কয়েকটা হাত টেনে তুলল আমাকে।
আমি জ্ঞান হারালাম।
.
যখন জ্ঞান ফিরল, মুখের ওপর রোদ এসে পড়েছে। উঠে বসলাম আমি। সারা শরীরে ব্যথা। দেখলাম আমাকে ঘিরে বেশ কয়েকজন নারী-পুরুষ।
যুবক মত একজন বলল, ‘আমি আপনাকে প্রথমে দেখেছিলাম। আপনি, স্যর, নদীর মাঝখানে আসলেন কোত্থেকে? কী স্রোত, বাপরে বাপ।’
‘হুম,’ আরেকজন বলল। ‘আমি তো দেইখ্যাও বিশ্বাস করি নাই যে ওইটা কোন মানুষ। আপনারে আমরা না দেখলে আপনার বাঁচন লাগত না। মেঘনায় এখন যা স্রোত!’ আমি দুর্বল গলায় বললাম, ‘আমার সাথে আরও দুইজন ছিল। ওদের কি দেখেছ?’
‘না, আমরা শুধু আপনারেই পাইছি।’
‘আমি ঢাকা যাব। আমাকে একটা মাইক্রোবাস ঠিক করে দিলে হবে।’ চট করে নিজের দিকে তাকালাম। একটা লুঙ্গি পরা।
‘স্যর, আপনার প্যান্ট শুকাতে দেয়া হয়েছিল। সব ঠিক আছে।’ একজন বলল।
আমি প্যান্ট-শার্ট পরে নিলাম।
আমার মানিব্যাগটা একজন বাড়িয়ে দিল।
আমি বললাম, ‘ওটা আপনার কাছেই থাকুক।’
‘না, স্যর। আপনার জিনিস আপনি নেন। মেলা টাকা আপনার ব্যাগে। আমাদের অত লোভ নাই।’
লোভ! মাথার ভেতর সেই ছেলেটির কথা বাড়ি খেল।
কী যেন নাম ছেলেটির?
রবিন? হ্যাঁ, রবিন।
ওর আর রুবাইয়েতের জন্য দুশ্চিন্তা হলো আমার। ওরা ভাল আছে তো?
.
এ ঘটনার পর তিন মাস কেটে গেছে। এর মধ্যে রুবাইয়েতের সাথে আমার আর যোগাযোগ হয়নি। সে-ও ফোন করেনি আমাকে। এখন অন্য একজন আমাদেরকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া আসা-যাওয়ার টিকেট দেয়। প্রতি শুক্রবার সকাল ৬:৩৫ মিনিটের পারাবত ট্রেনে উঠি, ফিরি বিকাল সোয়া পাঁচটার দিকে মহানগর এক্সপ্রেসে। শুধু আমি নই, অনেক ডাক্তার এদিন প্র্যাকটিস করতে ব্রাহ্মণবাড়িয়া যায়। এখন যে ছেলেটি আমাদেরকে ট্রেনের টিকেট দেয়, তাকে একদিন জিজ্ঞেস করেছিলাম রুবাইয়েতের কথা। সে মুখ বাঁকিয়ে বলল, ‘ওর কথা আর বলবেন না, স্যর। পিপীলিকার পাখা গজিয়েছে। ছিল ওষুধ কোম্পানির রিপ্রেজেন্টেটিভ, এখন এলিয়নে চড়ে। হাইফাই অবস্থা। কথা কয় না। ফোন নম্বর পাল্টিয়েছে। দেখা হলে চেনে না। আমার মনে হয় স্মাগলিঙের সাথে জড়িত।’
আমি বললাম, ‘মানুষ বদলাতেই পারে।’
‘তাই বলে এমন বদলানো, স্যর? কুত্তা যদি ঘি খায়, পেটে সইবে? সইবে না বলে দিলাম।’
আমি বললাম, ‘সবাই যে যার মত ভাল থাকুক—এটাই তো কাম্য হওয়া উচিত, তাই না?’
সে বলল, ‘ছুঃ। একই সাথে দু’জন এই কোম্পানিতে ঢুকেছিলাম। আমি শালা এখনও ডাক্তারদের ট্রেনের টিকেট কেটেই চলেছি, আর ওই হারামজাদা এলিয়নে চড়ে। বলে, বাপের টাকা। বাপ যেন আর কারও নাই।’
আমি ট্রেনে ফেরার সময়, ট্রেন যখন মেথিকান্দা ঢোকে, আমি খুব আগ্রহ নিয়ে রেললাইনের বাঁ দিকে তাকিয়ে থাকি, সাপমারা বাজারের কোন সাইনবোর্ড আমার চোখে পড়ে না। যে ছয়টি ঘর আমি দেখেছিলাম সেরকম কোন ঘরও দেখতে পাই না। আমি কয়েকজন ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করেছি, তারা উত্তরে বলেছে গ্রামগঞ্জে এধরনের অনেক বিচিত্র নাম থাকে-সব চেনা বা জানার কথা নয়। একসময় আমি নিজেও এসব ভুলে যাই।
একদিন বিকেলে আমি শাহবাগ কেন্দ্রীয় পাবলিক লাইব্রেরিতে যাচ্ছিলাম একটি অনুষ্ঠানে যোগ দিতে। বারবার একটা নাম্বার থেকে আমার মোবাইলে কল আসছিল। আমি সাধারণত অপরিচিত নম্বর থেকে কল এলে ধরি না। তাই এ কলটিও কেটে দিচ্ছিলাম। কিন্তু এতবার কল আসছে যে শেষ পর্যন্ত আমি ধরতে বাধ্য হলাম। বেশ বিরক্ত স্বরে বললাম, ‘হ্যালো।’
‘আপনি কি স্যর বলছেন? নাকি তার পিয়ন?’ একটা মেয়েলি কণ্ঠ।
‘স্যর বলছি।’
‘স্যর, আমি রুবাইয়েতের স্ত্রী।’ দ্রুত গলায় বলল ওপাশ থেকে। ‘আপনাকে ক’দিন ধরে ট্রাই করছি। পাচ্ছি না। রুবাইয়েত খুব অসুস্থ। আপনাকে কী যেন বলতে চায়। আপনি আসুন, স্যর।’
‘কী হয়েছে ওর? ও তো আমার সাথে যোগাযোগই করে না।’
ওকে মাফ করে দিন, স্যর। আপনি কোথায় আছেন? আমি গাড়ি পাঠাচ্ছি। ও খুবই অসুস্থ।’
‘ও কোন্ হাসপাতালে আছে বলো। গাড়ি পাঠানো লাগবে না। আমি যাব দেখতে।’
‘হাসপাতালে না, স্যর। বাসায়। উত্তরা ১৪ নং সেক্টর। আমি, স্যর, ড্রাইভারকে বলে দিচ্ছি। গাড়ি, স্যর, গুলিস্তানে আছে।’
‘আমি তো শাহবাগে। তুমি তাহলে পাবলিক লাইব্রেরিতে পাঠাও। আমার নম্বর দিয়ে দিয়ো।’
‘ঠিক আছে, স্যর। অনেক ধন্যবাদ।’
পাবলিক লাইব্রেরির অনুষ্ঠানে আমার আর যাওয়া হলো না। আমি গেটের কাছে পৌঁছতে গাড়িও চলে এল। নতুন ঝকঝকে গাড়ি। ড্রাইভার আমাকে চিনল। গাড়িতে তুলেই আর দেরি করল না। হর্ন বাজিয়ে চলতে শুরু করল।
‘একটু আস্তে চালাও,’ আমি তাকে মাঝে-মাঝে সতর্ক করে দিলাম। কিন্তু সে আমার কথা শুনছে বলে মনে হলো না। তার ইচ্ছামত সে গাড়ি চালাচ্ছে।
এসির মধ্যে ঠাণ্ডায় ঘুম চলে এসেছিল প্রায়। ড্রাইভারের ডাকে তন্দ্রা ছুটল। ‘স্যর, চলে এসেছি। নামেন।’
সুন্দর, দোতলা বাড়ি। সামনের লনে সবুজ ঘাস আর বিভিন্ন ধরনের ফুলের গাছ। আমি গাড়ি থেকে নামতেই এক তরুণী দৌড়ে এল। ‘স্যর, আমি আপনাকে ফোন করেছিলাম। রুবাইয়েত দোতলার ঘরে আছে, চলুন।’
আমি সিঁড়ি বেয়ে উঠতে-উঠতে ভাবলাম, ব্যাটা ভালই কামিয়েছে।
ঘরে ঢুকলাম আমি। চমকে গেলাম রুবাইয়েতকে দেখে। এ কাকে দেখছি আমি! প্রাণচঞ্চল এক যুবক যেন রাতারাতি বৃদ্ধে পরিণত হয়েছে।
