তিনি চলে যাওয়াতে হাঁফ ছাড়লেন বন্ধুরা। এবার মনের ভিতরের কথাগুলো খোলাখুলি আলাপ করতে পারলেন তাঁরা। একটা প্রেতাত্মা লর্ড লিটলটনকে সতর্ক করে দিয়েছে এটা বিশ্বাস করতে বাধছে সবারই। এটা স্বপ্ন ছিল, এর চেয়ে ভাল ব্যাখ্যাও কেউ দিতে পারলেন না।
আমার মনে হয় আমাদের ঘড়ির সময় এবার ঠিক করে নিতে পারি। মন্তব্য করলেন জনাথন গ্রেভস। ও, ঈশ্বর, এখন বাড়ি ফিরব আমি। বুঝতে পারলেন এখন প্রায় মধ্যরাত +
আমিও, বললেন মি. এইসরুফ। আর আমার বন্ধু শান্তিতে ঘুমাচ্ছে এটা জেনে খুশিমনে বাড়ি ফিরছি।
তাই যেন হয়, বললেন আরেকজন অতিথি। তাঁরা সবাই চললেন তাদের কোট যেখানে রাখা হয়েছে সেই ক্লোকরুমের দিকে।
এসময়ই হঠাৎ বিনা মেঘে বজ্রপাতের মত একটা ঘণ্টা পড়ার শব্দ হলো। নিস্তব্ধ হয়ে গেলেন তাঁরা, আতংক নিয়ে একজন আরেকজনের দিকে তাকালেন। আরেকটা ঘণ্টা পড়ল।
এই একটা ঘড়ির সময় বদলাতে পারিনি আমরা, ফিসফিস করে বললেন গ্রেভস। প্যারিস চার্চের কথা ভুলেই গিয়েছিলাম…
একটার পর একটা ঘণ্টা বেজেই চলল, তিন, চার, পাঁচ, ছয়, সাত…আর ঠিক তখনই ওপর থেকে একটা চিৎকার শোনা গেল।
তাড়াতাড়ি আসুন, মালিক মারা যাচ্ছেন…।
আট, নয়, ঘণ্টা বেজেই চলেছে। সিঁড়ি বেয়ে পড়িমরি করে ছুটলেন তারা, দেখলেন লর্ড লিটলটনের বেডরুমের দরজার সামনে ফ্যাকাসে চেহারায় দাঁড়িয়ে আছে উইলিয়াম। দশ, এগারো… ঘরের ভিতর ঢুকে গ্রেভস, এইসকাফ আর অন্যরা দেখলেন যন্ত্রণায় মোচড় খাচ্ছে লিটলটনের দেহ। বারো, মধ্যরাতের শেষ ঘণ্টা বাজল। আর তাদের চোখের সামনেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন লর্ড।
পরে লাইব্রেরিতে জড় হওয়া অতিথিদের পুরো ঘটনাটা খুলে বলল উইলিয়াম।
মালিক তার কামরায় ঢুকে ঘুমানোর জন্য তৈরি হতে শুরু করলেন। তার কাপড় সরাবার সময় দেখলাম বার-বার নিজের ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছেন। আমি চাচ্ছিলাম যতক্ষণ সম্ভব এখানে থাকতে। কারণ খুব আস্তে-ধীরে সব কিছু করছিলেন। বিছানায় গিয়ে বললেন লাগোয়া পর্দাগুলো টেনে দিতে। তারপর আবার নিজের ঘড়ির দিকে তাকালেন, বারোটা বাজতে কয়েক মিনিট বাকি। এবার আমার ঘড়িটা দেখতে বললেন, যখন সময়টা মিলে গেল তখন আশ্বস্ত হলেন। এবার দুটো ঘড়িই কানের কাছে নিয়ে নিশ্চিত হলেন দুটোই চলছে। ওগুলোর দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলেন, মাঝরাত পার হওয়া পর্যন্ত। এবার আমার ঘড়িটা ফিরিয়ে দিয়ে তাঁর ওষুধ তৈরি করতে বললেন। যখন গ্লাস নিয়ে ফিরে এলাম তখন সোয়া বারোটা ( আসলে পৌনে বারোটা)। জোর করে একটা হাসি ফুটিয়ে বললেন, রহস্যময় নারী মোটেই ভাল ভবিষ্যত্বক্তা নন। আর অপেক্ষা করার প্রয়োজন নেই। আমার ওষুধ দাও। ওটা খেয়ে ঘুমানোর তদ্বির করব।
ধীরে-সুস্থে ওষুধটা পান করে আমাকে শুভরাত্রি জানালেন। কিন্তু যখনই ঘুমাতে যাবেন গির্জার ঘড়ি বাজতে শুরু করল। এসময়ই মালিকের দমবন্ধ হয়ে এল। আমাকে কিছু একটা বলার চেষ্টা করলেন। কী বলতে চেয়েছিলেন তা বলতে পারব না, দরজার দিকে দৌড়ে গেলাম আপনাদের, তাঁর বন্ধুদের ডাকতে।
ওহ! রহস্যময় নারী আসলেই ভবিষ্যতে জানত, বিষণ্ণ কণ্ঠে বললেন জনাথন গ্রেভস, আর সে তার কথা রেখেছে…
ফলকে কার নাম?
এবারে একটা স্বপ্নের বর্ণনা দেব। তরে সাধারণ কোনো স্বপ্ন নয়, আর এর পর যে কাকতালীয় ঘটনাটি ঘটে তা চিন্তার খোরাক জোগানোর জন্য যথেষ্ট। এটি পাঠিয়েছেন আইরিশ একটি প্রকাশনীর প্রতিনিধি। তবে নাম গোপন করার শর্ত ছিল তাঁর। আর যেখান থেকে এটি সংগ্রহ করেছি আমরা সেখানেও তার নাম ছিল না। যাক সরাসরি মূল কাহিনিতে চলে যাওয়া যাক।
এই গল্পের নায়িকা আমার এক দাদী। আর সাক্ষীদের একজন আমার বাবা। যখনকার ঘটনা তখন বাবা তার ফুপু (আমার সেই দাদী) এবং আরও কিছু আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে থাকেন।
একদিন সকালে নাস্তার টেবিলে দাদী ঘোষণা করলেন কাল রাতে আশ্চর্য একটা স্বপ্ন দেখেছেন। বাবার সবসময়ই অদ্ভুত বিষয়ের প্রতি একটা মাত্রাতিরিক্ত আকর্ষণ ছিল। তাই পুরো ঘটনাটি তাঁর নোট বইয়ে লিখে রাখেন। সেখান থেকেই এটা বলছি।
দাদী স্বপ্ন দেখেছেন তিনি একটা গোরস্থানে আছেন। ওটাকে গ্লাসনেভিনের কবরস্থানটা বলে চিনতে পারেন তিনি। চারপাশে ছড়িয়ে থাকা মৃতদের নাম, পরিচয় লেখা অনেক ফলক চোখে পড়ল তাঁর। কিন্তু ওগুলোর একটা দৃষ্টি কেড়ে নিল। কী আশ্চর্য! সাদা মার্বেল পাথরে পরিষ্কারভাবে খোদাই করা তার নিজেরই নাম।
ক্লেয়ার এস.ডি.
মৃত্যু ১৪ মার্চ, ১৮৭৩।
সবার ভালবাসার পাত্রী, সবসময় তাকে মনে রাখব আমরা।
আরও আশ্চর্য ব্যাপার, পাথরে খোদাই করা তারিখটা তাঁর স্বপ্ন দেখার দিন থেকে ঠিক একবছর সামনের। তবে আমার দাদী বেশ সাহসী মহিলা। এটাকে খুব একটা পাত্তা দিলেন না। একসময় স্বপ্নটা পুরোপুরি মুছে গেল তাঁর মন থেকে। সময় গড়াতে লাগল। একদিন সকালে নাস্তার টেবিলে তাঁকে দেখা গেল না। সবাই ধরে নিল দাদী গির্জায় গেছেন। তবে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পরও আসতে না দেখে বাবা একজনকে তাঁর কামরায় খোঁজ করতে পাঠালেন, যদি ভিতরে থেকে থাকেন এই মনে করে। দরজায় ধাক্কা দিয়ে কোনো সাড়া না পেয়ে দরজাটা খোলা হলো। বিছানার পাশেই নতজানু হয়ে পড়ে আছেন দাদী। মারা গেছেন আগেই। আর তারিখটা ১৮৭৩ সালের ১৪ মার্চ। ঠিক এক বছর আগে স্বপ্নে যে তারিখটা দেখেছিলেন। দাদীকে কবর দেওয়া হলো গ্লাসনেভিনে। সাদা পাথরের সমাধিফলকে লিখে দেওয়া হলো সেই কথাগুলো, স্বপ্নে দেখা ফলকে যা পড়েছিলেন।
