সুমন কিছুটা বিরক্ত স্বরে বলে উঠল, ‘এসব আমাকে বলে কোনওই লাভ হচ্ছে না। তোর ওই সায়েন্সের কচকচানি কিছুই আমি বুঝতে পারছি না। তবে এটা বুঝতে পারছি, আমার শাশুড়ির মধ্যে বড় রকমের কোনও সমস্যা ছিল।’
জাহিদ হাসান বলল, ‘আচ্ছা, বাদ দে, তোর নিজের কথা বল। ভাবী কেমন আছে? তার, মা নিখোঁজ হওয়ায় নিশ্চয়ই সে মানসিকভাবে অনেক ভেঙে পড়েছিল?’
সুমন বলল, ‘হ্যাঁ, অনেক ভেঙে পড়েছিল। এখন অনেকটাই সামলে উঠেছে।’
জাহিদ হাসান বলল, ‘আচ্ছা, তোদের দাম্পত্য জীবন কেমন চলছে?’
সুমন বলল, ‘ভাল। খুব ভাল। ঈশিতা দেখতে যেমন রূপবতী, তেমনি গুণবতীও। রান্না-বান্না সহ সাংসারিক সব কাজেই অত্যন্ত পারদর্শী। তবে ওর কিছু ব্যাপার আছে, যা আমাকে ভীষণ ভাবিয়ে তোলে।’
জাহিদ হাসান কৌতূহলী গলায় জিজ্ঞেস করল, ‘কী সেই ব্যাপার?’
সুমন কিছুটা ইতস্তত গলায় বলতে লাগল, ‘ওর চোখের রঙ পরিবর্তন হয়। স্বাভাবিক অবস্থায় সবার মত চোখের মণি ঘন কালো রঙের থাকলেও মানসিক অবস্থার পরিবর্তনের সাথে চোখের রঙও পরিবর্তন হয়। যেমন ধর, ওর যদি খুব মন খারাপ হয়, তখন চোখের মণি নীলচে রঙ ধারণ করে। যদি খুব আনন্দিত হয়, তবে চোখের মণি গোলাপি রঙ ধরে। যদি হতাশ হয়, তবে চোখের মণি সবুজাভ দেখায়। যদি রেগে যায়, তবে গনগনে আগুনের মত লালচে হয়ে যায়। যদি উদাস হয়ে কিছু ভাবে, তবে মেঘের মত ছাই বর্ণ ধারণ করে। যদি দুশ্চিন্তাগ্রস্ত থাকে, তা হলে ফ্যাকাসে হয়ে যায়।’
জাহিদ হাসান চরম বিস্মিত গলায় বলে উঠল, ‘কী বলছিস! তা-ও আবার সম্ভব নাকি? ভাবী চোখে বিভিন্ন রঙের লেন্স ব্যবহার করে না তো?’
‘না, সে কোনও লেন্স ব্যবহার করে না। শুধু চোখের মাঝেই অস্বাভাবিকতা নয়, আরও কিছু রয়েছে।’
‘সেসব কী?’
ওর মধ্যে চৌম্বকীয় কোনও ব্যাপার আছে। মানে ছোট-খাট ধাতব জিনিসের কাছাকাছি গেলে সেগুলো ছুটে এসে ওর গায়ে লেগে যায়। চুম্বকের আকর্ষণে লোহার জিনিস যেমন চুম্বকের গায়ে লেগে থাকে। যেমন ধর, ও খাবার টেবিলে খেতে বসেছে, একটু দূরেই একটা টি-চামচ বা কাঁটা চামচ। দেখা যাবে চামচটা ছুটে এসে ওর গায়ে আটকে রয়েছে। আর একটা অদ্ভুত ব্যাপার, অন্ধকারে ওর সমস্ত গা জ্বল জ্বল করে। গা থেকে যেন সবুজাভ আভা বেরোয়। যেমন রেডিয়ামের প্রলেপ দেয়া টিভির রিমোটের বাটন, ইলেকট্রিক সুইচ, তসবি-এসব অন্ধকারে জ্বল-জ্বল করে। চোখের মণিও বিড়ালের চোখের মত জ্বলে। সবচেয়ে আশ্চর্য হয়েছি সেদিন, যেদিন ও আমার সামনে চাকু দিয়ে আপেল কাটছিল। অসতর্কতায় হাত কেটে ফেলে। দর-দর করে রক্ত বেরোতে শুরু করে। রক্তের রঙ দেখে বিস্ময়ে আমার চোখ কপালে ওঠে। রক্তের রঙ অন্য সবার মত লাল নয়, নীল রঙের! ঘন নীল।’
জাহিদ হাসান অবিশ্বাসী গলায় বলে উঠল, ‘এসব তুই কী বলছিস?! অন্ধকারে তার গা জ্বল জ্বল করে! তা হলে কি তার শরীরে অতিমাত্রায় ফসফরাস রয়েছে? ফসফরাস অন্ধকারে জ্বল-জ্বল করে। সেই সঙ্গে শরীরে কি ম্যাগনেটও রয়েছে? যে কারণে ধাতব জিনিস তার গায়ে লেগে যায়! আর রক্তের রঙ নীল কী কারণে? কোনও মানুষের রক্তের রঙই নীল হওয়া সম্ভব নয়। রক্তের রঙ লাল হওয়ায় কারণ, রক্তের ভেতরের হিমোগ্লোবিন নামে একটি উপাদান অক্সিজেনকে ফুসফুস থেকে নিয়ে গিয়ে সরাসরি রক্তের মাধ্যমে কোষে পৌঁছে দেয়। হিমোগ্লোবিনকে ভাগ করলে বিলিরুবিন ও বিলিভারডিন ধরনের উপাদান পাওয়া যায়। সেটার পরিমাণ রক্তকে অন্য রঙে রূপান্তরিত করে ফেলতে পারে। বিলিভারডিনের পরিমাণ বেড়ে গেলে রক্তের রঙ সবুজ হয়ে যায়। যেমন, পাপুয়া নিউ গিনির স্কিঙ্ক নামের এক ধরনের সরীসৃপের রক্ত সবুজ রঙের। আর রক্তে যদি হিমোগ্লোবিনের উপস্থিতির পরিবর্তে কপার সমৃদ্ধ প্রোটিন হিমোসায়ানিন কোষে অক্সিজেন পৌঁছে দেবার কাজ করে, তা হলে রক্তের রঙ নীল হয়। গভীর সমুদ্রে এক ধরনের অক্টোপাসের খোঁজ পাওয়া গেছে যাদের রক্তের রঙ নীল ওই অক্টোপাসগুলোর মত ভাবীর রক্তেও কি অতিমাত্রায় কপার সমৃদ্ধ প্রোটিন হিমোসায়ানিনের উপস্থিতি রয়েছে?’
সুমন ক্লান্ত গলায় বলল, ‘জানি না! এসব কথা আমি আমার মাকেও জানাইনি। তিনি অনেক শখ করে ঈশিতাকে বউ বানিয়ে এনেছিলেন। এসব শুনলে মনে অনেক কষ্ট পাবেন।’
পরিশিষ্ট
বাইশ বছর আগে হারিয়ে যাওয়া আমজাদ হোসেন এক ঝড়-বৃষ্টির গভীর রাতে ফিরে এসেছেন।
বাড়ির সবাই তখন গাঢ় ঘুমে মগ্ন ছিল। কলিংবেলের শব্দে প্রথমে সুলতানা বেগমের ঘুম ভাঙে। তিনি অবাক হয়ে ভাবেন, এত রাতে কে এসেছে?! ঘন-ঘন কলিংবেল বাজতেই থাকে। তিনি সুমন আর ঈশিতাকে ঘুম থেকে ডেকে তোলেন। সবাই মিলে বসার ঘরে ঢুকে দরজা না খুলে চেঁচিয়ে জিজ্ঞেস করে, ‘কে? কে এসেছে? এত রাতে আবার কে এসেছে?’
তাদের মনে ভয় কাজ করে, অত রাতে চোর-ডাকাতও তো আসতে পারে।
দরজার ওপাশ থেকে আগন্তুকের গলার স্বর শোনা যায়। সুমনের বাবা আমজাদ হোসেনের গলার স্বর।
‘সুলতানা, ও, সুলতানা। সুমন, বাবা, ঘুমিয়ে পড়েছিস? তোর মাকে একটু দরজাটা খুলতে বল।’
ঘরের ভিতরে তারা তিনজন ভয়ানক চমকে ওঠে। ভাবে, নিশ্চয়ই ইয়াসমিন বেগম ফিরে এসেছেন। কারণ, ইয়াসমিন বেগম তো মাঝে-মাঝে আমজাদ হোসেনের গলায় কথা বলতেন। বিশেষ করে ঝড়-বৃষ্টির সময়। আজও সেই ঝড়-বৃষ্টির রাত!
