চোখে শূন্য দৃষ্টি। এলোমেলো চুল। অর্ধেকের বেশি পেকে গেছে। চোখের নিচে কালি। মনে হয় কতদিন ঘুমায় না। আমাকে দেখে ফ্যাসফ্যাসে গলায় বলল, ‘স্যর, আমাকে মাফ করে দেন। আপনার পায়ে পড়ি, স্যর, আমাকে মাফ করেন।’
সে সত্যি-সত্যি আমার পা ধরতে এল। আমি দ্রুত পেছনে সরে গেলাম। ‘কী হয়েছে, রুবাইয়েত?’
‘পাপের ফল, স্যর। লোভ করেছিলাম। উফ…’ রুবাইয়েত দু’হাতে তার মাথা চেপে ধরল।
‘যন্ত্রণায় মরে যাচ্ছি।’ মাথার চুল টানতে-টানতে বলল সে। ‘সারাক্ষণ যন্ত্রণা।’
‘ওষুধ খাও না?’
‘ওষুধ!’ হিস্টিরিয়া রোগীর মত হাসল সে। ‘ওষুধ বাইটা খাইলেও কিছু হবে না। আমার মাথা, স্যর, ছিঁড়ে যাচ্ছে।’
‘রুবাইয়েত, শান্ত হও।’ আমি বললাম।
‘কীভাবে শান্ত হব, স্যর। ঘুমাতে পারি না। মাথার মধ্যে খসখস শব্দ হয়। মনে হয় কী যেন নড়ছে। কখনও মনে হয় আমার মাথার মধ্যে, স্যর, সাপ জন্মাইছে।’
‘কী আবাল-তাবোল চিন্তা তোমার!’
‘আমি সত্যি বলছি। হঠাৎ মোচড় দিয়ে নড়ে ওঠে। ব্যথায় আমি প্রায় মরে যাই। কেন যে লোভ সামলাতে পারলাম না।’
‘কীসের লোভ?’
ওই পোলাডারে চাইপা ধরতেই আমারে কইছিল, স্যর, ওই পোলা, যার দাদাকে সাপে খাইছিল!’
‘বলো, শুনছি।’
কথা বলতে রীতিমত কষ্ট হচ্ছে রুবাইয়েতের। ঘন-ঘন শ্বাস নিতে-নিতে বলল, ‘আপনাকে তো, স্যর, খুঁজে পেলাম না। মনে করছিলাম সাপের পেটে গেছেন। আমরা ওই রাতেই দৌলতকান্দি চলে আসি। ওই পোলা শোনাল তার দাদার মরার কাহিনি। সাপদের আক্রোশের কথা। একটা কুয়া আছে ওখানে। বিষ ভর্তি কুয়া। সাপেরা ওখানে তাদের বিষ ঢালে। ওর দাদা ওই বিষ নিয়ে বেচত। জানেন তো, স্যর, কোটি টাকা দাম। আমিও শুনে লোভ সামলাতে পারিনি। এই দেখেন, স্যর, কী দামি বাসায় থাকি। সাপের বিষের টাকায় কেনা। ওই পোলারে সাথে নিয়ে আমি দিনের বেলা গিয়েছিলাম। পানির বোতলে কইরা বিষ নিয়ে আসি। যদি জানতাম ওগুলো সাধারণ সাপ না-’
দু’হাতে জোরে মাথা চেপে ধরল রুবাইয়েত।
‘স্যর, মরে যাচ্ছি, স্যর। এত যন্ত্রণা-মাথাটা, স্যর, ফাইটা যাচ্ছে।’
দেখলাম যন্ত্রণায় মোচড় খাচ্ছে রুবাইয়েতের শরীর। ভাল করে তাকালে মনে হবে যেন একটা সাপ।
ঘাড় বাঁকিয়ে-বাঁকিয়ে সে অদ্ভুত শব্দ করছে। আমি কী করব বুঝতে পারছি না।
তার দিকে এগোতেই সে হাত নেড়ে নিষেধ করল। ‘স্যর-স্যর-স্যর…’ শেষ একথাটাই শুধু বলতে পেরেছিল সে। ঠাস করে একটা শব্দ হলো।
একই সময়ে তার ভেতরে যেন একটা শিশু গুঙিয়ে উঠল।
পড়ে গেল সে।
তার মাথার খুলি চুরমার হয়ে গেছে।
আমি চোখ বড় করে তাকিয়ে রইলাম। যেখানে মগজ থাকার কথা সেখানে মগজ নেই।
একটা কুণ্ডলী পাকানো সাপ!
ফোঁস-ফোঁস শব্দ করতে-করতে সে রুবাইয়েতের মাথার ভেতর থেকে বেরিয়ে এল। কালো, কুৎসিত। লেজ নাড়ছে। জিভ বের করছে মাঝে-মাঝে। মুখটা হাঁ করল একটু। সারি-সারি দাঁত! আমি পাথরের মত শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম।
বিশাল ফণা তুলেছে সাপটা।
হিসহিস শব্দ হচ্ছে।
মনে হচ্ছে শব্দের পরিমাণ আরও বেড়ে যাচ্ছে। এখন পুরো ঘর জুড়ে শুধু হিসহিস শব্দ।
আমি দৌড়নোর শক্তি হারিয়ে ফেললাম।
রুবাইয়েত পড়ে আছে মেঝেতে।
সাপটা তার পায়ের কাছে গেল। ছোবল মারার মত ঊরুতে কামড় বসাল। টেনে এক খাবলা মাংস নিয়ে এল। চিবোতে লাগল। আমি বমি করে ফেললাম।
সাপটা ঘুরে তাকাল আমার দিকে। কী বীভৎস দেখতে! জ্বলজ্বল করছে তার চোখ। ঠোঁট গোল করে মনে হলো শিস দিল!
হিসহিস শব্দে ভরে উঠল ঘর। অবাক হয়ে দেখি জানালা দিয়ে ওরা ঢুকছে!
আমি গোনার চেষ্টা করলাম। পারলাম না। কালো, মাংসল সাপ।
যেন আমার দিকে খেয়াল নেই ওদের।
এগোতে লাগল দল বেঁধে।
তারপর এক যোগে ঝাঁপিয়ে পড়ল রুবাইয়েতের লাশের ওপর!
ছায়া – রাজীব চৌধুরী
স্যর, ভীষণ বিপদে পড়ে আপনাকে লিখতে বসেছি। আমার কিছু করার ছিল না। চাইনি আপনাকে এভাবে বিরক্ত করতে। কিন্তু আমার অন্য কোনও উপায় খোলা ছিল না। সমস্যাটার উৎস হচ্ছে আপনার দেয়া নতুন পাণ্ডুলিপিটি, যেটা গত ১৯ তারিখ আপনি আমাকে দিয়েছিলেন। আপনার অনুমতি পেয়ে সেই পাণ্ডুলিপি আমার বাসায় নিয়ে গিয়েছিলাম, আপনার মনে আছে নিশ্চয়ই। হাতে লেখা সেই পাণ্ডুলিপি ত্রিশ মিনিটের মাথায় পড়ে শেষ করেছিলাম। গল্পটা পড়ে অবাক হয়েছিলাম যে একজন নতুন লেখক এত সুন্দর শব্দ চয়ন কী করে করল, আর কী করেই বা এত গুছিয়ে লিখল।
কিন্তু গল্পটা পড়ার পর থেকেই সমস্যার শুরু। এই গল্পটিতে শিলা নামের এক চরিত্র আছে। গল্পে প্রেমিক শিলাকে খুন করে এবং তার পরের সব ঘটনা লেখা ছিল। অসাধারণ জীবন্ত লেখা, পড়ে মনে হচ্ছিল যেন আমি ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী। এই গল্পটা পড়ে আমি ঘুমাতে গেলাম রাত দেড়টার দিকে। কিছুক্ষণ পরে হঠাৎ করে ঘুমটা ভেঙে গেল, চোখ খুলে মনে হলো আমার ঘরে কেউ আছে। উঠে বাতি জ্বেলে পিছনে ফিরতেই দেখি একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। প্রচণ্ড চমকে গেলাম, এত রাতে এই মেয়ে কোথা থেকে এল, কোনওভাবেই মাথায় ঢুকছিল না। মেয়েটা লাল শাড়ি পরেছিল, হাতে একগাছি লাল রঙের রেশমি চুড়ি, সঙ্গে ঠোঁটে লাল লিপস্টিক। মেয়েটা কাঁদছিল। হঠাৎ করেই মনে পড়ল সেই পাণ্ডুলিপির ‘শিলা’ চরিত্রের কথা। লেখকের বিবরণ অনুযায়ী যখন শিলাকে তার প্রেমিক খুন করে, তখন শিলার সাজপোশাক এমনই ছিল!
