‘আধপাকা দীর্ঘ রাস্তাটার দু’পাশে নিচু ধানখেত। রাস্তা থেকে কিছুটা দূরে একপাশের ধানখেতের মধ্যে হঠাৎ একটা ঝোপের মত। আধপাকা রাস্তা থেকে একটা সরু কাঁচা পথ ধানখেতের মধ্য দিয়ে চলে গেছে ঝোপ পর্যন্ত। তল্পিতল্পা নিয়ে আমরা কাঁচা রাস্তায় নেমে পড়লাম। ঝোপের মত জায়গাটার কাছাকাছি আসতেই চোখে পড়ল বহু পুরনো এক মসজিদ। মসজিদের পাশে বাঁধানো লম্বা একটা কবরস্থান। যখন মসজিদের কাছে পৌছলাম, দেখলাম পাশের ওটা আসলে কবরস্থান নয়, ঈদের নামাজের জায়গা। ঝকঝকে পরিষ্কার ঈদগাহ। মসজিদের চারপাশে জায়গা কম। সামনে বড় একটা পুকুর। বলে নেয়া ভাল, এমন পুকুর আমার জীবনে দেখিনি। কাচের মত স্বচ্ছ টলটলে জল। হালকা নীলাভ জলে পুকুরের পাড় ছুঁইছুঁই। মসজিদের দরজা বরাবর বহু পুরনো একটা ঘাটলা। সেই ঘাটলার শেষ ধাপটা পর্যন্ত পুকুরপাড়ে দাঁড়িয়ে স্পষ্ট দেখা যায়। আমি তখনও সুইমিংপুল দেখিনি। তাই অবাক হয়ে ভাবছিলাম এমন স্বচ্ছ পানি কীভাবে হয়! এখন আমার মনে হয় ওটা ছিল প্রকৃতির তৈরি একটা সুবিশাল সুইমিংপুল, যা পৃথিবীর সবচেয়ে স্বাদু পানি দিয়ে পূর্ণ করা হয়েছিল। চমৎকার সেই পুকুরপাড়ে ঘাটলায় বসেই আমার চোখ জুড়িয়ে গেল। নিমিষে মুছে গেল দিনের ক্লান্তি। পুকুরের দু’পাশে ঘন বাঁশবন। বিশাল বাঁশের আগা পুকুরের জলে মাথা ডুবিয়ে আছে। যেন তৃপ্তি ভরে তৃষ্ণা মেটাচ্ছে। পুকুরের অন্য পাশটায় কিছু বুনো গাছগাছালি। তার মধ্যে একটা বয়স্ক হিজল গাছ। হিজল গাছটাও পানি ছুঁইছুঁই অবস্থায় পুকুরের ওপর শুয়ে আছে। গাছের নিচের দিকের দু’-একটা ডাল বাতাসের ভারে নুয়ে কখনও-কখনও আলতো করে পানি ছুঁয়ে দিচ্ছে। সব মিলিয়ে এমন একটা ছবি-মনে হলো এই ছবির দিকে তাকিয়ে আমি বহুকাল কাটিয়ে দিতে পারব।
‘আমি মসজিদের চারপাশটা ঘুরে দেখতে লাগলাম। মসজিদের ডানপাশে সেই ঈদগাহ মাঠ, আর বাম পাশে অরক্ষিত কবরের সারি। প্রায় কবরের মাঝেই বৃত্তাকার গর্ত খোঁড়া। বাইরে রান্না করার জন্য যেমন চুলা খোঁড়া হয় তেমন। কবরস্থানের পাশ দিয়ে প্রায় হারিয়ে যাওয়া একটা রাস্তা ধরে কিছুদূর সামনে জঙ্গলের মধ্যে টয়লেট। রাস্তার চেহারা দেখেই বুঝলাম বহুকাল এতে কেউ পা রাখেনি। মসজিদের সাথে টিনের ছাপরা দেয়া এক চিলতে বারান্দা। চারপাশটা দেখে নিয়ে বারান্দায় বসতে না বসতেই হঠাৎ আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামল। থামার লক্ষণ নেই। এই বৃষ্টিতে ভিজে কিছুক্ষণ পর রোগা মত লিকলিকে একটা লোক হাজির হলো। কাঁচুমাচু হয়ে বলল, ‘ইমাম সাব অসুস্থ। আপনেরা নামাজ পইরা নিয়েন।’ এতটুকু বলে সে আমাদের হাতে মসজিদের চাবি দিয়ে বৃষ্টির মধ্যে হারিয়ে গেল।
‘পুরো ব্যাপারটা আমার কাছে কেমন যেন লাগল। সারা দিনে ওই ঠ্যাঙার মত মানুষটা ছাড়া আর কারও দেখা পেলাম না। যাই হোক, আমরা ক্লান্ত ছিলাম, তাই সিদ্ধান্ত হলো আগে গোসল করে বিশ্রাম নেব। গোসলের কথা বলতেই আমার মন ভাল হয়ে গেল। দৌড়ে গিয়ে পুকুরে নামলাম। আহ, তোদের বলেছিলাম পানির রঙ, কিন্তু এর স্পর্শও যে অপূর্ব তখন টের পেলাম। পানির মধ্যে মাছ ছুটোছুটি করছে, আমরা তা স্পষ্ট দেখছি। পানিতে অনেক দাপাদাপি করলাম। যখন ডুব দিয়ে গভীরে গেলাম, তখন দেখলাম পানির তলায় নিজের হাত-পা সব স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। পুকুরের পানিতে সাধারণত এমন হয় না। তাই ব্যাপারটায় কেমন ভয় ভয় লাগল। পানির গভীরে আর গেলাম না সেবার। কিন্তু ওপরে ভেসে ভেসে বৃষ্টির ফোঁটা গায়ে মাখলাম।
‘এভাবে কেটে গেল পরের দিনও। এর মধ্যে দ্বিতীয় কোন মানুষ মসজিদের আশপাশে দেখিনি। আমাদের দলে লোক ছিল ছ’জন, আমি সহ সাত। ওই ছ’জনের মধ্যে হঠাৎ অসন্তোষ দেখা দিল…’
‘এই, থাম!’ জহিরকে হাত তুলে থামাল বারেক। ‘তুই যে দলটার কথা বলছিস তাতে মাত্র ছ’জন লোক হয় কী করে?’ বারেকের কথা শুনে বোঝা গেল এতক্ষণ খুব মনোযোগ দিয়ে শুনছিল।
‘হ্যাঁ, হয়তো বেশি থাকার কথা। কিন্তু তারা ছ’জন ছিল। আমি কী করব?’ হাত নেড়ে এমনভাবে বলল জহির, যেন বোঝাতে চাইল আসলেই ওর কিছু করার ছিল না।
নাইম তাড়া দিল, ‘তুই আগে বাড়…’
জহির আবার শুরু করল…
‘হ্যাঁ, যা বলছিলাম। দলের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিল। তাদের নিয়ম হলো নতুন কোথাও যাওয়ার আগে একজন সেখানকার খোঁজখবর নেয়। কিন্তু এখানে এসে দেখা গেল নানান প্রতিবন্ধকতা। পুরো দলটার হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকা ছাড়া উপায় ছিল না। এভাবে তৃতীয় দিনে এসে পৌছলাম। আগামীকাল সকালে দলটা অন্যত্র যাত্রা করবে। আর আমি চলে যাব বাড়ি। কেননা ইতিমধ্যে মশার কামড় আর টয়লেট সমস্যায় আমার জেদ পুরোপুরি উবে গেছে। সেদিন আমি একাকী এলাকাটা ঘুরে এলাম। সন্ধ্যায় যখন ফিরলাম তখন তাদের মধ্যে ছোটখাটো একটা ঝগড়া হয়ে গেছে। থমথমে ভাব। মাগরিবের নামাজের পর সবাই যে যার মত ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ল। আমি পুকুরপাড়ে গিয়ে বসে রইলাম। ধীরে ধীরে রাত বাড়ছে। আমি ঘাটলায় বসে একমনে পানির দিকে তাকিয়ে আছি। আকাশে শুক্লপক্ষের চাঁদ। স্বচ্ছ পানিতে তলিয়ে যাওয়া পাকা ঘাটের ওপর চাঁদের আলো রূপালি ঢেউয়ের সৃষ্টি করছে। ঘাটের একপাশ থেকে দুলতে দুলতে অন্য পাশে চলে যাচ্ছে সেই ঢেউ। আমি তাকিয়ে আছি চৈতন্য হারিয়ে।
