ভালো করে দেখার জন্য চেমবারে পা রাখল হ্যারিস। দরজার দিকে পিঠ দিয়ে নত হলো মেঝেতে। কুড়িয়ে নিল একটা টুকরো। চিনল মুহূর্তে।
হাড়!
ঘর জুড়ে মানুষের অস্থি আর ভস্ম।
কিঁ-ইঁ-চ!
ঝট করে ঘাড় ঘোরাল হ্যারিস। জোরে লেগে গেছে বলে অন্য রকম শুনিয়েছে কবাটের আর্তনাদটা। না, এমনি-এমনি বন্ধ হয়ে যায়নি ভারি দরজাটা। বাইরে থেকে লাগিয়ে দেয়া হয়েছে।
হেই! উঠে দাঁড়িয়েছে হ্যারিস। আছড়ে পড়ল পাল্লাটার উপরে।
ক্রুর একটা মুখ উদয় হলো ফোকরটার ওপারে। ধক-ধক করে জ্বলছে চোখ দুটো। সরে গেল চকিতে।
হেই! হেই! থাবা পড়তে লাগল ধাতব কবাটে। দরজা খোলো! দরজা খোলো, বলছি!
সহসা গরম অনুভব করল। বদ্ধ চেমবারে হাঁসফাঁস লেগে উঠল মুহূর্তে। চিকন ঘাম দেখা দিল কপালে।
পাগলের মতো টেনেটুনে টাই-এর নট ঢিলে করল হ্যারিস। খুলে দিল গলার বোতামটা। ক্লসট্রোফোবিয়া নেই ওর। তা-ও এত খারাপ লাগছে কেন! গরমটা যেন বেড়েই চলেছে!
ব্লেজারটা খুলে ফেলল হ্যারিসন। টপ-টপ ঘাম ঝরছে। ওর সর্বাঙ্গ থেকে। চোখে উদ্ভ্রান্তের দৃষ্টি।
বাড়ছে উত্তাপ… বাড়ছেই।
ঘোলাটে কাঁচ। গরম নিঃশ্বাস আর ঘামের বাষ্পে ঘোলা হয়ে গেছে আরও। দুর্বল হাতে কিল দিল সে দরজায়। মগজটাও ঘোলাটে হয়ে এসেছে ওর। গলার ভিতর থেকে উঠে এল ঘড়-ঘড় আওয়াজ।
ত্যানার মতো লুটিয়ে পড়ল হ্যারিসন। জ্ঞান হারানোর আগে উপলব্ধি করল, প্রমাণ সাইজের এক মাইক্রোওয়েভ আভেনের মধ্যে আটকা পড়েছে সে!
তেরো
অনেক রাত হয়ে গিয়েছিল। সেজন্য বেশির ভাগ লোকেরই চোখে পড়েনি নিউজফ্ল্যাশটা। তা ছাড়া, রাত জাগার অভ্যাস রয়েছে যাদের, তারা মূলত খবর দেখে না টিভিতে। অন্য কিছু দেখে। খেলা। এক্স-রেটেড চ্যানেল।
প্রতিবেদন লিখবার সময় পেরিয়ে গিয়েছিল। কাজেই, সকালের পত্রিকাতেও আসেনি কিছু।
সকালে টিভি খুলল যারা, বড়সড় এক ধাক্কা অপেক্ষা করছিল তাদের জন্য। কেউ কেউ শুনল রেডিয়োতে। শতকরা আশি ভাগ দর্শক-শ্রোতা ভলিউম বাড়াল ভালো করে শোনার জন্য। ডিটেইলস জানবার জন্য এক চ্যানেল থেকে আরেক চ্যানেলে গেল শতকরা এক শ ভাগ।
…আজ রাত একটার দিকে স্যান ফ্রানসিসকোর এক রাসায়নিক প্ল্যান্টে হানা দেয় সোয়াট (S.W.A.T.) টিম। আমরা জানতে পেরেছি, এক উগ্রবাদী সংগঠনের নেতা এবং বেশ কিছু সদস্যকে আটক করা হয়েছে সেখান থেকে। উদ্ধার করা হয়েছে বিপুল অস্ত্রশস্ত্র। এ ব্যাপারে আপনাদেরকে আরও তথ্য জানানোর জন্য কথা বলার চেষ্টা করছি পুলিসের কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সাথে… ।
…নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, আটককৃতরা রাশান এক জঙ্গি গোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পৃক্ত… ।
…দু দিন আগে স্যান ফ্রানসিসকোর এক পুরানো পার্ক থেকে মানুষের যে ছাই পেয়েছে পুলিস, তাদের নির্মম পরিণতির জন্য উগ্রপন্থী এই গোষ্ঠীই দায়ী। কেম্যান আইল্যাণ্ডের এক কেমিকেল ফ্যাকটরিতে পুড়িয়ে মারা হয়েছে তাদেরকে। একই ভাবে ফেডারেল এজেন্ট হ্যারিসন ফোর্ডকেও মারার চেষ্টা করছিল টেরোরিস্টরা। মুমূর্ষ অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে মিস্টার ফোর্ডকে। স্যান ফ্রানসিসকো জেনারেল হসপিটালের আইসিইউ-তে আছেন তিনি। সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করছি আমি লারিসা ল্যাটনিনা।
দুপুর নাগাদ ডাকা হলো সংবাদ-সম্মেলন। বেলা দুটোর দিকে ভিড় উপচে পড়ল পুলিস-স্টেশনের অডিটরিয়ামে।
এক গাদা বুম টেবিলে। প্রথমেই ব্রিফ করল পুলিসের এক কর্মকর্তা। শেষ করল এই বলে: এবার আপনাদের কোনও প্রশ্ন থাকলে করতে পারেন।
প্রায় সব কটা হাত উঠল।
সামনের সারিতে বসা অস্থির একজনকে দেয়া হলো গ্রিন সিগন্যাল। দৃষ্টি আকর্ষণ করছিল সে হাত নেড়ে।
সঙ্কেত পেয়েই তেড়েফুঁড়ে উঠে দাঁড়াল চ্যাংড়া যুবকটি। আপনাদের এই ঢাক-ঢাক গুড়-গুড়ের কারণ কী?
অফিসারের ইচ্ছা হলো, লাথি মারে ছোকরার পাছায়। কিন্তু চাইলেই তো আর সব হয় না। যাহা চাই, তাহা…। সাংবাদিক জাতটা বড় সাংঘাতিক।
ভিতরের রাগটা দমন করে ফেলল গুফো অফিসার। বিগলিত, মেকি হাসি দিল। আমি জানি, খবরের জন্য অধীর হয়ে ছিলেন আপনারা। কিন্তু আমাদের দিকটাও তো দেখতে হবে আপনাদের। গ্রেফতারকৃতদের জবানবন্দি নিতে হয়েছে। তাদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের সূত্র ধরে আরও কয়েক জায়গায় অপারেশন চালিয়েছে পুলিস। অ্যারেস্ট হয়েছে আরও চল্লিশ-পঁয়তাল্লিশ জন। বুঝতেই পারছেন, মিশনের স্বার্থেই মুখ খুলতে পারিনি আমরা।
এরপর অনুমতি পেল কমবয়সী এক মেয়ে। খুব সুন্দরী মেয়েটা। সাদা শার্ট আর ঘিয়ে রঙের স্কার্টে ফুটে বেরোচ্ছে গ্ল্যামার। ঠোঁটে চেরি-রঙের লিপস্টিক। পায়ের উপরে পা।
গ্যাংটা কি রাশান? জিজ্ঞেস করল চেয়ার না ছেড়ে।
ইউক্রেন।
আমেরিকার বিরুদ্ধে লেগেছে?
তা তো বটেই। তবে শুধু আমেরিকা নয়, আরও অনেক দেশেই সক্রিয় এদের র্যাকেট।
উদ্দেশ্য?
সিম্পল। টেরোরিজম। অনেকের সাথেই তো আদায়-কাঁচকলায় সম্পর্ক ইউক্রেনের।
সন্তুষ্ট হয়ে মাথা ঝাঁকাল তরুণী।
ধেয়ে এল আরও প্রশ্ন।
যারা ধরা পড়েছে, সবাই কি ইউক্রেনিয়ান?
না, সবাই না। রাশান… চেচনিয়ান…
কী বলছেন! রাশানদের কাজে লাগাচ্ছে ইউক্রেনিয়ানরা! হাউ কাম!
মগজ ধোলাই।
মানুষ পোড়ানোর ব্যাপারটা কী?
