‘আমরা আসলে কোথায় যাচ্ছি?’ নীরবতা ভঙ্গ করে আমি বললাম।
‘রাতটা কাটাতে হবে কোথাও,’ বলল রুবাইয়েত। ‘আসলে, স্যর, এখন বুঝতে পারছি ট্রেন থেকে নামাটাই আমাদের ভুল হইছে। দেখি সামনে কোন বাড়ি-ঘর পাই কিনা।’
‘অথবা চায়ের দোকান,’ আমি বললাম। ‘টায়ার্ড লাগছে।’
‘জি, স্যর, টায়ার্ড লাগছে। বাতাস কেমন যেন।’ রুবাইয়েত বলল।
হাঁটতে-হাঁটতে কাঁধের ব্যাগ থেকে পানির বোতল বের করল রুবাইয়েত। ‘স্যর, পানি খান, ভাল লাগবে।’
আমি বললাম, ‘তুমি খেয়ে তারপর দাও।’
রুবাইয়েত বোতল থেকে ঢকঢক করে পানি খেল। তারপর আমার দিকে বাড়িয়ে দিল সেটা। আমি ধরার আগেই মনে হলো সেটা ছোঁ মেরে কেউ নিয়ে চলে গেল। ঠিক এক সেকেণ্ডেরও কম সময়। একটা ছায়া যেন সরে গেল। কেমন গন্ধ লাগল নাকে।
আমরা হতভম্বের ভাব কাটিয়ে ওঠার আগেই প্রায় দশ ফুট দূরে বোতলটি আছড়ে পড়ল। পেছনে শোঁ-শোঁ একটা শব্দ শুনলাম। তারপর সড়াৎ করে কিছু চলে যাবার শব্দ। ঝট করে পেছনে তাকালাম। কিছু নেই। মনে হলো দূরে ছায়ার মত কিছু একটা হঠাৎ অদৃশ্য হলো। দৌড়ে বোতলের কাছে গেলাম। নিচু হয়ে ওঠাতে যাব, রুবাইয়েত আচমকা চিৎকার করে বলল, ‘স্যর, ধরবেন না ওটা।’
আমি তার দিকে তাকিয়ে বললাম, ‘কেন?’
‘দেখুন, স্যর,’ বলল সে। ‘ভাল বোতল, অর্ধেকটা পানিতে ভরা ছিল। এখন দোমড়ানো, মোচড়ানো। মনে হচ্ছে গরম পানিতে সেদ্ধ করা হয়েছে। দেখুন গলে গেছে কিছুটা। আমার ভয় লাগছে। কী হয়েছিল, স্যর, একটু আগে? বোতলটা থাবা দিয়ে নিয়ে গিয়েছিল কে? চলুন, স্যর, আমরা পালাই।’
আমিও যে অবাক হইনি তা নয়। ভয় আমারও কিছুটা লাগছে। যদিও মাথার ওপরে চাঁদ জ্যোৎস্না বিলাচ্ছে অকাতরে। তবু কেমন ভৌতিক পরিবেশ। মনে হচ্ছে জনমানবশূন্য পরিত্যক্ত এক গ্রাম এটা।
‘ট্রেন থেকে আমাদের নামাটাই ঠিক হয়নি,’ বিড়বিড় করে বলল রুবাইয়েত। ‘খুব ভুল হয়ে গেছে।’
আমি বললাম, ‘চলো, ফিরে যাই।’
পেছনে পথের দিকে ইঙ্গিত করে বললাম, ‘ওই পথেই তো এসেছি। ওদিক দিয়ে গেলে নিশ্চয়ই রেললাইনটা খুঁজে পাব। রেললাইন পেলে আর চিন্তা নেই। ‘
‘ওদিক দিয়ে?’ অনিশ্চয়তার সুরে বলল রুবাইয়েত। ‘কতবার বাঁক নিয়েছি, পথ আর খুঁজে পাব কিনা কে জানে? রাত, স্যর, দুটো বাজতে চলল। সকাল পর্যন্ত যে এখানে অপেক্ষা করব, সে উপায়ও নেই।’
‘তবু তো এখান থেকে যেতে হবে।’
‘জি, স্যর। যেতে হবে।’
‘চলো, ফিরতি পথই ধরি।
‘জি, স্যর। সেটাই ভাল হবে।’
ঘুরে আবার হাঁটতে শুরু করলাম আমরা। কিন্তু মনে হলো এটা ভিন্ন কোন পথ। কারণ গাছপালা বেশ ঘন হয়ে আসছে ধীরে-ধীরে। চাঁদের আলো ক্রমে ম্লান হচ্ছে। হঠাৎ কোন শিশুর গুঙিয়ে ওঠার শব্দ শুনলাম। থেমে পড়লাম আমরা। আবার নিস্তব্ধতা। তাকালাম সামনে। একসাথে অনেকগুলো ছায়া যেন সরে গেল।
‘আমরা পথ হারিয়ে ফেলেছি,’ একটু কাঁপা গলায় বললাম আমি।
‘জায়গাটা ঠিক স্বাভাবিক না,’ প্রত্যুত্তরে বলল রুবাইয়েত।
‘চুপ, কে যেন আসছে!’
আমি আর রুবাইয়েত একে অপরের গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে রইলাম।
রাস্তাটা ঠিক সোজা নয়, তাই দেখা যাচ্ছে না কে আসছে। শুধু হালকা পায়ের ছুটে আসার শব্দ শোনা যাচ্ছে। আমরা চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলাম। এবং দেখলাম তাকে।
একটা কিশোর!
আটকে রাখা নিঃশ্বাস ছাড়লাম।
চাঁদের আলোয় তার মুখ দেখা যাচ্ছে। ভীত, শংকিত এক মুখ। আমাদেরকে খেয়াল করেনি সে। দৌড়ে আসছে। যেন পেছনে তাড়া করছে কিছু।
কাছে আসতেই আমি খপ করে তার একটা হাত ধরে ফেললাম। সে ‘বাবাগো’ বলে এক চিৎকার দিয়ে আমার বুকের ওপর আছড়ে পড়ল।
আমি বললাম, ‘ভয় পেয়ো না। কে তুমি?’
‘আমি…আমি…’ সে তোতলাতে লাগল। ‘আপনারা কারা? এখানে কী করেন?’
‘তুমি কে সেটা বলো!’
আমাদের দিকে তাকাল সে। এখনও হাঁপাচ্ছে।. হাঁপাতে-হাঁপাতে বলল, ‘মানুষই তো মনে হচ্ছে আপনাদের। চলেন এখান থেকে। একটুও দেরি করবেন না।’
‘আগে বলো তুমি কে!’ ধমক দিলাম আমি। ‘কোত্থেকে আসছ? যাচ্ছই বা কোথায়?’
‘আমি রবিন।’ মনে হচ্ছে রীতিমত কাঁপতে শুরু করেছে সে। ‘ওইখানে আমাদের বাড়ি-’ দূরে অন্ধকারের দিকে হাত তুলে দেখাল। ‘আমি আমার দাদাকে রেখে পালিয়ে এসেছি। দৌলতকান্দি-মামাদের বাড়ি চলে যাব।’
‘কিন্তু এত রাতে কেন? দৌড়াচ্ছই বা কেন? আর দাদাকেই বা রেখে কেন? তুমি তো অনেক ছোট। একা- একা এভাবে-’
‘ওরা-ওরা আমার দাদাকে খেয়ে ফেলবে এখন। আমার বাবাকে যারা খেয়েছে-’
‘তোমার কথা বুঝতে পারছি না আমি, কী বলছ!’
‘বলছি, আমার দাদাকে ওরা এখন খেয়ে ফেলবে। আমি জানি। আমার বাবারও ঠিক এরকম হয়েছিল। আহ্, কী যন্ত্রণা ছিল তার মাথায়। পাগল হয়ে গিয়েছিল! দাদারও এখন একই অবস্থা। ছাড়েন আমাকে।’
‘না, আমি বললাম। ‘চলো, তোমাদের বাড়ি যাব। তোমার দাদাকে দেখব।’
অবাক হয়ে ছেলেটি তাকাল আমার দিকে। বারো কি তেরো বছর বয়স ওর। খালি গা। পরনে হাফপ্যান্ট। পা দুটোও খালি। টিপিক্যাল গ্রামের ছেলেরা যেমন হয়।
‘আপনি কি পাগল নাকি?’ ছেলেটা বলল।
আমি বললাম, ‘না, আমি ডাক্তার। চলো, তোমার দাদার কী রোগ হয়েছে, দেখি।’
‘কোন রোগ হয় নাই,’ একটু শান্ত হলো সে। ‘এটা লোভের ফল। আমি কইছিলাম, দাদা, লোভ কইরেন না। বাবা মরছে, আপনিও মরবেন। আমার কথা শোনে নাই দাদা। এতক্ষণে মনে হয় তারে খাইয়া ফেলাইছে।’
