‘তাকে কে খাবে?’ বিরক্ত না হয়ে পারলাম না তারা কথায়।
‘তারা খাবে…যারা আমার বাবারে খাইছিল।’
‘কারা তারা?’
ছেলেটা এবার গলা বাড়িয়ে এদিক-ওদিক তাকাল। তারপর ফিসফিস করে বলল, ‘সাপগুলা!’
আমি এবার স্পষ্ট বিরক্ত হলাম। বললাম, ‘সাপে কখনও মানুষ খায়? দেখেছ? আহাম্মক কোথাকার!’
‘হ্যাঁ, দেখেছি,’ সে বলল। ‘আমার সামনে আমার বাবাকে সাপগুলা পুরা খাইয়া ফেলছিল।’
এবার গায়ে কাঁটা দিল আমার। মনে হলো ছেলেটা মিথ্যা বলছে না। এ বয়সী একটা ছেলের মিথ্যা বলার কোন কারণ নেই, তবু আমি ফিসফিস করে বললাম, ‘আমি থাকতে তোমার ভয় নেই। চলো, তোমার দাদাকে দেখে আসি। একটা মানুষকে এভাবে ফেলে রেখে যেতে নেই।’
‘কিন্তু ওরা টের পেলে-’
‘কারা?’
‘সাপগুলা!’
‘শোনো, ছেলে, তুমি হয়তো কোথাও কোন সাপের গল্প পড়েছ বা শুনেছ। বাস্তবের সাথে তাকে গুলিয়ে ফেলছ। এধরনের কোন সাপ পৃথিবীতে নেই।’
ছেলেটি এবার আমার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘তাহলে ওই ঘরগুলা?’
‘কোন্ ঘরগুলো?’
‘ওই যে রাস্তার পাশে, এখানে ঢোকার মুখে। ছয়টা ঘর।’
কেন জানি না আমি একটু কেঁপে উঠলাম। বললাম, ‘কী হয়েছে ঘর নিয়ে? ঘর তো যেখানে খুশি থাকতেই পারে।’
‘না, ওইগুলা সাপেদের ঘর। ইয়া বড়, তালগাছের মত সব সাপ থাকে ওখানে। মানুষ খায়।’
আমি ছেলেটার দিকে ভাল করে তাকালাম। বললাম, ‘তোমার মায়ের কথা এখনও বলো নাই। ওনাকেও কি সাপে খেয়েছে? নাকি অন্য কোথাও বেড়াতে গেছেন?’
আমার রসিকতাটুকু বুঝল না সে। বলল, ‘আমার জন্মের সময় মা মারা গেছে। ‘
পুরো পথ একটা কথাও বলল না রুবাইয়েত। শুধু মাঝে-মাঝে ছেলেটার দিকে তাকাতে লাগল। আমি ছেলেটার একটা হাত ধরে আছি, পাছে সে দৌড় দেয়, তাই।
সে এমনভাবে এগোচ্ছে যেন পুরো পথ তার মুখস্থ। একসময় হাঁটার গতি থামাল সে। আঙুল তুলে বলল, ‘ওই যে-’
চাঁদের আলোয় দেখলাম একটা কাঠের ঘর। ভেতরে আলো জ্বলছে কিনা বোঝা যাচ্ছে না।
‘আপনারা যান, আমি যাব না।’ ছেলেটি বলল।
আমি বললাম, ‘মনে হয় ঘরে কেউ নেই। আলো জ্বলছে না।’
‘তাহলে এতক্ষণে দাদাকে খাইয়ে শেষ করে ফেলছে,’ নির্বিকার গলায় বলল ছেলেটি।
ঠিক তখনই চিৎকারটি শুনতে পেলাম। ঘরের মধ্য থেকে আসছে।
‘আমার দাদা…আমার দাদাজানকে হারামিগুলা খাইয়া ফেলতেছে…’ ছেলেটি আমার কাছ থেকে তার হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করছে। ‘বাঁচান, আমার দাদারে বাঁচান। ভুল করছিল সে। লোভে পড়ছিল, কিন্তু মানুষটা ভাল…
আমি সজোরে ছেলেটার গালে চড় মারলাম। সে হুমড়ি খেয়ে মাটিতে পড়ল।
আমি রুবাইয়েতকে বললাম, ‘ওকে ধরে রেখো, আমি আসছি।’
দৌড়ে ঘরের কাছে গেলাম।
কান পাতলাম দরজায়। ভেতরে কোন সাড়া-শব্দ নেই।
ছেলেটা কি তাহলে বানিয়ে বলেছে সব?
সবটাই শিশু মনের কল্পনা?
উঁকি মারার চেষ্টা করলাম।
ভেতরটা এত অন্ধকার যে কিছুই দেখা যায় না। হঠাৎ মনে হলো পকেটে তো মোবাইল আছে, মোবাইলের টর্চটা তো জ্বেলে দেখতে পারি।
পকেট থেকে মোবাইল বের করে টর্চ জ্বাললাম।
নাহ, আশপাশটা খুব শান্ত, খুব নিশ্চুপ।
দরজায় ফুটো খুঁজতে লাগলাম, ওখান দিয়ে টর্চের
আলো ফেলে ভেতরটা দেখা যায় কিনা।
কোন ফুটো পেলাম না। ভেতর থেকে দরজা বন্ধ।
আস্তে কয়েকবার ঠেলাও দিলাম। না, দরজা বন্ধ। ঘরের পেছনের দিকটায় চলে গেলাম।
কাঠের দেয়াল মেঝে থেকে চাল পর্যন্ত।
একটা জানালাও কি নেই?
আমি প্রতিটা কাঠে আলো ফেলছি। খুব মনোযোগের সাথে ফাঁক-ফোকর খুঁজছি।
এতক্ষণ খেয়াল করিনি যে ঘরের পশ্চিম পাশে একটা ছোট জানালা রয়েছে! মাটি থেকে দাঁড়ালে আমার গলা সমান উঁচুতে। আমি এগিয়ে গিয়ে জানালাটা আস্তে ঠেলা দিতেই খুলে গেল। মোবাইল উঁচু করে আলো ফেললাম ভেতরে এবং একই সাথে উঁকি দিলাম। আমি চিৎকার দিয়ে উঠেছিলাম কিনা মনে নেই। যে দৃশ্য ভেতরে দেখলাম তা আমাকে মৃত্যু পর্যন্ত তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াবে। এর চেয়ে ভয়াবহ দৃশ্য আমি আমার জীবনে দেখিনি। মুহূর্তের মধ্যেই ‘আমার সব দেখা হয়ে গেল।
মনে হয় ওরা জানত! তাই এত নিশ্চুপ ছিল। ওদের সবক’টা আমার দিকে তাকিয়ে আছে। একেকটার সারিবদ্ধ দাঁত। হাঁ করে আছে সবাই। লালা ঝরছে মুখ দিয়ে। এমন বীভৎস, কুৎসিত সাপ পৃথিবীতে আছে আমার জানা ছিল না। আমার বুক সমান উঁচুতে ফণা তুলে সবক’টা দাঁড়িয়ে আছে। কালো, কুচকুচে, ভয়ঙ্কর। বিশাল মুখ। সামনে পড়ে আছে অর্ধেকের বেশি খাওয়া ক্ষত-বিক্ষত একটি লাশ! আমি মোবাইল ফেলে রেখেই দৌড় দিলাম।
পেছনে শিশুদের গোঙানির মত শব্দ। আমি দৌড়চ্ছি প্রাণপণে। দেখলাম, আমাকে দৌড়তে দেখে ওই ছেলেটা আর রুবাইয়েতও দৌড়নো শুরু করেছে। পেছনে তাকানোর সাহস নেই। প্রাণপণে ছুটছি। চারদিকে হিসহিস শব্দ আর শিশুর গোঙানি। দৌড়তে দৌড়তে হঠাৎ মনে হলো পায়ের নিচে আর মাটি নেই, আমি বাতাসে ঝাঁপ দিয়েছি।
পড়ে যাচ্ছি আমি। কতক্ষণ জানি না।
ধপ করে পানিতে পড়লাম।
পড়েই পানির অনেক নিচে তলিয়ে গেলাম। দম বন্ধ হয়ে এল আমার। মনে হচ্ছে বুক ফেটে যাবে। আর সম্ভব নয়। মুখটা খুলতে যাব, ভুস করে ভেসে উঠলাম।
শরীরে শক্তি নেই এক বিন্দু।
শুধু ভেসে থাকার চেষ্টা করলাম পানির ওপর।
মনে হয় কোন মাছ ধরার নৌকা যাচ্ছিল।
আমাকে দেখতে পেয়ে কাছে এগিয়ে এল।
