শরতের রাত। পরিচ্ছন্ন আকাশে বিশাল চাঁদ। রূপালী জ্যোৎস্নায় ঝলমল করছে প্রকৃতি। এমন সব রাতে ওরা তিনজন হল ছেড়ে বেরিয়ে পড়ে। ঘুমন্ত ক্যাম্পাসের শূন্য পথে হেঁটে বেড়ায়। কখনও স্টেডিয়ামের পাশে, কখনও আমীর আলী হলের মাঠে, আবার কখনও স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে পা ঝুলিয়ে বসে থাকে। ঝড়ের মত ছুটে আসা নিশাচর ট্রেনের আচমকা হুইসেলের শব্দে পার্শ্ববর্তী সোহরাওয়ার্দী হলের ছেলেরা যখন পাশ ফিরে শোয়, ওরা তখন বিপজ্জনকভাবে লাফিয়ে উঠে প্ল্যাটফর্মে দাঁড়ায়। ছুটে আসা দ্রুতগামী ট্রেনটা ওদের চোখেমুখে বাতাসের ঝাপটা মেরে শহরের স্টেশনের দিকে হারিয়ে গেলে ওরা ওটাকে অভিশাপ দিতে দিতে আবার পা ঝুলিয়ে বসে যায়। এভাবে কাটিয়ে দেয় রাত। ওদের অবাক লাগে, একটু রাত বাড়লেই সমস্ত ক্যাম্পাস ঘুমিয়ে পড়ে। রাতের ক্যাম্পাসের এই অপার্থিব সৌন্দর্যের কথা কেউ জানেই না! এই সৌন্দর্য না দেখেই একজন শিক্ষার্থী কেবল ডিগ্রী হাতে ক্যাম্পাস ছেড়ে চলে যায়। আহা!
হাঁটতে হাঁটতে ওরা সোহরাওয়ার্দী হলের সামনে চলে এল। নাইম বলল, ‘চল, আজ সোহরাওয়ার্দীর পুকুরপাড়ে বসি।’
ওরা তিনজন পুকুরপাড়ের সিমেন্টের পাকা বেঞ্চিতে বসে। কুকুরটা ওদের সামান্য দূরত্বে ঘাসের ওপর শুয়ে পড়ে। জহির শিস বাজিয়ে একটা গান ধরার চেষ্টা করে। নাইম বেঞ্চির ওপর আঙুল দিয়ে তবলা বাজায়। হঠাৎ বারেক বলল, ‘চল, আজ পুকুরে নেমে বসে থাকি। দেখ, পুকুরের জলে কী মায়াবী জ্যোৎস্না। চল, গায়ে মাখি!’
নাইম আঙুল বাজানো থামিয়ে বলল, ‘খারাপ বলিসনি। এই রাতে পুকুরে না নামলে রীতিমত অন্যায় হবে। কিন্তু কাপড় আনতে রুমে যাবে কে?’
‘কাপড়ের জন্য ভাবছিস কেন? কাপড় খুলেই নেমে পড়ব। এত রাতে দেখবে কে?’ বলে হেসে উঠল বারেক। হেসে ফেলল নাইমও।
এতক্ষণে মুখ খুলল জহির, ‘কী সব বলছিস বেহায়ার মত! তা ছাড়া এত রাতে আমরা কেউ পুকুরে নামছি না।’
‘আমরা বলছিস কেন? বল আমি নামছি না। তোর না নামাই ভাল রে। পানিতে হঠাৎ জলবুড়ি ঠ্যাঙ টেনে ধরবে।’ বলে বারেক আবার হো হো করে হেসে উঠল। কুকুরটা বোধহয় ঘুমিয়ে পড়েছিল। বারেকের বিশ্রী হাসির শব্দে ঘুম ভেঙে দুইবার ঘেউঘেউ করে প্রতিবাদ জানিয়ে আবার পায়ের ওপর মুখ নামিয়ে আনল।
‘চল, রুমে গিয়ে কাপড়চোপড় নিয়ে আসি। এমন চমৎকার একটা রাতে পুকুরে নামার লোভ সামলাতে পারছি না।’ নাইম উঠে দাঁড়াতেই জহির খপ করে ওর কব্জি চেপে ধরল। এভাবে আচমকা আঁকড়ে ধরায় নাইম ভয় পেয়ে এক রকম লাফিয়ে উঠল। রাতের বেলা মানুষ কেবল ভয় পেতে পছন্দ করে। অহেতুক লাফিয়ে ওঠে। আর হঠাৎ খপ করে কেউ কব্জি চেপে ধরলে তো কথাই নেই।
জহির কঠিন গলায় ঘোষণা করল, ‘আমরা কেউ পানিতে নামছি না।’
‘কিন্তু কেন? তুই বরাবর ভিতুর ডিম। তুই চোখ বন্ধ করে বসে মনে মনে এক দুই গুনতে থাক, আমরা কাপড় খুলে নেমে পড়ি।’ বারেকের গলায় ঝাঁজ।
‘আমার ভয়ের একটা কারণ আছে,’ প্রায় শোনা যায় না এমন গলায় বলল জহির।
‘তাই নাকি? তোর চমৎকার গল্পটা নাহয় পানিতে গলা ডুবিয়ে শুনব।’ একদলা থুতু ফেলল বারেক।
নাইম এতক্ষণে কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে বলল, ‘ব্যাপারটা কী বল তো!’
জহির ইতস্তত করছে। ‘গল্প নাহয় পরে শুনলি, তবে এখন পানিতে নামিস না।’
‘তুই যেভাবে মিনমিন করছিস তাতে এদিকে নয়, তোকে পশ্চিম পাড়ায় মেয়েদের হলের দিকে থাকতে হত। একটা চামচিকা দেখলেও সবাই গলা জড়িয়ে ধরে চিৎকার করতে পারতি।’ চরম বিরক্তি বারেকের গলায়।
ওরা কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে রইল। নীরবতা ভাঙল বারেক, ‘নামলাম আমি। তোরা বসে থাক।’
‘খবরদার নামবি না!’ হাহাকার করে উঠল জহিরের গলা।
এবার বিরক্তি চেপে রাখতে পারল না নাইমও, ‘ব্যাপারটা বলবি তো!’
‘আমার সাথে ছোটবেলায় একটা ঘটনা ঘটেছিল। আমি আসলে বলতে চাইছিলাম না, নিচের দিকে তাকিয়ে বলল জহির।
‘বলতে তো তোকে হবেই। এবং এখনই!’ ফোঁস ফোঁস করে উঠল বারেক।
এখন ওরা ভাঙা ঘাটলায় বসে আছে। অকৃপণ চাঁদ তার অফুরন্ত জ্যোৎস্নায় ভিজিয়ে দিচ্ছে ওদের। অনেকক্ষণ ঝিম মেরে বসে থেকে মুখ খুলল জহির। চাঁদের আলোয় ওর গলা বড় রহস্যময় শোনাল। ক্ষণিকের জন্য বারেকও অবাক হলো ওর রহস্যময় গলা শুনে।
‘তখন আমি স্কুলে পড়ি। এখন যেমন দেখছিস আমায়, তখন ছিলাম ঠিক তার উল্টো। বাউণ্ডুলে আর খেপাটে ধরনের। একবার আব্বার সাথে তুমুল ঝগড়া হলো। আব্বার একটা অভ্যাস ছিল, সামান্য কিছুতেই বলতেন, ‘আমার বাড়িতে জায়গা হবে না। বাড়ি ছেড়ে চলে যাও।’
‘সেবার একটু বেশিই জেদ করেছিলাম। ভাবলাম বাড়ি ছেড়ে গিয়ে আব্বাকে একটু বোঝাই। কিন্তু যাব কোথায়? খাব কী? হঠাৎ মাথায় একটা বুদ্ধি এল। তখন আমাদের এলাকার মসজিদে একটা তাবলীগ জামাত এসেছে। এদের সম্পর্কে ধারণা আছে?’
‘হুঁ, আছে। তুই বল।’ কপাল কুঁচকে বলল বারেক। ওর ক্রুদ্ধ চাহনি দেখে মনে হলো না ও গল্প শুনে মজা পাচ্ছে। জহির ওকে পুরোপুরি উপেক্ষা করে আবার শুরু করল।
‘ঠাণ্ডা মাথায় বুদ্ধিটা পাকা করে ফেললাম। তাবলীগ জামাতের সাথে চলে যাব। দু’দিন থাকলেই আব্বার কিছু জ্ঞানলাভ হবে। এক সকালে তাঁরা তল্পিতল্পা গোছাতে শুরু করলে আমি তাঁদের সঙ্গে জুটে পড়লাম। তোরা জেনে থাকবি, তাঁরা একটা মসজিদে তিন দিন থাকে। তিন দিন থেকে দীনের দাওয়াত দিয়ে অন্য মসজিদে চলে যায়। তো আমরা যে মসজিদটায় তিন দিনের জন্য উঠলাম তার সম্পর্কে কিছু বলা প্রয়োজন।
