আমিও অতিষ্ঠ হয়ে গিয়েছিলাম। শাসালাম একদিন, ভালো হয়ে না গেলে বাসা থেকে বেরিয়ে যেতে হবে। কী বলল, জানেন? মুখের উপর বলে দিল, লেখাপড়া আর করবে না সে। ও-কাজ তার জন্য নয়।
কী করত তা হলে? সময় কাটাত কীভাবে?
ধান্দাবাজি করে। সারাক্ষণ পয়সা কামানোর ধান্দায় থাকত। শর্টকাটে কী করে বড়লোক হওয়া যায়…
বুঝেছি।
তবে একটা কথা বলতেই হবে। পড়ালেখা ছাড়ার পর বখাটেপনাও কমে গিয়েছিল মিখাইলের। হঠাৎ করেই বদলে গেল যেন। বাউণ্ডুলেপনা বাদ দিল। তার এক মাত্র ধ্যানজ্ঞান তখন টাকা। বোধ হয় জুয়া বা ওই-জাতীয় কিছুতে মজেছিল। তারপর ঢুকল একটা চাকরিতে…
চাকরি? হ্যারিসনের মুখ থেকে বেরোল প্রশ্নটা।
তার দিকে তাকাল ভিকটরোভিচ, সিনিয়র। হ্যাঁ। আমিও অবাক হয়েছিলাম প্রথমে। অবশ্য খুশিও হয়েছিলাম। ভাবলাম, যাক, শেষ পর্যন্ত সুমতি ফিরেছে ছেলেটার। …মানুষ তো বদলায়, তা-ই না?
কী চাকরি করত?
সঠিক বলতে পারব না। ভেঙে বলেনি কিছু। জানতেও চাইনি। হুটহাট বিগড়ে যাওয়া স্বভাব ওর। ভেবেছিলাম, মুড ভালো থাকলে নিজেই বলবে। কথাবার্তা থেকে যা বুঝেছি, কাজটা কাস্টমার কেয়ারের মতো কিছু। টেলিফোনে সার্ভিস দেয়া লাগত। …কীসের কাস্টমার, জিজ্ঞেস করবেন না। বলতে পারব না।
কখনও কি পয়সাকড়ি চেয়েছে আপনাদের কাছে? বা বাসা থেকে চুরি গেছে কিছু?
জনের দিকে চাইল সিনিয়র ভিকটরোভিচ। না তো! কেন?
তেমন কিছু না। সব রকম সম্ভাবনাই তলিয়ে দেখছি। আমরা।
কী রকম?
এই… যেমন ধরেন, ড্রাগস। নেশা করত কি না আপনার ছেলে…
আমার তা মনে হয় না। এপাশ-ওপাশ মাথা নাড়ল চেচনিয়ান। এই একটা ব্যাপারে আপনাদেরকে আমি নিরানব্বই পারসেন্ট গ্যারান্টি দিচ্ছি। মাদকাসক্ত ছিল না ও।
এলএসডির কথাটা তুলল না আর জন। অবশ্য ওই কান মিখাইলের না-ও হতে পারে। নিশ্চিত হতে ডিএনএ টেস্টের প্রয়োজন।
মিসিং হওয়ার আগে অস্বাভাবিক কোনও ব্যাপার লক্ষ করেছেন ওর মাঝে? এমন কোনও আচরণ, যেটা সাধারণত করত না…
দুই সেকেণ্ড চিন্তা করল বাপ। কই… এমন কিছু তো মনে পড়ছে না। তবে বন্ধুবান্ধব জুটিয়েছিল কিছু নতুন। খেয়াল করেছি। ওদের সাথে চলত… দল বেঁধে। ডিউটি শেষে প্রায়ই গাড়িতে করে বাসায় নামিয়ে দিত ওকে বন্ধুরা। সম্ভবত একসাথে কাজ করত ওরা।
হতে পারে। …আচ্ছা, একটা কথা বলুন তো, ছেলে নিখোঁজ হওয়ার পরে কি আর দেখেছেন ওর বন্ধুদের?
জবাব দিতে গিয়ে থেমে গেল লোকটা। পেণ্ডুলামঅলা দেয়ালঘড়ি সময়-সঙ্কেত দিতে শুরু করেছে।
না, ঘণ্টাধ্বনি থামার পর বলল। এক বারও নয়।
আবার দেখলে চিনতে পারবেন ওদেরকে?
চেনা মুশকিল। কারও চেহারাই দেখিনি কখনও। গাড়ি থেকে নামত না ছেলেমেয়েগুলো।
মেয়েও আছে এর মধ্যে!
কী গাড়ি, বলতে পারবেন? জরুরি আরেকটা প্রশ্ন করল হ্যারিসন।
তা পারব। গাড়ি-বিষয়ে ইন্টারেস্ট আছে আমার। গরিবের ঘোড়া-রোগ আর কী! …জার্মান গাড়ি। বিএমডব্লিউ।
ধাঁই করে দুটো জিনিস ঘাই মারল জনের মাথায়। ইউরোপের সঙ্গে আরেকটা যোগসূত্র! আর দ্বিতীয়টা হলো খটকা। সার্ভিস-সেন্টারে কাজ করে, এরকম কেউ বিএমডব্লিউ চালাবে কেন? নাহ, মেলে না। একেবারেই খাপছাড়া।
মিস্টার ভিকটরোভিচের কথা শেষ হয়নি তখনও। গাড়ির ব্যাপারে আমার মতোই উৎসাহ মিখাইলের। প্রায়ই বলত, খুব তাড়াতাড়ি ওরকম একটা গাড়ির মালিক হবে সে-ও।
টাকা পেত কোথায়?
রোজগারের টাকা। বলত, প্রমোশন হবে শাইন করতে পারলে। আস্তে আস্তে উপরে উঠবে সে।
হুম। এই দুই মাসে সামান্যতম সন্দেহও কি জাগেনি আপনাদের, কোথায় গায়েব হতে পারে মিখাইল? ,
একটা চিঠি দিয়েছিল…
চিঠি!
চোখাচোখি হলো জন ও হ্যারিসের।
কার চিঠি?
কার আবার! মিখাইলের।
বলেন কী! কবে পেলেন চিঠিটা?
দু মাস আগেই। তিন দিন ধরে লাপাত্তা তখন ছেলেটা। তারপর পেলাম ওই চিঠি। মাথামুণ্ডু কিচ্ছু বুঝিনি আমরা ওটা পড়ে। তার পরই পুলিসে যোগাযোগ করার তাগিদ অনুভব করি।
চিঠিটার কথা বলেছেন পুলিসকে? দেখিয়েছেন। তাদেরকে?
না।
গাধামো করেছেন! মনে মনে গাল বকল হ্যারিস। কেন বলেননি? শুধাল কৈফিয়ত দাবি করার ভঙ্গিতে।
আমতা আমতা করতে লাগল মিখাইলের বাপ। আসলে… চিঠিটা কেমন যেন। এটা বুঝতে পেরেছি, মিখাইল নিশ্চয়ই এমন কিছুর সাথে জড়িয়েছে, সমাজ যেটাকে ভালো চোখে দেখে না। পুলিসকে বললে আরও বিপদে পড়তে পারত ছেলেটা। খুঁজে বের করে হয়তো ওকেই অ্যারেস্ট করত পুলিস। ওর মা তো ভয়ই পেয়ে গিয়েছিল। পুড়িয়ে ফেলতে চেয়েছিল ওটা…
ফেলেছেন নাকি? শঙ্কায় চড়ে গেল জনের গলার স্বর।
আরে, না! বোকা মহিলার কথায় কান দিতে আছে নাকি!
শব্দ করে স্বস্তির শ্বাস ফেলল দু জনেই।
চিঠিটা কি দেখতে পারি?
আলবত।
ডাইনিং টেবিল ছেড়ে উঠে পড়ল প্রৌঢ়। ফিনফিনে, ময়লা পরদা সরিয়ে নিজেদের শোবার ঘরে গিয়ে ঢুকল। ফিরল একটা সাদা খাম নিয়ে। খামটা থেকে চিঠিটা বের করে তুলে দিল জনের হাতে।
দুই পাতার চিঠি। কাগজের এপিঠ-ওপিঠ লেখা। প্রচুর ইংরেজি হরফ চোখে পড়লেও ইংরেজি নয় ভাষাটা ক্যাপিটাল লেটারে লেখা শব্দের ভিতরে আবার রয়েছে ছোট হাতের অক্ষর। N লেখা হয়েছে উলটো করে। O-এর পেট কাটা। ডিসলেক্সিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তির লেখা যেন।
