জবাবটা দিতে হলো না। দু জনেরই জানা কথাটার মানে। যমজ হলেও অমিল কম নেই দুই ভাইয়ের মধ্যে। যেমন: আয়মানের দেড় মিনিটের বড় হলেও লম্বায় খাটো ওর বড় ভাই। ছোট করে ছাঁটা চুলগুলো পাট করে রাখে জেল দিয়ে। অন্য দিকে, নিজের চুলগুলো খানিকটা বাড়তে দিয়েছে আয়মান। আঙুল দিয়েই চিরুনির কাজ চালায়। আরও আছে। একজন ক্লিনশেভড়। আরেক জন খেচা-খোঁচা দাড়িতেই স্বচ্ছন্দ। একজনের পছন্দ সফট গান। আরেক জনের ধুমধাড়াক্কা। কিন্তু একটা ব্যাপারে একই আত্মা বাঙালি দুই সহোদর। রহস্যের পোকা দু জনেই।
উত্তেজনার খোরাক পেয়েছে ওদের বেপরোয়া রক্ত।
তিন
উল্লেখযোগ্য তেমন কিছু চোখে পড়ল না পথে আসতে আসতে। ঠাণ্ডা রোদের মধ্যে এক জায়গায় দেখল, কাপড় শুকাতে দেয়া হয়েছে মেহেদির বেড়া দেয়া কোন্ বাড়ির উঠানে। পাশাপাশি ঝুলছে ব্রা আর পুরুষের আণ্ডারওয়্যার। দেখে দুষ্টু চিন্তাটাই সবার আগে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে।
শহর ছাড়িয়ে গ্রাম্য কাঁচা রাস্তায় পড়ল ওরা। নীলচে ধূসর আকাশে তখন হলদে মেঘের অক্লেশে ভেসে যাওয়া।
পিছনে ধুলোর মেঘ রেখে ছুটে চলল ইমপালা। একটা ফ্লাইওভার পড়ল পথে। ব্রিজের, এক ধারে দাঁড়িয়ে ধৈর্যের পরীক্ষা দিচ্ছে সৌখিন এক মৎস্যশিকারি। পরনে ব্যাগি। ক্রিকেট-ফিল্ডারদের মতো চওড়া কিনারাঅলা টুপি মাথায়। কাঠের রেইলের উপর দিয়ে ছিপ ফেলেছে নিচের খালে।
ব্রিজ পেরোনোর একটু পরেই দুই ধারে গাছগাছালি নিয়ে মফস্বলের পাকা রাস্তা। এক পর্যায়ে লেক ম্যানিটোঅক। কাউন্টির সীমা নির্দেশক সাইনপোস্ট অতিক্রম করল ইকরামুল্লাহ ভাইদের গাড়ি। স্থানীয় আর্টিস্টকে দিয়ে আঁকানো নীল সরোবরের এক টুকরো ছবি শোভা পাচ্ছে পুরু তক্তা দিয়ে বানানো সাইনবোর্ডে। একখানা সেইল-বোট ভাসছে ওখানে নীল পানিতে। ওটার পিছনে, দিগন্ত থেকে উঁকি। দিচ্ছে টকটকে লাল সূর্য। বাহারি হরফে আগন্তুকদের স্বাগত জানাচ্ছে সাইনবোর্ডটা।
অ্যানিসটন হাউসের আঙিনায় এসে বন্ধ হলো ইমপালার ইঞ্জিন। খুঁজে পেতে কষ্ট হয়নি বাড়িটা। একজনকে জিজ্ঞেস করতেই বাতলে দিয়েছে ঠিকানা।
জঙ্গলের কোলেই বলা যায় অ্যানিসটনদের বাসস্থান। বড় বড় গাছগুলো চেপে এসেছে তিন দিক থেকে। কী এক আগ্রহে বাড়িটার উপরে ঝুঁকে রয়েছে যেন আঁকাবাঁকা ডালপালাগুলো। ছায়া-ছায়া গাম্ভীর্য বিরাজ করছে পরিবেশে। দেখেই মনে হয়, শোক পালন করছে পরিবারটি।
জমিন থেকে হাত খানেক উঁচুতে, খুঁটির উপরে দাঁড়ানো বাড়িটা বাংলো প্যাটার্নের। সামনে-পিছনে ঢালু ছাত ইটের মতো লাল রং করা। পেরিস্কোপ ধরনের ভেন্টিলেটর রয়েছে ছাতের গায়ে। আর একেবারে মাথা ছুঁড়ে বেরিয়েছে চিমনি। সামনের দিকের ঢাল যেখানে শেষ হয়েছে, সেখান থেকে শুরু সমতল চালার। ঘাস-দূর্বা গজিয়ে গেছে ওখানটায়। নিচে কাঠের রেইল-ঘেরা পোর্চ। বারান্দাটার মাঝামাঝি অংশে সিঁড়ি নেমে গেছে বাইরে। সিঁড়িতেও রেইলিং দেয়া। তবে মূল দরজা নয় এদিকে। বাংলোর বাঁয়ে ওটা। ওদিকের পোর্চে চালার বদলে টোপর আকৃতির ছাউনি। পোর্চটাও বাঁয়ে এসে দুই ধাপ নিচু হয়েছে ডান দিকের চাইতে।
দুটো চেয়ার পাতা বারান্দার ডান দিকের অংশে। আর আছে টব, বেশ কয়েকটা।
কী পরিচয় দেবে, ঠিক করেই এসেছে ইকরামুল্লাহ ভাইয়েরা। আসল পরিচয় অবশ্যই না। নাম ফাটুক, একেবারেই চায় না ওরা। খ্যাতির তকমা একবার গায়ে লেগে গেলে মুশকিল হয়ে যায় ছোটানো। অযাচিত প্রত্যাশার চাপ এসে পড়ে তখন চারদিক থেকে। আর, রহস্যটা যদি অপ্রাকৃত হয়, মুশকিল আসানের গ্যারান্টি দেয়া তো সম্ভব না কাউকে। দৃশ্যপট থেকে বিদায় নেয়ার পর, চায় না যে, কেউ পরে খোঁজ করুক ওদের। ব্যর্থতার কারণে যেমন বিব্রত হতে চায় না, সাফল্যের জন্যও তেমনি কারও কাছে ঋণী থাকাটা পছন্দ নয়।
হাতে সময় ছিল না বলে বানাতে পারেনি নকল আইডি কার্ড- এমন কোনও সমস্যা নয় এটা। মরাবাড়িতে কেউ পরিচয়পত্র দেখতে চাইবে বলে মনে হয় না।
ফ্রন্টডোরের উপরটা গ্লাস-প্যানেল করা। জানালার মতো দরজার ওদিকেও ঝুলছে হালকারঙা কারটেন।
নক করল আয়ান কাঁচের গায়ে।
অবিন্যস্ত চুলের, আধময়লা টি-শার্ট গায়ে যে-তরুণটি দরজা খুলল; ভিজে, লাল চোখ দেখে অনুমান করা যায়, কাঁদছিল। ফুলে রয়েছে চোখ দুটো। সম্ভবত ঘুমও হয়নি রাতে। শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল আগন্তুকদের দিকে।
চার
আপনারা নিশ্চিত, উনি স্রেফ ডুবে যাননি?
প্যাণ্টের দু পকেটে হাত ভরে রেখেছে জিউস অ্যানিসটন। প্রশ্নকর্তার দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে নিয়ে তাকাল শান্ত পানির দিকে। সুদূরে হারিয়ে গেল দৃষ্টি। দমবন্ধ লাগছিল ঘরের ভিতর। আগন্তুক দুই ভাইকে নিয়ে তাই লেকের ধারে চলে এসেছে কথা বলতে বলতে। বাড়ির পিছনে একটু এগোলেই লেকটা। পাইনের বনজ গন্ধ মাখা সোঁদা ঘ্রাণ বাতাসে।
এটা এক রকম অসম্ভবই। ফের আয়ান ইকরামুল্লাহর চোখে চোখ রাখল অ্যানিসটন। অন্তত আমার বোনের বেলায়। চ্যাম্পিয়ন সাঁতারু ছিল ও ওদের কলেজের। বলতে পারেন, এই লেকের পানিতেই হেসে-খেলে বড় হয়েছে। নিজের বাথটাবে একটা মানুষ যতখানি নিরাপদ বোধ করে, এই লেক ওর কাছে ছিল তা-ই।
একমত নয় দু ভাইয়ের কেউই। পায়ে ক্র্যাম্প ধরলে দক্ষ সুইমারও অসহায় হয়ে পড়তে পারে। তবে মনোভাবটা প্রকাশ করল না সদ্য বোনহারা তরুণের সামনে। বদলে জানতে চাইল আয়ান: আচ্ছা, কত দূর পর্যন্ত সাঁতরাতেন তিনি?
