‘ইতিমধ্যে লোকজন জড় হয়েছে। জাল টান দেয়া হলো। ইমাম সাহেবের স্ত্রীকে পাওয়া গেল-মৃত। বাচ্চাটার কোন হদিস পাওয়া গেল না। ইমাম সাহেব বেচারা অর্ধ- উন্মাদ হয়ে এলাকা ছেড়ে চলে গেলেন। সেই থেকে ভরা পূর্ণিমারাতে পুকুর পাড়ে একটা বাচ্চার কান্নার শব্দ পাওয়া যায়। পরবর্তীতে অন্য কোন ইমাম ওখানে স্থায়ী হতে পারেননি।’
নাইম দীর্ঘক্ষণ চেপে রাখা নিঃশ্বাসটা আস্তে করে ছাড়ল। ওরা তিনজন চুপচাপ বসে আছে। কারও মুখে কোন কথা নেই। যেন কোন কালে ছিলও না। সহসা জহির বলল, ‘আমি মাঝে মধ্যে সেই কান্না শুনতে পাই।’
‘মানে? তুই এখনও শুনতে পাস?’ বারেক নিশ্চিত হতে চাইল।
‘হ্যাঁ, এখনও। প্রথম শুনি যখন আমার বৃদ্ধ দাদা পানিতে ডুবে মারা যান। শেষ বয়সে তেমন হাঁটাচলা করতে পারতেন না; কিছুটা মাথা খারাপের মত হয়ে গিয়েছিল। তাঁকে গোসল করিয়ে দিতে হত। আমার ছোটচাচা কাজটা করতেন। কেউ গোসল করিয়ে দিলে দাদার তৃপ্তি হত না। তিনি বলতেন, ‘পুহইরে নাইম্মা গোসল দিতে পারলে শইলডায় আরাম অইত। এই, ছালেক, এট্টু নামাইয়া দে না, বাজান!’ এভাবে চাচার কান ঝালাপালা করে দিতেন। একসময় ছোটচাচা আমাদের বাড়ির অগভীর পুকুরে দাদাকে নামিয়ে দিতেন। ইচ্ছেমত কাদাপানি খেয়ে দাদার পেট ভরে গেলে তাঁকে তোলা হত। এরপর কিছুদিন তিনি ঠাণ্ডা থাকতেন। আবার শুরু হত, ‘পুহইরে নাইম্মা গোসল দিতে পারলে শইলডায় আরাম অইত।’ এরপর আবার তাঁকে পুকুরে ছেড়ে দেয়া। ব্যাপারটা আমার কাছে অমানবিক লাগত। কিন্তু আমার দাদা এতেই শান্তি পেতেন।
‘একরাতে সেই কান্নার শব্দে আমার ঘুম ভাঙল। বিছানায় জড়সড় হয়ে জেগে জেগে আমি সেই শব্দ শুনলাম অনেকক্ষণ। কিন্তু দিনের আলোয় সব ভুলে গেলাম। সেদিন সকালেই ক’দিনের জন্য খালাবাড়ি বেড়াতে গিয়েছিলাম। দুপুরের দিকে আমাকে খবর দিয়ে আনা হলো, দাদা নেই! পুকুরে নামানোর কয়েক মিনিটের মধ্যে তাঁর মৃত্যু।
‘এরপর আমাদের পাশের বাড়িতে তিনটা বাচ্চা পানিতে ডুবে মারা গেল। সেবারও আগের রাতে আমি সেই কান্নার শব্দ শুনলাম। এভাবে আরও একবার। এরপর আমি বুঝতে পারলাম আমার চারপাশে পানিতে ডুবে মরার ব্যাপারটা আমি কীভাবে যেন আগে থেকেই টের পেয়ে যাই।’
‘দাঁড়া, এখন নিশ্চয়ই বলবি আজও তুই তেমন কিছু শুনতে পেয়েছিস?’ কিছুটা ব্যঙ্গ করে বলল বারেক।
জহির মাথা নিচু করে চুপচাপ বসে রইল। অনেক সময় পর মুখ খুলল ও, ‘ঠিকই বলেছিস। গতরাতে আমি সেই কান্না শুনতে পেয়েছি।’
চারপাশে হুট করে অসহ্য নীরবতা নেমে এল। কিছু রাতজাগা পতঙ্গ ডাকছিল, সেগুলো হঠাৎ একসাথে থেমে গেল। যেন ওরাও অবাক হয়েছে জহিরের কথা শুনে; এখন ভয়ে ভয়ে অপেক্ষা করছে পরবর্তী ঘটনার জন্য। ঘাটলার পাশেই একটা কদম গাছে কিছু বাদুড় ঝুলছিল, সেগুলো ডানা ঝাপটে উড়ে গেল। অসহ্য নীরবতা ভাঙল কুকুরটা। দুইবার করুণ সুরে ডেকে উঠল। নাইমের দম বন্ধ হয়ে আসতে চাইল। হঠাৎ বারেক উঠে দাঁড়াল; দেখে নাইম আর জহির দু’জনেই ভয় পেল। ওরা বারেককে চেনে। এবার ও পুকুরের পানিতে নামার জন্য আগের চেয়েও বেশি বেঁকে বসবে। ওকে ফেরানোর উপায় নেই। ওরা দু’জন ভয়ে ভয়ে তাকিয়ে রইল। দাঁড়িয়ে আড়মোড়া ভেঙে ওদের দু’জনকে অবাক করে দিয়ে বারেক বলল, ‘অনেক রাত হয়েছে। চল, রুমে গিয়ে শুয়ে পড়ি।
সাপ ভয়ঙ্কর – মিজানুর রহমান কল্লোল
চট্টগ্রাম থেকে ঢাকার উদ্দেশে ছেড়ে আসা ‘মহানগর গোধূলি’ ট্রেন রাত আটটার দিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া স্টেশনে পৌছলে হুড়মুড় করে ‘ছ’ বগিতে উঠে পড়লাম আমি। আমাকে টিকেট কেটে দেয় যে ছেলেটি, রুবাইয়েত, একটি ওষুধ কোম্পানির রিপ্রেজেন্টেটিভ, সে উঠবে ভৈরব থেকে। সব টিকেট তার কাছে। আমাকে মোবাইলে মেসেজ পাঠানোর পরেও ফোন করে জানিয়েছে, ‘স্যর, আপনি উঠবেন ছাগলের ছ-তে।’
আমি বললাম, ‘বুঝেছি, ছ।’
সে আবার চিৎকার করে বলল, ‘স্যর, ছ। ছাগলের ছ। চোরের চ না কিন্তু।’
আমি বললাম, ‘আচ্ছা।’
সে চিৎকার করে বলল, ‘চিন্তা করবেন না, স্যর। আমি ভৈরব থেকে উঠব। ৩১ আর ৩২ নম্বর সিট আমাদের। সেকেন্দার স্যরকে ফোনে পাচ্ছি না। আপনি একটু কাইগুলি তাকে ফোন করে বলবেন, তার বগি জ। স্যর, জানোয়ারের জ।’
আমি বললাম, ‘আচ্ছা, বলব।’
রুবাইয়েত আবার চিৎকার করল, ‘স্যর, বেলাল স্যরের টিকেট ম্যানেজ করতে পারিনি। ওনাকে বলবেন, উনি যেন কিছু মনে না করেন। একটা স্ট্যাণ্ড টিকেট কেটে উঠে পড়তে বলেন। পরে সিট দেখা যাবে। আসলে, স্যর, ওনার টিকেট আমি ইচ্ছা করেই কাটি নাই। উনি আমার ওষুধ লেখেন না।’
আমি বললাম, ‘ঠিক আছে। ট্রেন চলে এসেছে, আর কথা বলা যাচ্ছে না।’
‘ওকে, স্যর। ছাগলের ছ।’
ট্রেনের সিটে বসতেই আমার ঝিমুনি এল।
ট্রেন বা গাড়িতে চলার সময় কখনওই আমি চোখ খুলে রাখতে পারি না।
ঝিমুনির মধ্যেই বুঝতে পারলাম ট্রেন ভৈরব স্টেশনে থেমেছে, রুবাইয়েত এসে বসেছে আমার পাশে। ঝমঝম করে ট্রেন আবার চলতে শুরু করেছে। আমি রুবাইয়েতের গায়ে হেলান দিয়ে ঘুমিয়ে গেলাম।
হঠাৎ ঝাঁকি দিয়ে ট্রেন থেমে গেল।
আমি ধড়মড় করে উঠে বসলাম।
‘কী হয়েছে?’ আচমকা ঘুম ভেঙে গিয়ে বুঝতে পারলাম না এভাবে ট্রেন থামল কেন।
