আশা করি, আপনি অসুস্থ হয়ে পড়েননি? বলল সে।
না, উইলিয়াম। সেরকম কিছু না। আমি বেশ ভাল আছি। তবে আমার মনে হয় এখন ঘুমাতে যাওয়া উচিত। ক্লান্তি লাগছে, তাছাড়া আবহাওয়াটা কেমন দেখেছ তো। ভারি আর স্যাঁতস্যাঁতে। মনে হচ্ছে যেন একটা ঝড় আসতে চলেছে।
স্নায়ুগুলোকে শান্ত করার জন্য একটা ওষুধ খেলেন লর্ড লিটলটন। তারপর বিশাল খাটটায় শুয়ে পড়লেন। উইলিয়াম খাটের চারধারের পর্দা টেনে দিল। তারপর বাতি নিভিয়ে দিয়ে নিঃশব্দে পা টিপে টিপে বেরিয়ে গেল কামরা থেকে। একটার পর একটা মিনিট পেরিয়ে যেতে লাগল। বাইরের গুমোট আবহাওয়ায় হঠাৎ করেই দমকা বাতাস বইল। বাগানের গাছগুলোতে খস খস শব্দ তুলে বয়ে গেল, আর জানালায় ডালপালা বাড়ি খাওয়ার শব্দ হলো। আর এই শব্দ নিরুদব একটা ঘুমের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াল। বিছানায় এপাশ-ওপাশ করতে লাগলেন লর্ড লিটলটন। মাথায় নানান চিন্তা এসে জট পাকিয়ে যাচ্ছে। তারপর আবার শুরু হয়েছে মুষলধারে বৃষ্টি। এর সঙ্গে তাকে জাগিয়ে রাখার দায়িত্ব নিয়েছে প্যারিস চার্চের ঘড়ির ঢং ঢং শব্দ।
এভাবে মনে হয় কয়েকটা ঘণ্টা পেরিয়ে গেল। আস্তে-আস্তে ঘুমে জড়িয়ে আসছে লিটলটনের চোখ। এসময়ই একটা অন্যরকম শব্দে তন্দ্রা ভাব কেটে গেল। মনে হয় যেন দড়িতে টার্ন পড়েছে এভাবে বিছানায় উঠে বসলেন, আর অন্ধকারের দিকে চেয়ে রইলেন। শব্দটাকে বিশাল কোনো পাখির ডানা ঝাপটানোর আওয়াজের মত লাগল। তবে এটা আসছে কামরার ভিতর থেকে। কিন্তু কোনো পাখি ঘরের ভিতর ঢুকবে কীভাবে, ভাবলেন তিনি। হৃৎপিণ্ডের গতি দ্রুততর হলো তাঁর। ওটা কী? সাহস করে বিছানা ছেড়ে উঠে দেখবেন? নাকি উইলিয়ামকে ডাকবেন?
এসময়ই ডানা ঝাপটানোর শব্দ থেমে গেল। নীরব হয়ে গেল চারপাশ। এটা আরও ভয়াবহ। কামরায় তিনি ছাড়া আরও একটা অশুভ উপস্থিতির আভাস পাচ্ছেন লর্ড। সাহায্যের জন্য জোরে চিৎকার করার তাগিদ অনুভব করলেন। চেষ্টা চালালেন, কিন্তু মুখ ফুটে কোনো আওয়াজ বেরোল না।
খাড়া হয়ে বসা লিটলটনের দৃষ্টি চলে গেল বিছানার কিনারার পর্দার দিকে। তারপরই তাঁর আতঙ্কিত চোখের সামনে ওটা নড়তে শুরু করল। একসময় সরে গেল। দেখা গেল সেখানে অপার্থিব একটা আলোয় দাঁড়িয়ে আছে আগন্তুক। তাঁর সারা জীবনে দেখা সবচেয়ে সুন্দরী, মোহনীয় এক নারী সে। আবার কথা বলার চেষ্টা করলেন। কিন্তু কোনো বোল বেরোল না। তিনি কেবল জায়গাতেই স্থির হয়ে বসে, তাকিয়ে থাকলেন দীঘল শরীরের রহস্যময় নারীটির দিকে।
তারপরই কথা বলে উঠল নারীটি, টমাস, লর্ড লিটলটন, আমার কথাগুলো মনে গেঁথে নাও। মিষ্টি একটা কণ্ঠ, তবে অবশ্যই মানুষের গলার শব্দ না। কণ্ঠটা শুনলে বাতাস আর ঢেউয়ের কথা মনে পড়ে। আবার হালকা একটা প্রতিধ্বনি হয় এর, মনে হয় একই সঙ্গে সব দিক থেকে আসছে। শব্দটা যেন শোনার সঙ্গে সঙ্গে অনুভবও করছেন তিনি।
আমার কথাটা মনে রাখো আর নিজে নিজে প্রস্তুত হও। তিন দিন সময়, তৃতীয় দিন রাত ঠিক বারোটার সময় তুমি মারা যাবে।
প্রস্তুত হও…
আতংকে শিউরে উঠলেন লিটলটন। মুখ বেয়ে ঘাম নামছে টপটপ করে, যখন তিনি আপ্রাণ চেষ্টা করছেন এই ভবিষ্যত্বক্তাকে প্রশ্ন করার। কিন্তু দুর্বোধ্য একটা কর্কশ আওয়াজ ছাড়া আর কিছুই বেরোল না তাঁর মুখ থেকে।
প্রস্তুত হও…প্রস্তুত হও… আস্তে-আস্তে মিলিয়ে গেল রহস্যময় নারীর কণ্ঠস্বর, সেই সঙ্গে গায়েব হয়ে যেতে শুরু করল সে-ও। পর্দাটা ফিরে এল আগের জায়গায়। আবার নীরব হয়ে গেল চারধার। ভয়ে, যন্ত্রণায় বিহ্বল লিটলটন শরীরটা বিছানায় ছেড়ে দিলেন, তারপর নিস্তেজ ভাবে পড়ে রইলেন সেখানে।
সকালে উইলিয়াম এল লর্ডকে ঘুম থেকে জাগাতে। বিছানায় মড়ার মত পড়ে থাকা কাঠামোটাকে দেখে তার মনে হলো, মালিকের নিশ্চয়ই রাতে হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোক হয়েছে। তবে শেষ পর্যন্ত লর্ডকে জাগিয়ে তুলতে পারল উইলয়াম। কিন্তু তাকে মোটেই স্বাভাবিক দেখাচ্ছে না। উইলিয়াম বুঝে উঠতে পারল না কী করবে। সে কি এখনই একজন ডাক্তারের কাছে যাবে? কিন্তু তাহলে বিধ্বস্ত এই মানুষটাকে একা রেখে যেতে হবে। বিছানায় পড়ে আছেন এখন তিনি, চোখ বড় বড়, শরীর এমনভাবে কাঁপছে যেন জ্বর এসেছে। উদ্বিগ্ন উইলিয়ামের প্রশ্নেরও কোনো ভাল উত্তর দিতে পারলেন না। না, তিনি অসুস্থ নন, তবে ভাল নেই। নানান ধরনের অসঙ্গতিপূর্ণ কথা বলতে লাগলেন। একবার বলেন পুরো কামরাটা খুঁজে দেখতে, একবার জানালা বন্ধ করতে বলেন তো আবার তার পরেই জানালা খোলার আদেশ দেন। এই বলেন ডাক্তর ডাকো, পরমুহূর্তেই ডেকো না।
তবে ধীরে-ধীরে স্বাভাবিক হয়ে উঠতে শুরু করলেন লিটলটন। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে উইলিয়াম বলল সে বরং মালিকের জন্য এক বাটি গরুর মাংসের স্যুপ নিয়ে আসছে। তার মনে হয় এখন এটাই লর্ডের জন্য সবচেয়ে দরকারি। ফ্যাকাসে আর বিধ্বস্ত চেহারার লিটলটন সম্মতি জানালেন, হ্যাঁ, মনে হয় স্যুপটা ভাল লাগবে আমার। তাঁর কণ্ঠটা এখন বেশ স্বাভাবিক।
আর মালিক, একজন ডাক্তার ডাকব. কি?
না, এখন আমি ঠিক আছি। খুব সম্ভব আমি একটা দুঃস্বপ্ন দেখেছি। এর কোনো ওষুধ ডাক্তারের জানা আছে কিনা এ ব্যাপারে সন্দেহ আছে আমার। তবে আমার কিছু বন্ধুকে আমি দেখতে চাই। মি.এজ, মি. এইসকফ, মি পিগউ-এদের খবর পাঠাতে হবে। যেসব বন্ধুদের পাশে পেতে চাই তাদের সবার নাম আমি তোমাকে পরে বলছি। এখন স্যুপটা নিয়ে এসো। তারপর আমি বিছানা ছাড়ব।
