কাউকে দেখতে পাওয়ার আশা করেনি লিয়ানা। তাকাল বাঁয়ে। কেউ নেই কোথাও। কে থাকবে এত সকালে! আকাশ, পানি, বনভূমি- সমস্তই বিরান।
আর নয়। ফিরে যাবে এবার। চাপ আর নিতে পারছে না স্নায়ু। কেবলই বাতাস ভরতে শুরু করেছে ফুসফুসে, এই সময় আক্রান্ত হলো মেয়েটা। কে বা কী, চিন্তা করার আগেই পায়ের গোছে হেঁচকা টান খেয়ে চলে গেল জলের তলায়। গবগ করে বুদ্বুদ উঠল কিছুক্ষণ। তারপর সব কিছু আগের মতোই স্বাভাবিক। কিছুই ঘটেনি যেন। 7 পানি সম্বন্ধে মানব মনের গহীনে লুকিয়ে থাকা যুগ যুগান্তরের আশঙ্কা সত্যি হয়ে গেল। বারমুডা-হৌক্সের মতো লিয়ানা অ্যানিসটনকে গিলে নিয়েছে নীল পানির হ্রদ।
মালকিনের অপেক্ষায় ডকেই পড়ে রইল কাপড়চোপড়, জুতো। কখনওই ওগুলো আর নিতে আসবে না অ্যানিসটনদের মেয়েটা।
কোনও কি সাক্ষী আছে ওর অন্তর্ধানের? একজনও না।
দুই
খালি হয়ে এসেছে আয়মানের প্লেটটা। সেই সঙ্গে দ্বিতীয় বারের মতো পড়াও শেষ করল পত্রিকার খবরটা। চিন্তায় ডুবে রয়েছে।
চিন্তার সুতো ছিন্ন করল লণ্ডন নেমট্যাগধারী মেয়েটা। টেবিলের কাছে এসে দু হাতের ভর রেখে ঝুঁকল ও। আর কিছু লাগবে?
নামে লণ্ডন হলেও লণ্ডনী কন্যা নয় মেয়েটা। আমেরিকার প্রাচ্য দেশীয় অভিবাসীদের সর্বশেষ প্রজন্ম। মাঝারি উচ্চতা। কালো চুল। এ ওয়েইট্রেসের বুকের উপরে চোখ আটকে গেল। আয়মানের। ফুলতোলা যে-টপটা পরেছে মেয়েটা, সেটার। গলাটা এত বড় যে, দুই-তৃতীয়াংশই উন্মুক্ত বক্ষদেশের। সামনের দিকে ঝুঁকে থাকায় পানি ভরা বেলুন দুটোর মাঝখানে অন্ধকার খাদ দেখতে পাচ্ছে। এ ছাড়া আর কোনও উপমা মাথায় এল না আয়মান ইকরামুল্লাহর। গলার লম্বা, সোনালি চেইনের নিচের অংশটা হারিয়ে গেছে তরুণীর। বুকগহ্বরে।
আচ্ছা, কোন্ দেশি ও? চকিতে ভাবল তরুণটি। বলা মুশকিল। চিনাথাই, ফিলিপিনো… যে-কোনওটাই হতে পারে। জাপানি অন্তত না। প্রশ্নটা মনে আসার কারণ, ওই সব মেয়েদের ভাইটাল স্ট্যাটের প্রথম অংশটা খাটে না এই মেয়ের ক্ষেত্রে। রীতিমতো বমশেল।
উম? হঠাই খেয়াল হলো আয়মানের, একটা প্রশ্ন করেছে মেয়েটা। অনেক কষ্টে খাদ থেকে টেনে তুলল ও নিজেকে, তাকাল ওয়েইট্রেসের মুখের দিকে।
আর কিছু?
অদ্ভুত তো! না ভেবে পারল না আয়মান। মাত্র দুটো শব্দ উচ্চারণ করেছে মেয়েটা। কিন্তু প্রশ্নটার সঙ্গে অতিরিক্ত আরও কিছু যেন শুনতে পেয়েছে ও। ভিজে ঠোঁট জোড়া গা ছুঁল। পরস্পরের, জিভের সঙ্গে ঘষা খেল টাকরা, দাঁতের ফাঁক গলে বেরিয়ে এল বাতাস। যেন খাবার না, অন্য কিছু সাধছে। চোখ দুটোয় ঝিকমিক করছে কৌতুক। কান দুটো গরম হয়ে উঠল আয়মানের। মেয়েটা কি বুঝতে পেরেছে ওর চিন্তাটা? চেহারাটার দিকে মনোযোগ দিতে বাধ্য হলো ও।
চকচকে মুখটা আরও সেক্সি করে তুলেছে ছোট ছোট নাকের-ফুটো। গ্লসি লিপস্টিক, বড় বড় আঁখিপল্লবের উপরে হালকা নীল আইশ্যাডো, হীরকদ্যুতি ছড়ানো শুভ্র দাঁত, ডিম্বাকৃতি চিবুক… সবটা মিলিয়ে আয়মানের মনে হলো, এখানে করছেটা কী মেয়েটা? মডেলিং-এ নামছে না কেন? শাইন যে করবে, চোখ বুজে বলে দেয়া যায়। কেবল যোগ্যতা দিয়ে নয়, উপরে ওঠার জন্য সব কিছুই করতে পারে এই মেয়ে। গায়ে পড়া স্বভাবটা থেকে আঁচ পাচ্ছে যেন আয়মান।
হ্যাঁ… চেকটা, প্লিজ।
ও দেয়নি জবাবটা। দিয়েছে ওর প্রতিচ্ছবি। আগেই খাওয়া শেষ করে রেস্টরুমে গিয়েছিল আরেক ইকরামুল্লাহ, চেয়ারে বসে কফির কাপটা টেনে নিল আয়মানের যমজ।
যেন হতাশ হয়েছে, এমনি ভাবে ঘুরে দাঁড়াল মেয়েটা। চলে যাচ্ছে… ভাইটাল স্ট্যাটের শেষ অংশটা চেক না করে পারল না আয়মান। শর্টস জিনিসটা এমনিতেই খাটো; তার চাইতেও খাটো, মেয়েটা যেটা পরেছে। পা ফেলার ছন্দে ঢেউ উঠছে বারুদ ঠাসা নিতম্বে।
আয়মানের অলক্ষে মুচকি হাসল ওর সহোদর।
গলা খাঁকারি দিয়ে ভাইয়ের দিকে চোখ ফেরাল আয়মান বিব্রত চেহারা করে। গায়েব হয়েছে আয়ান ইকরামুল্লাহর, হাসি। নিজের কফিতে চুমুক দিল আয়মান। ভাজ করা পত্রিকাটা ঠেলে দিল দ্বিতীয় ইকরামুল্লাহর দিকে। রেস্তোরাঁর নিউজস্ট্যাণ্ড থেকে কিনেছে কাগজটা।
দেখ এটা। রহস্যময় লাগছে আমার কাছে। লেক ম্যানিটোঅক, উইসকনসিন। গেল হপ্তার ঘটনা। লিয়ানা অ্যানিসটন, বয়স উনিশ, সাঁতার কাটতে হ্রদে নেমে ফিরে আসেনি আর। ডুবুরি নামিয়ে কিছু পায়নি পুলিস। কথা সেটা না। কথা হচ্ছে: লেক ম্যানিটোঅকে এ বছরের তৃতীয় সলিল-সমাধি কেস এটা। …হ্যাঁ, অন্য লাশ দুটোও পাওয়া যায়নি খুঁজে।
এখানে লিখেছে: দু দিন আগে ফিউনেরাল হয়েছে মেয়েটার… বলল আয়ান কিছুক্ষণ পর। ইতোমধ্যে খাবারের দাম আর টিপস নিয়ে গেছে ওয়েইট্রেস।
হুঁ,
অদ্ভুত না?
কোনটা?
ডেড বডি তো বলছে পাওয়াই যায়নি। কী কবর দিল তা হলে?
প্রশ্নটা যেন থমকে দিল আয়মানকে। দাঁত খিচানো রয়েল বেঙ্গল টাইগারের মাথাঅলা রুপালি লকেট পরছে ও ইদানীং। মাথাটায় হাত বোলাতে বোলাতে স্বগতোক্তি করল: …খালি একটা কফিন… ঠিক… ভাবতেই কেমন জানি লাগে।
ধীরেসুস্থে কফিটুকু শেষ করল আয়ান। টিসু-পেপারে ঠোঁট মুছে বলল, এটা আমাদের কত নম্বর কেস যেন?
বাইরে, রেস্টুরেন্ট কাঁপিয়ে চলে গেল একটা লরি।
