বর্ষাতি গায়ে চাপিয়ে, গির্জার চাবিটা পকেটে ফেলে, হাঁটা শুরু করলেন। গির্জার চৌহদ্দিতে পৌঁছে মূল প্রবেশ পথটা ধরে হাঁটতে লাগলেন। দু-পাশেই সমাধি, পাথরের সমাধি ফলক। এদিকে হালকা বৃষ্টি ট্যাপ ট্যাপ শব্দ তুলছে গাছের পাতায় পড়ে। , একসময় গির্জার দোরগোড়ায় পৌঁছে গেলেন। কিন্তু চাবিটা তালায় ঢুকানোর আগেই কী একটা অস্বস্তি পেয়ে বসল তাঁকে। ওখানেই স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। তারপর ঘুরে দাঁড়িয়ে কেবলমাত্র অতিক্রম করে আসা পথটার দিকে তাকালেন। বিস্মিত হয়ে আবিষ্কার করলেন রাস্তাটার পাশের একটা নিচু সমাধি ফলকের ওপর তার দিকে পিছন ফিরে বসে আছে একজন মহিলা। তার পরনে কালো ভেলভেটের একটা জ্যাকেট। মাথার কালো চুলের বোঝা আংশিক ঢেকে আছে যে জিনিসটা দিয়ে সেটাকে একটা পাগড়ির মতই লাগল তাঁর কাছে। ওটাও কালো ভেলভেটের তৈরি। পাগড়িটার ডান পাশে তুষার-সাদা পালকের গোছা। বেশ কিছুটা সময় গভীর মনোেযোগের সঙ্গে নারীটির অবয়বের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপরই মনে হলো মহিলাটির মনোেযোগ আকর্ষণ করা দরকার। আর তা করার জন্য শব্দ করে চাবি ঢুকালেন তালার ভিতর। তারপরই শব্দ করে হঠাৎ খুললেন দরজাটা। তার এই কৌশল কাজ দিয়েছে কিনা দেখার জন্য ঘুরেই দেখলেন মহিলাটি অদৃশ্য হয়েছে। দৌড়ে যেখানটায় বসে ছিল মহিলাটি সেখানে গেলেন, দশ গজের বেশি হবে না গির্জার প্রবেশদ্বার থেকে ওটার দূরত্ব। সমাধিফলক এবং এর আশপাশের জায়গা ভালমত খুঁজলেন। কিন্তু ওখানে একজন মানুষ বসেছিল একটু আগে, এর এমনকী কোনো চিহ্নও পেলেন না। এই ঘটনাটি আজীবন এক রহস্যই থেকে যায় যাজক হেইডেনের কাছে। কারণ পরে এমন কোনো তথ্য পাননি যা দিয়ে এর কূল-কিনারা করতে পারেন।
৫. অবিবাহিতদের কবরস্থান
অবিবাহিতদের কবরস্থান
শরীরের আত্মা পানি করে দেওয়ার মত জায়গার অভাব নেই আমেরিকায়। এদের মধ্যে কোনো কোনোটা এতটাই চমকে দেবে আপনাকে যে মনে হবে ওখানটায় গিয়ে হৃৎপিণ্ডের স্পন্দন বন্ধ হয়ে গেছে। আর এটা হওয়ার কারণ আতংক এভাবে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরবে যে নাড়ীর স্পন্দন টের পাবেন না। এমন জায়গার উদাহরণ হিসাবে ইলিনয়েসের শিকাগোর ব্যাচেলর গ্রোভ গোরস্থানের নাম থাকবে একেবারে উপরের সারিতেই।
এই ভুতুড়ে গোরস্থান কোনো কারণ ছাড়াই পুরু কুয়াশার চাদরে ঢাকা পড়ে যায় অনেক সময়। নানা অদ্ভুত ঘটনা ঘটে এখানে। চোখে পড়ে ভয়াবহ সব দৃশ্য। তাই যারা অতিপ্রাকৃত বিষয় নিয়ে কাজ করতে পছন্দ করেন আর প্রচণ্ড মানসিক শক্তির অধিকারী তাদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে এটি। এখানে সব সময় যে কিছু দেখবেনই তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। তবে অনুভব করবেন অশুভ কিছু একটার উপস্থিতি। কখনও কারও মৃদু স্পর্শ পাবেন, কিন্তু আশপাশে কারও চেহারা দেখবেন না। তারপর আবার কোনো কোনো জায়গায় হঠাৎ করেই তাপমাত্রা বিশ ডিগ্রী নেমে হাড়ে কাপ ধরিয়ে দেবে আপনার। এখানকার ভৌতিক কাণ্ডকীর্তির আরও কিছু বর্ণনা দেওয়ার আগে বরং এই সমাধির ইতিহাসটা একটু জেনে নেওয়া যাক। কারণ অনেকেরই ধারণা এখানকার সব অদ্ভুতুড়ে ঘটনার পিছনে এর নাটকীয় ইতিহাসেরও ভূমিকা আছে।
এই গোরস্থানে ১৮২০-২১ সালের সমাধিফলকও খুঁজে পাবেন। যদিও সরকারীভাবে এটি সমাধিস্থলের মর্যাদা পায় ১৮৪৪ সালে। ১৯৬০-এর দশকের পর থেকেই এখানে আর নতুনভাবে কাউকে গোর দেওয়া না হলেও একে ঘিরে অশুভ কাণ্ড-কীর্তি কমেনি একটুও। বরং এতে যেন এখানে আস্তানা গাড়া আত্মাদের সাহস আরও বেড়েছে। এই সমাধিস্থলের নাম ব্যাচেলার গ্রোভ হওয়ার উত্তর খুঁজে পাবেন এর ইতিহাসে। এখানে মূলত কবর দেওয়া হত এই এলাকায় আস্তানা গাড়া অভিবাসীদের। এদের মধ্যে আবার সবচেয়ে বেশি ছিলেন জার্মানরা, ইলিনয়েস-মিশিগান খাল খননে কাজ করছিলেন যাঁরা। আর এদের মধ্যে অনেকেই কবর দেওয়ার সময়ও ছিলেন অবিবাহিত। আর তাই এই সমাধিস্থলটির নাম হয়ে যায় ব্যাচেলর গ্রোভ বা অবিবাহিতদের গোরস্থান।
কবরস্থানটিকে ঘিরে আছে ছোট্ট একটা লবণাক্ত পানির হ্রদ। আর এই এলাকায় রাজত্ব করা গুণ্ডাপাণ্ডাদের খুব পছন্দের জায়গা ছিল এই হ্রদ। কারণ কারও সঙ্গে গোলমাল বাধলেই মেরে. এই লেকে গুম করে ফেলত তারা। এমন অনেক মৃতদেহই এখানে ভেসে থাকতে দেখেছে লোকেরা। বলা হয় গোরস্থানে যেসব আত্মারা হানা দেয় তাদের মধ্যে হ্রদে মারা যওয়া লোকদের আত্মারাও রয়েছে।
শিকাগোর শহরতলী মিডলথিয়ানের কাছেই গোরস্থানটা। নুড়ি বিছানো একটা পথ চলে গেছে অশুভ এই কবরস্থানটির দিকে। আর এই পথ ধরে হাঁটার সময়ই বুকের ভিতর ঢিপ ঢিপ শুরু হয়ে যায় লোকেদের।
শিকাগোর সাইকিক রহস্যভেদী কেন মেলভয়েন-বার্গ আর শিকাগো ট্রিবিউন পত্রিকার এক রিপোর্টারের নাড়ীর স্পন্দন বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল এখানেই। ২০০৬ সালের এক রাতে হানা দিয়েছিলেন অসম সাহসী এই দুজন গোরস্থানে। ভিতরে ঢুকতে না ঢুকতেই শুরু হয় নানা রহস্যময় ঘটনা। তারপরই ছোট্ট একটা ছেলের আত্মার মুখোমুখি হন তারা। ছেলেটার কান্নার শব্দ শুনতে পান পরিষ্কার। তার হারানো রূপার মুদ্রাটি খুঁজে বের করে দেওয়ার জন্য পই পই করে তাদের অনুরোধ করতে থাকে সে।
