফিক করে হেসে ফেলল প্রৌঢ় অফিসার। রিসেপশনিস্ট মহিলার ঠোঁটেও হাসি। যুক্তি শুনে মুখ তুলে চেয়েছে প্লাসটিকের ফোল্ডার থেকে।
লেক ম্যানিটোঅকের পানিতে হাঙর! কুমির!! পিরানহা!!! কৃত্রিম বিস্ময়ে চোখ কপালে উঠেছে অফিসারের। হাবেভাবে প্রকাশ পাচ্ছে ব্যঙ্গ।
আছে, বলছি না। আই মিন, ওরকমই কিছু
না, দৃঢ় কণ্ঠে ঘোষণা করে দিল কারটার। এ ধরনের মাংসাশী প্রাণীর অস্তিত্ব নেই আমাদের লেকে। …আচ্ছা! এবার বুঝলাম আপনাদের আগ্রহের কারণটা।
জি, সংক্ষিপ্ত জবাব আয়ানের। শেরিফের পারসোনাল চেমবারে এসে বসল ওরা।
…পুরো হদ ঢুড়ে ফেলেছি আমরা, ডেস্কের ওপাশে, নিজের আসন থেকে বলল কারটার। সোনার (Sonar) দিয়েও পরীক্ষা করা হয়েছে। না, সন্দেহজনক কিছু নেই ওখানে।
কিন্তু… ব্যাপারটা কেমন না? সন্দেহের জায়গাটা টাচ করল ওরতেগা ওরফে আয়ান ইকরামুল্লাহ। একই ধরনের ঘটনা তৃতীয় বারের মতো!
থতমত খেল অফিসার। পালা করে তাকাল সামনে বসা দু জনের দিকে। হ্যাঁ, তা ঠিক… স্বীকার করল নরম গলায়।
তিনটা ঘটনাই একই রকম।
একই রকম শুধু না, একদম একই জায়গায়, সুযোগ। বুঝে চেপে ধরল আয়মান। আপনার কি মনে হয় না, বড় বেশি কাকতালীয় এই দুর্ঘটনাগুলো? দুর্ঘটনা শব্দটার উপরে বাড়তি জোর দিল ও।
পাটকেল খেয়ে কোণঠাসা অবস্থা হলো অফিসারের। যুক্তিতে হেরে গিয়ে অযথাই টেবিলের উপরে ঘোরাতে লাগল কাঁচের পেপার-ওয়েটটা।
আচ্ছা, কোনও ধরনের প্রাকৃতিক ঘূর্ণি-টুনি নেই তো ম্যানিটোঅকে? একটা সম্ভাবনা বাতলাল আয়ান। কিংবা, কোনও কারণে সৃষ্টি হতে পারে না?
