একা হয়ে যেতেই বার-বার রাতের ঘটনাটা নিয়ে ভাবলেন। এটা কি একটা স্বপ্ন? ঘটনাটা সত্যি বলে মনে হচ্ছিল, কিন্তু এটাও ঠিক-স্বপ্ন সত্যিই মনে হয়। বিছানা থেকে নেমে সাবধানে পর্দাগুলো পরীক্ষা করলেন। গত রাতের রহস্যময় মহিলাটি এখানে দাঁড়িয়ে ছিল তার কোনো প্রমাণই নজরে এল না। তবে এখনও মনের ভিতর জ্বলজ্বল করছে সে। তার চেহারা, কণ্ঠ এমনকী তার বলা কথাগুলো-সব কিছু।
আর স্মৃতিটা মনে পড়তেই কেঁপে উঠলেন। তিনি মরতে চান। এখনও বয়স বেশি হয়নি তার। জীবনটা উপভোগ করছেন। এখন একটা কাজই করার আছে তা হলো বন্ধুদের সঙ্গে এই বিষয়টি নিয়ে কথা বলা।
সকাল হতেই লিটলটনের ডাকে একজনের পর একজন বন্ধু হাজির হতে লাগলেন হিল স্ট্রীটের বাড়িটায়। তাদের প্রত্যেককে গত রাতের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার গল্প শোনালেন লিটলটন। মনেমনে আশা করেছিলেন হেসে উড়িয়ে দিয়ে তাঁকে আশ্বস্ত করবেন তাঁরা। ঘটলও তাই। সবাইই গল্পটায় দারুণ মজা পেলো।
সে কি সুশ্রী ছিল, টমাস? জানতে চাইলেন মাইলস এণ্ড্রুজ।
সুশ্রী নয়, সুন্দরী। জবাব দিলেন লিটলটন।
হেসে গড়িয়ে পড়লেন বন্ধুরা। সুন্দরী? সুন্দরী নারীর স্বপ্ন দেখেছ? যতদূর বোঝা যাচ্ছে তিন দিনের মধ্যে তোমার বিয়ে হবে, মরবে না। সন্দেহ নেই এটা একটা স্বপ্নই। আশা করব কুসংস্কার তোমাকে পেয়ে বসবে না।
আর বন্ধুদের কথা-বার্তা আর যুক্তি শেষ পর্যন্ত লিটলটনকে আশ্বস্ত করল তাঁদের কথাই ঠিক। মন মরা ভাব কেটে যেতে লাগল তার। যদিও যখনই একা হন মহিলার চেহারা আর কথাগুলো হামলে পড়ে স্মৃতিতে। তাই ঠিক করলেন দুশ্চিন্তাটা ঝেটিয়ে মাথা থেকে দূর করে দেবেন, অন্তত তিন দিন পার না হওয়া পর্যন্ত। বাড়িটা তাই লোকজনে ভরপুর করে রাখলেন। সকালের নাস্তা, দুপুরের লাঞ্চ আর রাতের খাবার খেলেন বন্ধুবান্ধবদের নিয়েই।
পরিকল্পনা শেষ পর্যন্ত কাজে লাগল। ধন্যবাদ অবশ্য পাবেন লিটলটনের চমৎকার বন্ধুরা। তারা এমন হাসি-ঠাট্টায় লর্ডকে মাতিয়ে রাখলেন যে, আবার আগের সেই লিটলটন হয়ে উঠেছেন তিনি। হাসি-খুশি, প্রাণবন্ত।
তৃতীয় দিন সকালে খুব ধীরে হেঁটে ডাইনিংয়ে ঢুকলেন লিটলটন। ঘড়িতে তখন সাড়ে দশটা। খুব শান্তভাবে ইতোমধ্যে এখানে উপস্থিত হওয়া বন্ধুদের স্বাগত জানালেন। তার শরীর কেমন জিজ্ঞেস করা হলে কেবল মাথা ঝাকলেন। অন্য বন্ধুদের সঙ্গে উপস্থিত আছেন জনাথন গ্রেভস নামের এক জাদুকর এবং চার্চের অর্গান বাজিয়ে। লর্ডকে নিয়ে আবার দুশ্চিন্তাটা পেয়ে বসেছে তাঁকে। কারণ তাঁর জাদু কিংবা অর্গান বাজানো লিটলটনের ওপর কোনো প্রভাবই ফেলছে না। আবার মন মরা হয়ে গেছেন লর্ড।
তবে রাতের খাবারের সময় মেঘ কেটে গেল লিটলটনের চেহারা থেকে। খাওয়া শেষে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে অতিথিদের তাকিয়ে হেসে বললেন, বন্ধুরা, আমি আবার আগের আমি হয়ে গেছি। তোমাদের ধন্যবাদ।
কিন্তু একটু পরেই আবার বিষণ্ণ হয়ে উঠলেন লর্ড। তিনি যখন কামরা থেকে বেরিয়ে গেলেন তখন গ্রেভস বললেন, কথা বলে আর ঠাট্টা-মস্করা করে তাকে আর খুশি রাখতে পারব না আমরা। বরং আমার মনে হয় এখন একটা প্রতারণার আশ্রয় নেওয়া জরুরি হয়ে পড়েছে।
প্রতারণা? বললেন মি.এইসকফ, তুমি কী বোঝাতে চাচ্ছ?
একবার দরজার দিকে তাকালেন গ্রেভস, তাঁদের আমন্ত্রণদাতা কথাগুলো শুনতে পাবেন না এ বিষয়ে নিশ্চিত হওয়ার জন্য। এটা তেমন কিছু না, খুব নিচু কণ্ঠে বলে চললেন, টমাস মনমরা হয়ে আছে, কারণ সে ভাবছে মাঝরাতে মারা যাবে সে। তার মনে হবে বাড়ির প্রতিটি ঘড়ি তার দিকে তাকিয়ে আছে, বলছে রাত বারোটায় তোমার বারোটা বাজাব আমরা। চার ঘণ্টা, তিন ঘণ্টা, দুই ঘণ্টা এভাবে সময় গুণতে গুণতে তার অবস্থা আরও কেরোসিন হয়ে যাবে। মাঝরাত যখন আসবে তখন দেখা যাবে হতভাগা লিটলটন দুশ্চিন্তাতেই মরেই গেছে। কিন্তু যদি এমন হয় যখন মাঝরাত আসবে, তখন সে যদি শান্তিতে বিছানায় ঘুমায়, তখন বিপদ কেটে যাবে।
কিন্তু কীভাবে মধ্যরাতের আগেই দুশ্চিন্তামুক্ত করতে পারব তাঁকে? জানতে চাইলেন মি. এইসকফ।
অন্যদের দিকে ঝুঁকে পড়ে গ্রেভস বললেন, বাড়ির প্রতিটি ঘড়িকে আমরা আধ ঘণ্টা এগিয়ে দেব। এই বলে নিজের ঘড়িটা পকেট থেকে বের করে সাবধানে ওটার সময় আধ ঘণ্টা এগিয়ে দিলেন। কিছু সময় তর্ক-বিতর্কের পর সবাই মেনে নিলেন বুদ্ধিটা ভালই কেঁদেছেন গ্রেভস। তা ছাড়া এতে তাদের বন্ধুকে চূড়ান্ত সময়ে আধ ঘণ্টা কম দুশ্চিন্তায় থাকতে হবে। তারপর সবাইই নিজেদের ঘড়ি আধ ঘণ্টা করে এগিয়ে দিলেন। এবার জনাথন গ্রেভস বেল টিপে উইলিয়ামকে ডেকে আনলেন। তারপর তাকে পুরো পরিকল্পনাটা খুলে বলে জানতে চাইলেন সে কি বাড়ির সবগুলো ঘড়ির সময় পাল্টে দিতে পারবে কিনা।
হ্যাঁ, স্যর। চিন্তা করবেন না একটুও। এমনকী ড্রেসিং টেবিলের ওপর মালিকের নিজের যে ঘড়িটা আছে, ওটার সময়ও কেমন সুন্দর পাল্টে দিই দেখুন। বলল উচ্ছ্বসিত পরিচারক।
তারপরই লর্ড লিটলটন ফিরে এলেন। আলাপ চলতে লাগল। সাড়ে এগারোটার দিকে লর্ড লিটলটন উঠে দাঁড়িয়ে বললেন এখন ঘুমাতে যাবেন তিনি। সবাইকে শুভরাত্রি জানিয়ে শান্তভাবে কামরা ছাড়লেন।
