অল্পবয়সী এক ছেলে। পড়ত কলেজে। নিখোঁজ ছিল দুই মাস ধরে। পুলিসের কাছে ধরনা দিয়েছিল ওর বাপ।
ছেলেটার কলেজ-আইডির ফোটোকপি নিয়েছে জন। গাড়িতে বসে আরেক দফা চোখ বোলাচ্ছে কাগজটায়।
উপরে, বা দিকের কোণে তিনটে গাছের-পাতা। কলেজের মনোগ্রাম। তিনটে পাতায় তিনটে ইংরেজি অক্ষর। পি। সি। সি। ডান কোণে স্ট্যাম্প-সাইজ ছবি। ওইটুকু ছবিতে ব্যাক-ব্রাশ করা চুল ছাড়া আর কোনও বৈশিষ্ট্য ধরা পড়ছে না।
এরপর ছাত্রের প্রয়োজনীয় ইনফর্মেশন।
পেটালুমা কমিউনিটি কলেজ
মিখাইল ভিকটরোভিচ
আইডি নং: ৮৯৩৪০১-৩৯৫৮
কমার্স গ্রুপ
মেয়াদ: এক বছর মেয়াদোত্তীর্ণের সময়: মার্চ, ২০১৫
সবশেষে প্রিন্সিপালের স্বাক্ষর।
ছেলেটার ফ্যামিলি সম্বন্ধেও কিছু ইনফর্মেশন দিয়েছে। পুলিস।
ও আর ওর বাপ-মা এসেছে চেচনিয়া থেকে… পড়ছে। জন। ২০১১-তে… ছেলেটার বয়স তখন চোদ্দ। বেশ ক বার নাম উঠেছে ওর পুলিসের খাতায়।
কী কেস? স্টিয়ারিং-এ হাত। রাস্তা থেকে চোখ না সরিয়ে জিজ্ঞেস করল হ্যারিস।
অনেক। শপ-লিফটিং… ভাংচুর… মারপিট… বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি… অনধিকার প্রবেশ… ।
থাক-থাক, আর বলতে হবে না!
চান্দি গরম টাইপ। সামান্য ছিট আছে মাথায়…
ছিট, নাকি শিট? ,
পাশে বসা বন্ধুকে এক পলক দেখল জন। খেপছ কেন তুমি?
তৎক্ষণাৎ উত্তর করল না হ্যারিস। কয়েক মুহূর্ত পর চাপা ঝঝের সঙ্গে বলল, এই ইমিগ্র্যান্টগুলো… বিষফোঁড়া এক একটা… নষ্ট করে ফেলছে দেশটাকে… ।– বলেই বুঝল, বেফাঁস মন্তব্য করে ফেলেছে। ঝাঁ-আঁ করে উঠল দুই কান। চট করে তাকাল বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কো ওঅর্কারের দিকে। পোকা গিলে ফেলা চেহারায় বলল, সরি, জন! কিছু মনে কোরো না তুমি! তোমাকে মিন করে বলিনি! মার রাগ জার্মান, রাশান, আফ্রিকান, এশিয়ানদের উপরে। কী যে ভাবে এরা দেশটাকে, খোদাই মালুম! আমেরিকাতে এলেই সব সমস্যার সমাধান যেন… টাকা ওড়ে বাতাসে… হায়, রে, বোকা মানুষ! আর মুসলিমরা ধর্মের নামে যা করে বেড়াচ্ছে …
মুসলমান মানেই কিন্তু টেররিস্ট নয়, হ্যারি। আপত্তি করল জন। ভালো-খারাপ সবার মধ্যেই আছে। দেখার চোখটা একটু বদলাও, বন্ধু!
বন্ধু নারাজ হয়েছে, বুঝতে পেরে আরও বিব্রত হলো হ্যারিস। প্রসঙ্গ পালটাল তড়িঘড়ি করে, বাসার নাম্বারটা কত যেন?
নোটবুক দেখল জন। এক তিন তিন দুই পাঁচ।
লিবার্টি অ্যাভিনিউ অভিমুখে চলেছে গাড়ি।
ঘণ্টা খানেকের মধ্যে পৌঁছে গেল ডাউন-টাউনে।
খেটে খাওয়া মানুষদের এলাকা। যারা থাকে, তাদের কেউই তেমন সচ্ছল নয়বোঝা যায়। বিলাসিতার তেমন। কোনও নিদর্শন চোখে পড়ল না ওদের।
বাড়িটা খুঁজে পেতে বেগ পেতে হলো। হোল্ডিং নাম্বারগুলো সব এলোমেলো। সিরিয়াল মেইনটেইন করা হয়নি।
কালো বার্নিশ করা দরজার পাশে নারীর স্তন-আকৃতির বেলপুশ। লাল সুইচটা চেপে ধরতেই টিয়া পাখির কর্কশ চিৎকার শোনা গেল ভিতরে।
অনেক সময় লাগিয়ে দরজা খুলল এক ভদ্রলোক। ছাপাই শার্ট পরনে। জমিনে হামিংবার্ড উড়ছে। ঠোঁটের উপরে মোটা চিরুনির মতো গোঁফ। কাঁচায়-পাকায় মেশানো। অগোছাল দাড়ি গালে। থুতনির বাঁ দিকে মস্ত এক আঁচিল। বড় বড় রোমে ভরা হাত। সস্তা জাপানি ঘড়ি কবজিতে। কালো ব্যাণ্ড। ব্র্যাণ্ডটা ক্যাসিও।
ভদ্রলোকের চোখের নিচে কালি। ছলছলে, বিষণ্ণ দৃষ্টি। ধসে গেছে চেহারাটা। ছেলের মর্মান্তিক পরিণতির খবর পেয়ে গেছে ইতোমধ্যে।
মিস্টার ভিকটরোভিচ?
সামান্য কাপল মাথাটা।
এফবিআই থেকে আসছি আমরা।
ভাবান্তর হলো না। শূন্য দৃষ্টিতে জিজ্ঞাসা: কী চাই?
আপনার ছেলের ব্যাপারে।
প্রতিক্রিয়া নেই।
আপনাকে সান্ত্বনা জানানোর ভাষা নেই আমাদের…
কথা ফুটল এবারে। দুই মাসে দুই শ বার গিয়ে পড়েছি। দারোগাদের কাছে, ভেজা স্বর। গরজ দেখায়নি কেউ। আর আজকে আপনারা এসেছেন সিমপ্যাথি দেখাতে! তামাশা পেয়েছেন? জ্বলে উঠল প্রৌঢ়ের চোখের তারা।
চোখ নত করল হ্যারিসন।
পৃথিবীতে সবচেয়ে ভারি জিনিস নাকি পিতার কাঁধে ছেলের কফিন। মিস্টার ভিকটরোভিচের মুখে হাসি। ফোঁটানোর এখন একটাই উপায়, মিখাইল ভিকটরোভিচকে জীবিত করে দেয়া। সেটা তো আর সম্ভব নয়।
পুলিসের পক্ষ থেকে ব্যর্থতার দায় নিচ্ছি আমরা, এবারে মুখ খুলল জন। কিন্তু আপনার ছেলের মৃত্যতেই সব শেষ হয়ে যায়নি, মিস্টার ভিকটরোভিচ। আপনি কি চান না, বিচার হোক খুনির?
কাজ হলো কথায়। এক দিকের নাক টানল ভদ্রলোক। কী চান আপনারা?
সাহায্য।
জনের চোখে প্রত্যয় দেখতে পেল প্রৌঢ় চেচেন। আসুন।
সরু এক সংক্ষিপ্ত প্যাসেজ-ওয়ে দিয়ে ডাইনিং রুমে নিয়ে। এল ওদেরকে ভিকটরোভিচ। ছোট্ট এক খাওয়ার টেবিলে। এনে বসতে বলল। কোনও বৈঠকখানা নেই বাড়িটায়।
বসল না হ্যারিসন। জায়গাও নেই বসার। দাঁড়িয়ে রইল ফ্রিজের পাশে।
ফুল-তোলা অয়েলক্লথ টেবিলে। মাঝখানে লবণদানি। ব্যস। আর কিছু নেই।
বলুন, কী সাহায্য করতে পারি।
আপনার ছেলের কথা বলুন। কেমন সম্পর্ক ছিল তার বাড়ির সাথে?
ফোঁস করে শ্বাস ফেলল চেচেন। কী আর বলব! এক বুক হতাশা। ও তো আমাদের কারও কথাই শুনত না! নিজের মেজাজ-মর্জিমতো চলত…
পড়াশোনা?
করত না।
কোনও কমপ্লেইন আসেনি কলেজ থেকে?
এন্তার। মাস চারেক আগে রাসটিকেট করা হয়েছে ওকে।
নতুন তথ্য।
তারপর?
