‘“চলেন, একটা গোসল দেই।”
‘চমকে পেছন ফিরে দেখি আমাদের একজন সদস্য। বয়সে আমার কিছু বড়।
‘“এমন চমৎকার পানি! কাল সকালে তো চলেই যাব। তাছাড়া শরীরটাও কেমন ম্যাজম্যাজ করছে,” সে ব্যাখ্যা করল।
‘আসলে আমার মন এমন কিছুই চাইছিল। তাই রাজি হয়ে গেলাম। তাছাড়া সেদিন ছিল প্রচণ্ড গরম। ভাদ্র মাসের গরম যাকে বলে। ঘাটলায় কাপড়চোপড় রেখে আমরা নেমে পড়লাম। আহ, কী শান্তি! আমাদের দেখাদেখি আরও দু’জন মুরুব্বি ধরনের লোক নেমে গেল। আমি ভাবলাম, দিনের আলোয় তো পানির তলায় দেখা যায়; এখন ডুব দিয়ে দেখি চাঁদের আলোয় কতটা দেখা যায়। অবশ্য বেশি দেখতে পাওয়ার কথা নয়। তবু আমি লম্বা দম নিয়ে পানির গভীরে ডুব দিলাম।’
এ পর্যন্ত বলে জহির থামল। চারদিকে সুনসান নীরবতা। ওরা দু’জন তন্ময় হয়ে জহিরের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। জহির লম্বা দম নিয়ে আবার শুরু করল। মনে হলো ও যেন সেদিনের মত গভীরে ডুব দিচ্ছে।
‘ডুব দিয়ে যখন পানির গভীরে গেলাম আমার বিস্ময়ের সীমা রইল না। পানির তলায় তাকিয়ে মনে হলো পুরো পুকুরটা যেন কাঁচের তৈরি। আমি সমস্তটা দেখতে পাচ্ছি দিনের চেয়েও স্পষ্ট! পানির মধ্যে ডুবে থাকা বাঁশের আগা, পানির উপরের হিজলগাছ, একটু দূরে যারা গোসল করছে তাদের হাত, পা, দূরের শাপলা গাছের মূল, এমনকী পুকুরের তলার ঝিকমিকে বালুরাশি। চাঁদের আলো এসে পড়ছে সেই বালুর পিঠে। পানির দোলায় বালুরাশি নড়ছে আর ঝিকমিক করছে। আমি কতক্ষণ এভাবে ছিলাম জানি না। হঠাৎ হুঁশ হলো। আমি এতক্ষণ পানির নিচে কীভাবে! এমন সময় শুনতে পেলাম বাচ্চা কণ্ঠের একটা কান্নার আওয়াজ। ঠিক তাই। প্রথম ভেবেছিলাম বুঝি পানির ওপর থেকে শব্দ আসছে। সাথে সাথে মনে হলো তা সম্ভব নয়। পরে আবিষ্কার করলাম শব্দটা পানির তলায় একপাশ থেকে আসছে।
‘তখন আমার এই বোধ ছিল না যে পুকুরের তলায় একটা বাচ্চা কীভাবে আসবে, আর কীভাবেই বা কাঁদবে। আমি কান্নার উৎসের দিকে এগোলাম। দু’পাশের পানি কেটে একটু সামনে যেতেই দেখলাম ওকে।
এক বছর বয়সী উলঙ্গ এক শিশু। পুকুরের তলায় উপুড় হয়ে বসে আমার দিকে পেছন ফিরে কাঁদছে। আমি ওর কাছাকাছি যেতেই ও হামাগুড়ি দিয়ে সামনে ছুটল। তখনও কাঁদছে বাচ্চাটা। আমি স্থান-কাল ভুলে ওর পেছনে ছুটলাম। কতক্ষণ ছুটলাম মনে নেই। ছুটতে ছুটতে মনে হলো বহুদূর চলে এসেছি; কিন্তু পথ শেষ হয় না। ক্লান্ত হয়ে গেলাম। তবু ছুটলাম আমি। আর প্রাণপণ চেষ্টা করলাম বাচ্চাটাকে চোখে চোখে রাখতে। কিন্তু একসময় ঠিকই হারিয়ে ফেললাম। ওকে হারিয়ে ফেলে উদ্ভ্রান্তের মত হয়ে গেলাম। এতক্ষণে আমার খেয়াল হলো দম ফুরিয়ে আসছে, আমি পানির তলায়! ক্লান্তিতে আমার চোখ বুজে এল। আমি ঘুমিয়ে পড়লাম।
‘যখন ঘুম ভাঙল দেখলাম হ্যাজাকের তীব্র আলো। আমি মসজিদের বারান্দায় শুয়ে আছি। চারদিকে লোকজন ছুটোছুটি করছে, চিৎকার-চেঁচামেচি করছে। এত আলো, এত মানুষ দেখে ক্লান্তিতে আমি আবার ঘুমিয়ে পড়লাম।
‘পরবর্তীতে জেনেছি, আমি ডুব দেয়ার সময় কেউ একজন লক্ষ করেছিল। লোকটা প্রথমে আমার দমের তারিফ করছিল। কিন্তু অনেক সময় পরেও যখন দেখল উঠছি না তখন ভয় পেয়ে সে অন্যদের ডাকল। প্রথমত সবাই ডুবাডুবি করে খুঁজল। না পেয়ে এলাকার লোকজন জড় করল। অনেক লোক মিলে পুকুর চষে ফেলল, কিন্তু আমার পাত্তা নেই। ততক্ষণে বড় মাছ ধরা জাল নিয়ে জেলে এসে গেছে। ওরা অনেকবার টান দিয়ে আমায় তুলল। আশ্চর্য ব্যাপার, আমার পেটে কোন পানি ছিল না।
‘ওদিকে আমাদের বাড়িতে খবর গেলে আব্বা সহ লোকজন ছুটে এল। আসলে আমার আব্বা শুরু থেকেই জানতেন আমি এখানে আছি। কিন্তু তিনি চাচ্ছিলেন আমি যেন নিজের থেকেই ঠিক হয়ে বাড়ি ফিরে আসি। সে রাতেই আব্বা আমায় নিয়ে বাড়ি ফিরলেন।
‘বাড়ি ফেরার পর ভয়াবহ জ্বর পেয়ে বসল আমায়। বিছানায় পড়ে রইলাম অনেকদিন। হুঁশে-বেহুঁশে কেবল একটা ব্যাপার ঘটে। সেদিনের বাচ্চাটাকে দেখতে পাই। আবার মাঝে মাঝে দূর থেকে ভেসে আসে কচি কণ্ঠের পরিচিত কান্নার আওয়াজ। এভাবে কতদিন ছিলাম মনে নেই। একসময় সুস্থ হয়ে উঠলাম। এতদিনে ক্ষণিকের জন্যও সেই অদ্ভুত পুকুরের কথা আমি ভুলিনি। সেই আশ্চর্য পুকুর আমায় প্রবল আকর্ষণে টানছিল। ওখানে কিছু একটা ব্যাপার আছে। আমায় জানতে হবে ওটার সব ঘটনা 1
‘একদিন আব্বাকে নিয়ে গেলাম ওই এলাকায়। একজন বয়স্ক লোকের কাছে শুনলাম সব ঘটনা। ওই মসজিদে অনেককাল আগে একজন ইমাম ছিলেন, যিনি তাঁর স্ত্রীকে নিয়ে মসজিদের পাশেই একটা ছাউনি দিয়ে থাকতেন। ইমাম সাহেবের স্ত্রী যখন সন্তানসম্ভবা তখন হঠাৎ করে এক সন্ধ্যায় তার ওপর খারাপ আছর পড়ল। অল্প বয়সী মেয়ের মাথা পুরোপুরি আউলা হয়ে গেল। গায়ে মাথায় কাপড় রাখে না, অশ্রাব্য গালিগালাজ করে। ইমাম বেচারা পড়লেন মহা মুসিবতে। স্ত্রীকে ঘরের মধ্যে বেঁধে রাখেন। এরই মধ্যে তাদের ছাউনি ঘর আলোকিত করে একটা ফুটফুটে মেয়ে জন্ম নিল। মেয়ে জন্ম নেয়ার পর ইমাম সাহেবের স্ত্রী পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়ে গেল। ইমাম সাহেবও নিশ্চিন্ত হলেন। তাঁর সংসারে সুখ যেন উপচে পড়ে। মেয়েটা যখন হামাগুড়ি দিতে শুরু করল একরাতে স্ত্রীর কান্নার শব্দে ইমাম সাহেব লাফিয়ে উঠলেন। দেখলেন তাঁর আদরের মেয়ে নেই! বেচারা ইমাম সাহেব পাগলের মত হয়ে গেলেন। চারদিকে খুঁজলেন। কোথাও বাচ্চা নেই। এমন মুহূর্তে হঠাৎ তাঁর স্ত্রী পানিতে ঝাঁপ দিল। এতক্ষণে ইমাম সাহেব বুঝতে পারলেন, স্ত্রীই তাঁর মেয়েকে পানিতে ফেলেছে।
