.
ইয়াসমিন বেগমের পুরো শরীরের সব ধরনের মেডিকেল চেক-আপ করানো হয়। সেই রিপোর্ট দেখে ডা. আতিকুর রহমান আরও চমকে যান। রিপোর্ট নির্দেশ করছে, ইয়াসমিন বেগমের শরীরের ভিতরের সমস্ত অর্গান কোনও এক সময় ট্রান্সপ্ল্যান্ট করা হয়েছিল। লিভার, কিডনি থেকে শুরু করে হার্ট, লাং, গলব্লাডার, প্যানক্রিয়াস-সব! সব কিছু যেন অন্যের শরীর থেকে এনে প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। মস্তিষ্কেও অস্ত্রোপচার হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এটা কিছুতেই সম্ভব নয়। একেবারেই অবিশ্বাস্য। মেডিকেল সায়েন্স এখনও এতটা অগ্রসর হয়নি যে একজনের দেহের সমস্ত অর্গান আরেকজনের দেহে প্রতিস্থাপন করা যাবে। তবে ইয়াসমিন বেগমের শরীরে কোনও অপারেশনের দাগ পাওয়া যায়নি। যেন অলীক কোনও উপায়ে তাঁর দেহের ভিতরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ প্রতিস্থাপিত হয়েছে।
ডা. আতিকুর রহমান হাল ছেড়ে দেয়া গলায় সুমনকে জানান, ‘তোমার মাদার-ইন-ল-র ব্যাপারটা আমি কিছুই ধরতে পারছি না! সম্ভবত এ দেশের কোনও ডাক্তারই তাঁর রোগ বুঝতে পারবে না। দেশের বাইরে সিঙ্গাপুর, ব্যাংকক অথবা আমেরিকায় নিয়ে গিয়ে দেখতে পারো। তাদের অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি আছে। তারা হয়তো বুঝতেও পারে।’
সাত
গত রাতে প্রচণ্ড ঝড়-বৃষ্টি হয়েছে। বরাবরের মত ইয়াসমিন বেগমের মাথা ব্যথাও তীব্র রূপ নিয়েছিল। সেই সঙ্গে পাগলামিও। ডা. আতিকুর রহমানের প্রেসক্রাইব করা কড়া ডোজের ঘুমের ইনজেকশন দিয়েও তাঁকে শান্ত করা যাচ্ছিল না। সারা রাত যন্ত্রণাকাতর পশুর মত ছটফট করেন। শেষ রাতের দিকে কিছুটা স্বাভাবিক হন। সেই সুযোগে বাড়ির অন্যরা ঘুমিয়ে পড়েছিল।
সকালে সবার প্রথমে ঘুম ভাঙে সুলতানা বেগমের। ঘুম ভাঙতেই তিনি ইয়াসমিন বেগমের খোঁজ নিতে তাঁর রুমে চলে যান। গিয়ে দেখেন, রুমে ইয়াসমিন বেগম নেই। বাথরুমে, রান্নাঘরে, বসার ঘরে-সব জায়গায় খোঁজ করেন। কোথাও তাঁকে দেখতে পান না। সুলতানা বেগমের চোখ পড়ে বাসার সদর দরজায়। দরজার ছিটকিনি খোলা। দরজা ভেজানো। বুঝতে দেরি হয় না, দরজা খুলে ইয়াসমিন বেগম বাইরে গেছেন। চিন্তিত হয়ে পড়েন, অসুস্থ একটা মানুষ একা-একা কোথায় গেলেন? কখনও তো এভাবে না বলে কোথাও যাননি!
সুলতানা বেগম সুমন আর ঈশিতাকে ঘুম থেকে ডেকে তোলেন। ইয়াসমিন বেগম যে বাসায় নেই তাদেরকে জানান। দেরি না করে সুমনকে ইয়াসমিন বেগমের খোঁজে বেরিয়ে পড়তে বলেন।
সুমন তাদের পাশের ফ্ল্যাট থেকে শুরু করে সম্ভাব্য সব জায়গায় ইয়াসমিন বেগমের খোঁজ করে। কোথাও তাঁকে খুঁজে পাওয়া যায় না।
সকাল পেরিয়ে দুপুর হয়। দুপুর গড়িয়ে বিকেল। রাত নেমে আসে। রাত্রি গভীর হয়। সুলতানা বেগমের কোনও খোঁজ পাওয়া যায় না।
শেষমেশ পরের দিন ভোরে থানায় মিসিং ডায়েরি করা হয়। মাইকিং করে সারা শহরে নিখোঁজ সংবাদ জানানো হয়। খবরের কাগজে বিজ্ঞপ্তি দেয়া হয়। বিভিন্ন হাসপাতালেও খোঁজ নেয়া হয়।
এত কিছুর পরও ইয়াসমিন বেগমের কোনও খোঁজ পাওয়া যায় না। যেন জলজ্যান্ত মানুষটা একেবারে গায়েব হয়ে গেছেন।
আট
ইয়াসমিন বেগম নিখোঁজ হওয়ার পর তিন মাস পেরিয়ে গেছে।
অফিস থেকে ফেরার পথে সুমনের সঙ্গে তার বন্ধু ডা. জাহিদ হাসানের দেখা হয়ে যায়। দুই বন্ধু একসঙ্গে একটা কফি হাউসে ঢুকেছে। তারা দু’জন গরম ধোঁয়া ওঠা কফির মগে চুমুক দিতে-দিতে গল্প করছে।
জাহিদ হাসান জিজ্ঞেস করল, ‘তোর শাশুড়ির আর কোনও খোঁজই পেলি না?’
সুমন বলল, ‘না, অনেক চেষ্টা করেছি, চেষ্টার কোনও কমতি রাখিনি। কিন্তু কোথাও তাঁর খোঁজ পাওয়া গেল না।’
জাহিদ হাসান সান্ত্বনা দেবার ভঙ্গিতে বলল, ‘ভেরি স্যাড!’
কিছুক্ষণ নিশ্চুপ থাকার পর জাহিদ হাসান আবার বলতে লাগল, ‘তোর শাশুড়ি মেডিকেল সায়েন্সের ইতিহাসে বিরল এক উদাহরণ ছিলেন। আতিকুর রহমান স্যরের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। তাঁর মত ঘাগু ডাক্তার তোর শাশুড়ির মেডিকেল রিপোর্ট দেখে সাংঘাতিক ভড়কে গিয়েছিলেন। তাঁর মেডিকেল রিপোর্ট যা নির্দেশ করে, বলা যায় এতদিনের অত্যাধুনিক মেডিকেল সায়েন্সকে স্রেফ ভেলকি দেখানো হয়েছে। আতিকুর রহমান স্যর তাঁর ব্যক্তিগত আগ্রহে তোর শাশুড়ির ব্লাড স্যাম্পল দিয়ে আরও একটা পরীক্ষা করিয়েছিলেন। ডি. এন. এ. পরীক্ষা। সেটা তোকে জানানো হয়নি। তাঁর দৈহিক গঠন বৈশিষ্ট্যের মত ডি. এন. এ.-র গঠন বৈশিষ্ট্যও অন্য সব মানুষের চেয়ে আলাদা। প্রত্যেক প্রাণীর ক্রোমোজোমে দ্বি সূত্রক বিশিষ্ট পেঁচানো এই ডি. এন. এ. থাকে। মানে ডি-অক্সিরাইবো নিউক্লিক অ্যাসিড। যেটাকে বংশগতি বৈশিষ্ট্যের বাহক বলা হয়। এর প্রধান গাঠনিক উপাদান, ডি-অক্সিরাইবোজ সুগার, অজৈব ফসফেট ও অ্যাডেনিন, গুয়ানিন, সাইটোসিন থায়ানিন নামের নাইট্রোজেন বেস। তাঁর ক্রোমোজোমের ডি-অক্সিরাইবো নিউক্লিক অ্যাসিডের গঠন উপাদানে সম্পূর্ণ নতুন ধরনের কিছু রাসায়নিক পদার্থ রয়েছে, যা পৃথিবীর অন্যসব মানুষ বা কোনও প্রাণীর ক্রোমোজোমে এর আগে পাওয়া যায়নি। জনন কোষে ক্রোমোজোম সংখ্যা ৪৬ জোড়া, যেখানে সাধারণ প্রতিটি মানবদেহের জনন কোষে ক্রোমোজোম সংখ্যা থাকে ২৩ জোড়া, যার মধ্যে ২২ জোড়া অটোজোম আর এক জোড়া সেক্স ক্রোমোজোম। পুরুষদের থাকে XY সেক্স ক্রোমোজোম। আর নারীদের সেক্স ক্রোমোজোম XX। তাঁর ডি. এন. এ. নির্দেশ করে নারী-পুরুষ দুই ধরনের সেক্স ক্রোমোজোমই তাঁর রয়েছে। বলা যায় কেঁচোর মত। একটি কেঁচোর যেমন নারী-পুরুষ দুই ধরনের সেক্স ক্রোমোজোম থাকে। কেঁচোরা অন্য সব প্রাণীর মত আলাদা-আলাদা ভাবে নারী-পুরুষ হয় না।’
