লর্ড ডাফেরিন দুঃসাহসী মানুষ। বেরিয়ে এসে লোকটাকে থামিয়ে জানতে চাইলেন, কফিনের ভিতরে কী?
মুখ তুলে তাঁকে দেখল লোকটা। গা কাঁটা দিয়ে উঠল ডাফেরিনের। ভয়ঙ্কর একটা চেহারা। চোখের নীচের হাড় ঠেলে বেরিয়ে এসেছে। মুখ আর শরীরের চামড়া মনে হচ্ছে বহু পুরানো আর শুকনো, খসখসে। যেন একটা কংকালের শরীরে চামড়া লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে।
প্রথমে আতংকে জমে গেলেন লর্ড ডাফেরিন। তবে সাহস সঞ্চয় করে আবার লোকটার কাছে জানতে চাইলেন, এত রাতে কফিনটা কোথায় নিয়ে যাচ্ছ তুমি?
জবাবে লোকটা তার দিকে এগিয়ে এল। তারপরই ডাফেরিনের ভিতর দিয়েই যেন গলে বেরিয়ে গেল এবং অদৃশ্য হলো।
সকালে এখানকার বন্ধুদের ঘটনাটি খুলে বললেন ডাফেরিন। ভুতুড়ে বিয়য়ে ভাল জানাশোনা আছে এমন কয়েকজন লোকের সঙ্গে কথা বললেন। তবে ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূতের এই রাতের অভিজ্ঞতার ব্যাখ্যা দিতে পারলেন না কেউই। ধীরে-ধীরে ঘটনাটি মুছে গেল সবার মন থেকে।
চার বছর পরের ঘটনা। লর্ড ডাফেরিনের নিজের মনেও সেই রাতের ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতার স্মৃতি ফিকে হতে শুরু করেছে। প্যারিসের গ্র্যাণ্ড হোটেলে এক আমন্ত্রণে গিয়েছেন লর্ড।
তাঁর সেক্রেটারি, সহকারি আর ব্যক্তিগত পরিচারকও সঙ্গে গিয়েছেন। লিফটে ঢোকার মুহূর্তে স্থির হয়ে গেলেন লর্ড। হঠাৎই তার মনের পর্দায় ভেসে উঠল চার বছর আগের এক রাতে আয়ারল্যাণ্ডে দেখা লর্ড ডাফেরিন সেই অশুভ মুখটার কথা। লিফটম্যান ওই একই ব্যক্তি। কোনো সন্দেহ নেই তাঁর।
সেক্রেটারি আর সহকারীকে সে রাতের ঘটনা বর্ণনা শুরু করলেন। ইতোমধ্যে লিফটটা তাদের রেখেই চলে গেছে। লর্ড তখনও ভয়ঙ্কর সেই অভিজ্ঞতা বলা শেষ করেননি। এমন সময় চড়া একটা শব্দ হলো। পুরো হোটেলে হৈচৈ পড়ে গেল। লিফটটা যখন পঁচতলায় পৌঁছে তখন দড়ি ছিঁড়ে যায় ওটার, আর নীচে পড়ে ধপাস করে। লিফটে যে কয়েকজন লোক ছিলেন মারা গিয়েছেন সবাই। লর্ড ডাফেরিন দেখলেন হোটেলের কর্মচারীরা মৃত লোকদের সরিয়ে নিচ্ছে লিফটের ধ্বংস্তুপ থেকে। তবে যার কারণে তার লিফটে ওঠা হয় নি, সেই লোকটাকে দেখা গেল না লিফটে।
পরে লর্ড জনতে পারলেন সেদিন হোটেলের লিফটম্যান ডিউটিতেই আসেনি। তবে এই লোকটা এল কোথা থেকে? তার পরিচয়ই বা কী? এই কাহিনিটি লিপিবদ্ধ আছে ব্রিটিশ সোসাইটি অভ সাইকিক রিসার্চ বইয়ে। তবে সেখানে একে দেখানো হয়েছে অমীমাংসিত এক রহস্য হিসাবে। এমনকী এর কোনো সম্ভাব্য ব্যাখ্যাও দেয়া হয়নি।
কফিনে কে?
এবারের ঘটনাটিতে আগের ঘটনাটির সঙ্গে সাদৃশ্য খুঁজে পাবেন। এটি বর্ণনা করেছেন ইংল্যাণ্ডের ক্ল্যাপটনের ব্লারটন রোডের মিসেস ক্রফটস।
তাঁর স্বামীর মৃত্যুর সপ্তাহখানেক আগের ঘটনা এটি। মিসেস ক্রফটস, আর তাঁর স্বামী ঘুমাতে গিয়েছেন বিছানায়। কিন্তু অনেকক্ষণ চেষ্টা করেও ঘুম এল না ভদ্রমহিলার। কিছুক্ষণ এপাশওপাশ করে উঠে বসলেন। এভাবে কিছুক্ষণ বসে থাকার পরই অদ্ভুত একটি বিষয় নজর কাড়ল তাঁর। হঠাত্র সদর দরজাটা খুলে গেল। এখান থেকে ওটা পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছেন। কারণ তাঁদের শোবার ঘরের দরজা খোলাই থাকে সবসময়। দরজা খোলার একটু পরই দুজন লোক ঢুকল বাড়িতে। তবে ভয়ঙ্কর ব্যাপার হলো একটা কফিন বয়ে আনছে তারা। অবাক হলেও কেন যেন সেরকম ভয় হলো না মিসেস ক্রফটসের। তারপরই কফিনটা নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে এল লোক দুজন। মি. আর মিসেস ক্রফটস যে কামরায় আছেন সেখানে চলে এল তারা। ফ্লায়ারপ্লেসের মেঝেতে নামিয়ে রাখল ওটা। তারপর নীচে নেমে সামনের দরজা ভেজিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেল। পুরো সময়টায় একটা কথাও বেরোল না মিসেস ক্রফটসের মুখ থেকে। তারপরই যেন একটা ঘোর থেকে বের হয়ে এলেন মিসেস ক্রফটস। কফিনটারও কোনো নাম-নিশানা পেলেন না।
রাতে আর ঘুমাতে পারলেন না। সকালে নাস্তার টেবিলে স্বামীকে খুলে বললেন গোটা ঘটনাটা। মি. ক্রফটস হেসে স্ত্রীকে বললেন, স্বপ্ন দেখেছেন তিনি। ভদ্রমহিলাও মন থেকে ঝেড়ে ফেললেন ওটাকে। এক সপ্তাহ পর হঠাৎ মারা গেলেন তার স্বামী। সন্ধ্যার পর ওপর তলার একটা কামরায় কাজ করছিলেন মিসেস ক্রফটস। এসময় দরজায় টোকা পড়ল। তিনি ওপরে কাজ করতে থাকায় তার মা দরজা খুলে দিলেন। তারপরই দরজায় পদশব্দ শুনলেন। মুখ তুলে চাইতেই শিউরে উঠলেন। কফিন হাতে দুজন লোক, আর তিনি এক সপ্তাহ আগে যে লোকদুজনকে দেখেছেন তারাই। তারপর এগিয়ে এসে যেখানে আগেরবার রাখতে দেখেছিলেন মিসেস ক্রফটস সেখানেই নামিয়ে রাখল কফিনটা। মিসেস ক্রফটস শুধু আতংক আর বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে রইলেন কফিনটার দিকে।
মৃত্যু পরোয়ানা
টমাস, লর্ড লিটলটনের কাছে রাতে যে এসেছিল, আর ভয়ঙ্কর সতর্কসংকেত দিয়েছিল, সে কি ভূত ছিল নাকি স্বপ্নের কোনো চরিত্র, তা কখনও জানতে পারব না আমরা। এ নিয়ে লেখালেখিও হয়েছে বিস্তর। কিছু লোক ভূতে বিশ্বাস করেন, আবার অনেকে করেন না। এমনকি যখন ভবিষ্যদ্বাণীটা এল তারপরও মনে হয়েছিল ওটা আসলে কিছুই না। এমনকী মৃত্যুর আধ ঘণ্টা আগে লর্ড লিটলটন নিশ্চিন্ত হয়ে গিয়েছিলেন ভুতুড়ে অতিথি স্বপ্ন ছাড়া আর কিছু নন। আসলেই কি তাই?
১৭৭৯ সালের নভেম্বরের এক সন্ধ্যা। লর্ড লিটলটন তাঁর খাস ভৃত্যকে ডেকে বললেন তিনি ঘুমাতে যাবেন। ভুরু কুঁচকে উঠল ভৃত্যের। এত তাড়াতাড়ি ঘুমাতে যাওয়ার অভ্যাস নেই তার মালিকের। সাধারণত বিছানায় যান মধ্যরাতের পরে, কখনও কখনও বাড়িতে অতিথি থাকলে তো ভোর পর্যন্ত আড্ডা চলে। কাজেই কামরা ছাড়ার আগে একটু দ্বিধা করল সে।
