মানুষের চিৎকার শোনা যাচ্ছে। রুবাইয়েত বলল, ‘স্যর, আপনি থাকেন। আমি দেখে আসি ব্যাপারটা কী।’
ট্রেন থেকে নেমে গেল সে। প্রায় দশ মিনিট পর ফিরে এল। ‘খুব বেশি মারাত্মক অবস্থা না, স্যর। তবে মালবাহী ট্রেনটা হাইগা দিছে। লাইন থেকে আউট। আমাদের শুধু সামনের বগিটা পড়ছে। মরে নাই কেউ।’
‘কীভাবে?’
‘কোন্ বানচত যেন ফিশপ্লেট খুলে ফেলেছে। কাল অবরোধ আছে, তাই। ভাগ্য ভাল যে ড্রাইভারের চোখে পড়ছিল। তাই বাঁইচ্যা গেছি। শুধু খবিশের খ বগিটা—’
‘পড়ে গেছে?’
‘পুরা পড়ে নাই। কাত হয়ে আছে। গরুর গ. বগিও।’
‘আচ্ছা, চুপ করো। এখন, ঠিক হবে কখন?’
‘মেলা দেরি হবে। ঢাকা থেকে উদ্ধার কর্মীরা আসবে, তারপর।’
‘সে তো ভোর হয়ে যাবে। কিছুদিন আগে সিলেটের পারাবত ট্রেনের বগি লাইনচ্যুত হয়েছিল, দশ ঘণ্টা লেগেছিল লাইন ক্লিয়ার হতে।’
‘জানি, স্যর, কুত্তার ক বগি এক্কেরে উল্টে গেছিল।’
আমি চোখ বুজলাম।
কিছুক্ষণ পর রুবাইয়েত বলল, ‘এক কাজ করলে কেমন হয়, স্যর? আমরা বরং নেমে যাই। ট্রেন লাইন বাদ দিয়া রাস্তায় ঢুকি। রাত বেশি হয় নাই। বাসে করে ঢাকায় ফিরব।’
‘মন্দ নয়,’ আমি বললাম। ‘সকালে আবার শালার সেমিনার আছে। এখন কোথায় আমরা, বলো তো?’
ট্রেনের জানালা দিয়ে মাথা বের করল রুবাইয়েত। বাইরে কাকে যেন জিজ্ঞেস করল। তারপর মাথা টেনে এনে বলল, ‘মেথিকান্দা। মনে হয় নরসিংদীর মধ্যে।’
‘হুম, নরসিংদীর রায়পুরা থানার থানার একটা গ্রাম মেথিকান্দা।’
‘স্যর, চিনেন নাকি?’ রুবাইয়েত তাকাল আমার দিকে।
‘ঠিক চিনি না। তবে ডা. দীপুর কাছে নাম শুনেছি। ওর বাড়ি নরসিংদী।’
‘এই জন্য বলতে পারছে। নইলে কার ঠেকা অন্য জায়গার নাম মনে রাখার?’
আরও একটু অপেক্ষা করে ট্রেন থেকে নামলাম আমরা। আমার ব্যাগটা রুবাইয়েত হাতে নিয়েছে। ওরটা বাম কাঁধে। আমি বললাম, আমার ব্যাগটা আমিই নিতে পারব। কিন্তু সে কথা শুনল না। দু’জনে সামনে এগোলাম। অনেকদিন পর ঝিঁঝি পোকার ডাক শুনলাম।
হাঁটছি আমরা। ক্রমেই ম্লান হয়ে আসছে আলো।
আমি বললাম, ‘কই, আমি তো কোন রাস্তা দেখি না। এখনও বিলের মধ্যেই আছি।’
রুবাইয়েত বলল, ‘বিল কই দেখলেন, স্যর? ওই যে বাম পাশে গ্রাম। গ্রামে ঢুকব, নাকি সামনে এগিয়ে যাব বুঝতে পারছি না। মেথিকান্দা কি শেষ হয়েছে?’
‘আমি কীভাবে বলব?’ অনেকটা পথ হেঁটে হাঁপিয়ে উঠেছি আমি। আকাশে মেঘের আড়াল থেকে বেরিয়ে এল চাঁদ। বিরান এক এলাকা। মানুষের কোন চিহ্ন নেই। ‘এভাবে না চিনে না বুঝে ট্রেন থেকে নেমে আসাটা আমাদের ঠিক হয়নি,’ আমি কিছুটা হতাশার সুরে বললাম। ‘কোন জীবজন্তু সামনে এসে পড়লে পালাতেও পারব না।’
‘স্যর, খারাপ চিন্তা করবেন না। এখানে একটা বড় রাস্তা থাকার কথা। বাস চলাচলের।’ রুবাইয়েত বলল।
আমি বললাম, ‘বাস কেন, অন্য কোন বাহনেরও চিহ্ন কোথাও দেখছি না। আদৌ কোন রাস্তা আছে কিনা কে জানে। আমরা কি ভুল পথে এলাম?’
‘স্যর, সামনে মনে হয় বাজার। কয়েকটা ঘর দেখা যাচ্ছে। বাজারের মতই তো মনে হচ্ছে।’
চাঁদের আলোয় দেখলাম, আসলেই তাই। চার-পাঁচটা ছোট-ছোট ঘর। সামনে ফাঁকা জায়গা।
‘স্যর, বাজার যেহেতু একটা আছে, রাস্তাও তাহলে আছে।’ বলল রুবাইয়েত।
‘অনেকদিন এতটা পথ হাঁটিনি,’ আমি বললাম। ‘একেবারে ঘেমে গেছি।’
‘আরেকটু পথ, স্যর।’
বাতাসের ছিটে ফোঁটা নেই।
চাঁদের ঘোলাটে আলোয় কেমন এক ভৌতিক পরিবেশ।
গুনে দেখলাম ছয়টা ঘর একই লাইনে।
ভেতরে আলো নেই।
মনে হয় ঘুমিয়ে পড়েছে, অথবা দোকান বন্ধ করে সবাই বাড়ি চলে গেছে।
নেহায়েত সাধারণ ঘর। টিনের চাল। কাঠের দেয়াল।
সামনে ছোট্ট বারান্দা।
সবগুলোর কাঠামো একই।
তবু কেন জানি না আমার শরীর কেঁপে উঠল।
মনে হলো ওগুলোর ভেতর ভয়ঙ্কর কিছু একটা আছে!
রুবাইয়েত বলল, ‘চলেন, স্যর, ওই বারান্দায় বসে একটু বিশ্রাম নিই।’
আমি বললাম, ‘না। ওখানে আমি বসব না। চলো সামনে যাই।’
‘স্যর, আমরা কি পথ হারাইছি?’
‘বুঝতে পারছি না।’
‘অদ্ভুত!’
‘কী?’
‘স্যর কি জায়গাটার নাম খেয়াল করেছেন? ওই দেখেন ভাঙা সাইনবোর্ড।’
আমি একটা খুঁটিতে টানানো সাইনবোর্ডটা পড়লাম: সাপমারা বাজার।
‘হুম, নামটা অদ্ভুত।’ আমি বললাম।
‘স্যর, এখন কী করব? বাঁয়ের রাস্তাটায় যাব? নাকি এখানে বসে থাকব? নাকি রেললাইন ধরে সামনে হাঁটতে থাকব?’
হঠাৎ আমার মনে পড়ল আমার পকেটেই তো মোবাইল ফোন রয়েছে, আমি কাউকে ফোন করছি না কেন?
আমি দ্রুত প্যান্টের পকেট থেকে মোবাইল বের করে ফোন করতে যাব, দেখি নেটওয়র্ক নেই।
রুবাইয়েতকে বলতে সে-ও তার মোবাইল বের করল।
‘স্যর, আমারটায়ও নেটওয়র্ক নেই। মনে হয় এদিকে মোবাইলের টাওয়ার নেই।’
‘একেবারে অজপাড়া গাঁ।’
‘জি, স্যর।’
‘নাম সাপমারা বাজার।’
‘জি, স্যর, খুবই অদ্ভুত নাম।’
ঘরগুলো পেছনে রেখে সামনে এগোলাম।
আমার পাশে-পাশে হাঁটছে রুবাইয়েত।
আমরা একটা বাগানের মধ্যে ঢুকে পড়লাম।
চারপাশে সুনসান নিস্তব্ধতা। কেবল আমাদের হেঁটে যাবার শব্দ ছাড়া আর কোন শব্দ নেই।
নীল আলোয় ভেসে যাচ্ছে চারদিক। কোন মানুষজনের চিহ্ন চোখে পড়ছে না। অজপাড়া গাঁ, হয়তো সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। শেয়াল কিংবা কুকুরের ডাকও নেই। এ ধরনের গ্রামে অন্য কোন প্রাণী না হোক, শেয়াল বা কুকুরের ডাক শোনা যাবেই। অবশ্য এমনও হতে পারে, যে গ্রামের মানুষ সন্ধ্যার পরেই ঘুমিয়ে পড়ে সে গ্রামে শেয়াল বা কুকুরও তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে যায়। এমনকী ঝিঁঝি পোকারাও।
