শাস্তি। ব্যর্থদের স্থান নেই দলে। অযোগ্য প্রমাণিত হলে নিকেশ করে ফেলা হতো, যাতে বাইরে গিয়ে কোনও তথ্য ফাস করতে না পারে।
কত জনকে হত্যা করেছে এভাবে?
মোটমাট একুশ জন।
আমরা জেনেছি, কল-সেন্টারের মতো কিছু একটা ছিল ওই প্ল্যান্টে। কী সেটা?
এটা ওদের কর্মপদ্ধতির একটা অংশ। কয়েকটা সেগমেন্টে ভাগ করা গ্রুপের কাজগুলো। কল-সেন্টারটা হচ্ছে- কমিউনিকেশন-পার্ট।
কাদের সাথে কমিউনিকেট করত?
স্পনসর। ফ্রিতে বিভিন্ন জিনিসের অফার দেয়া হতো। ওদেরকে। সোজা কথায়, টোপ ফেলত। যারা টোপ গিলত, তাদের সাথে সরাসরি যোগাযোগ করত অন্যরা।
ফ্রি দিলে টাকা আসত কীভাবে?
আসল ব্যাপারটা এখানেই। ওরা যে প্রডাক্টটা অফার করে, সেটা একটা পারফিউম। এমনই এক সুগন্ধী, যেটা শুঁকলে ইচ্ছাশক্তি বলে কিছু থাকবে না আপনার। …পয়সাঅলা লোককে টার্গেট করা হতো। একবার সেন্টের গন্ধ শুঁকলেই এন্টারপ্রাইজের হাতের পুতুলে পরিণত হতো লোকগুলো। চাহিবা মাত্র যে-কোনও দাবি মেনে নিতে বাধ্য থাকত তখন। ওদের টাকায় ব্ল্যাক মার্কেট থেকে অস্ত্র কিনত এন্টারপ্রাইজ।
গুঞ্জন উঠল সাংবাদিকদের মধ্যে।
এই সব অপকর্মের হোতাটা কে?
নাতাশা মালকোভা। এক্স-কেমিকেল ইঞ্জিনিয়ার। মেধাবী, কিন্তু বিপথগামী। লিবিডো নামের পারফিউম ওরই আবিষ্কার।
আমরা দেখতে চাই তাকে।
হাজির করা হলো হ্যাণ্ডকাফ পরা বন্দিকে।
আবারও গুঞ্জন… ফিসফাস। এ কি মানবী, না দেবী?
খাঁটি ইউরোপীয় সৌন্দর্যের প্রতীক যেন মেয়েটা। চোখে বাঘিনীর দৃষ্টি।
মুহুর্মুহু জ্বলে উঠতে লাগল ক্যামেরার ফ্ল্যাশ।
মৃত্যুভয়াল নীল
নীল পানির দিকে তাকিয়ে আছে লিয়ানা, যত দূর দৃষ্টি যায়।
বিশাল-জায়গা-নিয়ে-হদটার দরের সীমানা চিহ্নিত করছে পাড় জুড়ে জন্মানো নিবিড় সবুজ। জঙ্গল ওদিকটায়। সদ্য সকালের অনুজ্জ্বল, মায়াময় আলোতে কালচে দেখাচ্ছে বনটাকে। তারও পিছনে নীলচে সাদা একটা দেয়াল চলে গেছে দিগন্তের এমাথা-ওমাথা। সব গাছ ছাড়িয়ে, আকাশের গায়ে হেলান দিয়ে ঘুমিয়ে আছে যেন রহস্যঘেরা, কুয়াশাচ্ছন্ন ওই প্রাচীর। পাহাড়সারি ওটা, অ-নে-ক দরে।
পাড়ের পানিতে পড়া গাছের ছায়াটুকু বাদ দিলে লেকটা যেন অতিকায়, নীলাভ এক আয়না। হাওয়াই মিঠাইয়ের মতো পাতলা ফিনফিনে মেঘদল সাঁতার কাটছে তার ভিতরে। মন কেমন করা আলুথালু বাতাসে শান্ত ঝিলিমিলি ছড়িয়ে পড়ছে দূর থেকে দূরে। একটু পরে রোদ উঠলে চোখ না কুঁচকে তাকানো যাবে না আর লেকের আয়নায়।
নাতিদীর্ঘ, এক মাত্র ডকটার কিনারের কাছে দাঁড়িয়ে মেয়েটা। টু-পিস ফ্লোরাল বিকিনি পরনে। পরিবেশের সঙ্গে সাদৃশ্য রেখেই যেন ও-দুটোও নীল রঙের। খুলে রাখা ট্র্যাক সুটটা স্তূপ হয়ে পড়ে আছে নির্জন ডকের এক ধারে পাতা হাতলঅলা কাঠের বেঞ্চিটার উপরে। আরেক ধারে পানিতে ভাসছে ছোট্ট, সাদা এক বোট।
এখানে আসার আগে মিনিট বিশেক জগিং করেছে লিয়ানা। হালকা ঘামের প্রলেপ সারা শরীরে। শীতল হাওয়ায় শিউরে উঠছে গা-টা। বাতাস অবশ্য এমনিতেও ভিজে। আর কী সজীব! বন-পাহাড়ের গন্ধ আনছে বয়ে। ক্লান্তি টিকতে পারে না এরকম বাতাসে। ঝেটিয়ে দূর করে দেয় মনের সমস্ত ক্লেদ।
স্মিত অভিব্যক্তি খেলা করছে লিয়ানার চেহারায়। শ্বাসের সঙ্গে ধীরেসুস্থে উঠছে-নামছে সুগঠিত সোনালি কাঁধ, মেদহীন সমতল পেট। খুব ফিটনেস ফলো করে ও। নিয়ম করে সাঁতরায়, ইয়োগা করে। ধ্যানের পর্বটাও সারা খানিক আগে।
বড় করে দম নিল তরুণী। হাত দুটো পিছিয়ে এনে এক কদম এগিয়েই ডাইভ দিল বাতাসে। স্বয়ংক্রিয় ভাবে মাথার সামনে এসে এক হয়ে গেল হাত জোড়া। শূন্যে অধিবৃত্ত রচনা করে তার এক সেকেণ্ড পর জলের শরীর ভেদ করল মানব-বর্শা। ঝুপুস! সকাল বেলার পাখপাখালির কলকাকলিতে ব্যাঘাত ঘটাল না জলের এই উচ্ছ্বাস।
পতনের ধাক্কায় তলিয়ে গিয়েছিল মেয়েটা। গতিজড়তা কাটিয়ে ভেসে উঠল মুহূর্ত কয় পরে। বাতাসের জন্য আপনা আপনি হাঁ হয়ে গেল মুখটা। শ্বাস ছাড়ার সঙ্গে ফুর-র-র করে পানি ছিটাল মুখ দিয়ে। হিমশীতল হয়ে জুড়িয়ে গেছে। অন্তস্তলটা।
শ্বাসপ্রশ্বাস স্বাভাবিক হয়ে এলে শুরু করল সাঁতার। ধীরে ধীরে দূরত্ব বাড়াচ্ছে ডকের সঙ্গে।
এক শ গজমতো চলে এল এভাবে। তারপর সাঁতরানো থামিয়ে মাথা নিচের দিক করে ডুব দিল ডলফিনের কায়দায়।
দ্বিতীয় বারের মতো মাথাটা জাগাতেই ঘিরে ধরল বিচিত্র এক ধরনের অস্বস্তি। হাজারও ফড়িং উড়ছে যেন পেটের মধ্যে। গভীর পানির স্বাভাবিক অনুভূতিই বলা যায় এটাকে। যত ওস্তাদ সাঁতারুই হও না কেন তুমি; পাহাড়-জঙ্গলঘেরা, দৈত্যের বাটির মতো প্রাগৈতিহাসিক কোনও সরোবরে নামলে ছমছম করবেই ভিতরটা। এই বুঝি টান দিল কেউ পানির নিচ থেকে। খাঁ-খাঁ হাহাকারের জন্ম দেবে উপরের আদিগন্ত নীলিমা। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে এখন কেমন এক বিজাতীয় সিক্সথ সেন্স। কেউ যেন আড়াল থেকে লক্ষ করছে ওকে।
ডানে তাকাল লিয়ানা। অকারণ ভয় ধরিয়ে দিল থইথই তরল চাদর। পাইন বনের মাথা ভেদ করে ঠায় দাঁড়িয়ে কেইবল-টাওয়ারের উন্নত শির। খেলনার মতো দেখাচ্ছে এত দূর থেকে। প্রযুক্তির বারতা নিয়ে কয়েক সারি তার চলে গেছে এক টাওয়ার থেকে আরেক টাওয়ারে।
