দেরি না করে সুলতানা বেগম দরজা খোলেন। দরজা মেলতেই দেখতে পান, দরজার সামনে ইয়াসমিন বেগম নয়, আমজাদ হোসেন দাঁড়িয়ে। চেহারায় বুড়োটে ছাপ পড়েছে। চুলে পাক ধরেছে। মুখ ভর্তি খোঁচা-খোঁচা পাকা দাড়ি। কপালে একটা কাটা দাগ। বাইশ বছর আগে কপালে ওই দাগ ছিল না। কী আশ্চর্য! ইয়াসমিন বেগমের কপালেও হুবহু ওরকম একটা দাগ ছিল।
আমজাদ হোসেনকে দেখে সুলতানা বেগমের মাথা ঘুরে পড়ে যাবার মত অবস্থা হয়। তার আগেই সুমন তার মাকে ধরে ফেলে। ধরে নিয়ে গিয়ে সোফায় বসায়।
আমজাদ হোসেন দরদ মেশানো গলায় ‘সুলতানা, ও, সুলতানা, কী হলো তোমার? কী হলো?’ বলতে-বলতে ঘরের ভিতরে ছুটে আসেন।
সুলতানা বেগম ঢক ঢক করে এক গ্লাস পানি পান করে নিজেকে কিছুটা ধাতস্থ করে বলেন, ‘আমার কিছুই হয়নি। তার আগে বলো তোমার কী হয়েছিল? এতদিন কোথায় ছিলে?’
আমজাদ হোসেন অসহায়ের মত গলায় বলেন, ‘জানি না আমি কোথায় ছিলাম! বিশ্বাস করো, আমার কিছুই মনে নেই। এটুকুই মনে আছে, আমাদের বিবাহ বার্ষিকীর দিন ছিল। রাত সোয়া ন’টার দিকে অফিস থেকে বের হই। তোমার জন্য শাড়ি আর সুমনের জন্য খেলনা কিনতে মার্কেটে ঢুকি। কেনাকাটা শেষে ফেরার পথে ভয়ানক ঝড়- বৃষ্টি শুরু হয়। একটা ইলেকট্রিক তার ছিঁড়ে এসে আমার গায়ে পড়ে। ইলেকট্রিক শকের তীব্র যন্ত্রণায় জ্ঞান হারাই। এরপর কয়েক মুহূর্তের জন্য আবার জ্ঞান ফিরে নিজেকে একটা অন্ধকার ঘরে দেখতে পাই। পাশে আমারই মতন অচেতন আর এক মহিলা। আমাদের ঘিরে অদ্ভুত চেহারার তিনজন মানুষ। তাদের গা থেকে সবুজাভ আলোর বিচ্ছুরণ হচ্ছে। তারা আমাদের দু’জনের বুক থেকে নাভির নিচ পর্যন্ত চিরে ফেলেছে…
ইয়াসমিন বেগম আমজাদ হোসেনের অনুকরণে যা-যা বলেছিলেন, সেই বর্ণনার সঙ্গে হুবহু মিলে যায়।
সুলতানা বেগম আহত গলায় বলে ওঠেন, ‘ওই তিনজন কারা ছিল? তারা তোমাদের দু’জনকে নিয়ে কী করছিল?’
আমজাদ হোসেন কেমন ভাবনার অতলে হারিয়ে গিয়ে বলতে লাগেন, ‘জানি না তারা কারা ছিল। তবে আমার মনের ভিতর থেকে কেউ যেন বলে উঠছে, তারা এই পৃথিবীর কেউ ছিল না। পৃথিবী থেকে অনেক দূরের কোনও গ্রহ থেকে এসেছিল। তাদের গায়ের রঙ সবুজ। পিছনে বানরের মত লম্বা লেজ ছিল। অন্ধকারে গা থেকে সবুজাভ আলোর দ্যুতি বের হয়। তাদের দৈহিক আকৃতি মানুষের মত হলেও শরীরের ভিতরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ, মস্তিষ্কের গঠন মোটেই মানুষের মত নয়। রক্তের রঙ নীল। ওই নীল রক্তের মানুষেরা জ্ঞান-বিজ্ঞান-প্রযুক্তির দিক দিয়ে আমাদের থেকে অনেক-অনেক গুণ এগিয়ে। সেই ঝড়-বৃষ্টির রাতে বজ্রপাতে এবং ইলেকট্রিক শকে মৃতপ্রায় আমাদের দু’জনকে তারা বাঁচাতে চেয়েছিল। কিন্তু তারা দেখতে পায়, আলাদা- আলাদাভাবে আমাদের দু’জনের একজনকেও বাঁচানো সম্ভব নয়। তাই তারা দু’জনকে মিলিয়ে একজনকে বাঁচানোর চেষ্টা করে। মানে দু’জনের শরীরের যে-যে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ব্যবহার উপযোগী মনে হয় সেগুলোকে প্রতিস্থাপন করে একটি শরীর গড়ে তোলে। হাত-পা থেকে শুরু করে শরীরের ভিতরের লিভার-কিডনি সবই। বলা যেতে পারে দুটো নষ্ট গাড়ির যন্ত্রাংশ মিলিয়ে যেমন একটি সচল গাড়ি বানানো হয়। দু’জনকে মিলিয়ে বাঁচানোর চেষ্টায় সফল হয় তারা। তবে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে শেষ মুহূর্তে রক্তশূন্যতা দেখা দেয়। তাই উপায় না পেয়ে তাদের শরীরের নীল রক্ত স্থানান্তর করে সম্পূর্ণ রূপে বাঁচিয়ে তোলে। তারা শুধু দুটো দেহকে মিলিয়ে একটি দেহ বানিয়েই শেষ করেনি, দুই দেহের দুই সত্তাকেও নতুন বানানো দেহতে প্রতিস্থাপন করে। যাতে দু’জন মানুষই ওই এক দেহে ভাগাভাগি করে বেঁচে থাকতে পারে।’
সুলতানা বেগম কাঁদতে-কাঁদতে বলেন, ‘ওসব কথা বাদ দাও! আর শুনতে ইচ্ছে করছে না! অত-শত বুঝি না, তুমি যে বেঁচে ফিরেছ, তাতেই লাখ-লাখ শুকরিয়া! তুমি আমাদের এই ঠিকানা পেলে কোথায়?’
‘ঠিকানা কোথাও পাইনি। নিজ থেকেই চলে এসেছি। মনে হয়েছে এই ঠিকানা আমি আগে থেকেই চিনতাম।’
ঈশিতা ইয়াসমিন বেগমের একটা ফটো এনে আমজাদ হোসেনকে দেখিয়ে জিজ্ঞেস করে, ‘আপনি কি এনাকে চেনেন?’
আমজাদ হোসেন অনেকক্ষণ ধরে ফটোটার দিকে তাকিয়ে থেকে বলেন, ‘হ্যাঁ, চিনি। কোথায় যেন দেখেছি। বহুবার দেখেছি। কিন্তু মনে করতে পারছি না, কোথায় দেখেছি!’
সুলতানা বেগম চোখ মুছতে-মুছতে বলেন, ‘তোমাকে আর কিছুই মনে করতে হবে না। সাবান মেখে ভালভাবে গোসল করে এসো। তোমার জন্য পোলাও, রোস্ট, ভুনা গরুর মাংস রান্না করছি। সবাই মিলে একসঙ্গে খাব। গত বাইশ বছরে এই খাবারগুলো আমি ছুঁয়েও দেখিনি।’
শুকপক্ষ – নাফিস অলি
দু’পা সামনে ছড়িয়ে তার ওপর মুখ রেখে কুকুরটা শুয়ে ছিল। ওরা যখন হল গেট থেকে বেরোল, ওদের জুতোর তলার খসখস আওয়াজে কুকুরটা চোখ মেলে পিটপিট করে চাইল। এক মুহূর্ত কী যেন ভেবে নিয়ে উঠে দাঁড়াল। ততক্ষণে ওরা হলের সামনের ঘাসে ছেয়ে যাওয়া শুঁড়িপথে পা রেখেছে। কুকুরটা শরীর টানটান করে আলস্য ভেঙে ধীরেসুস্থে ওদের পিছু নিল। জহির প্রথমে দেখল কুকুরটাকে। কয়েকবার ‘হুস হাস’ জাতীয় শব্দ করে হাত নেড়ে তাড়িয়ে দিতে চাইল। কুকুরটা আগ্রহ নিয়ে জহিরের কাণ্ড দেখল, কিন্তু নড়ল না। ওরা যখন চলতে শুরু করল, লেজ নেড়ে নেড়ে কুকুরটা আবার ওদের পিছু নিল। কিছুদূর গিয়ে জহির আবার ‘হুস! হুস যাহ!’ করে উঠল। নাইম বিরক্ত হয়ে বলল, ‘আহা, কুকুরটা তোর কী ক্ষতি করল? নিরীহ প্রাণীটার পেছনে লাগলি কেন, জহির?’ বারেক ওর স্বভাবসুলভ হো হো করে হেসে উঠল, যেন মস্ত কোন হাসির কৌতুক বলা হয়েছে। বারেকের হাসি এবার নাইমের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ল, নাইম থেকে জহির। ওরা তিনজনেই হাসছে। অকারণ হাসি। অবোধ কুকুরটা নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে মানুষের কর্মকাণ্ড দেখছে আর বিভ্রান্ত না হওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করছে।
