মনের অজান্তে আমি জোরে চিৎকার দিলাম, অভিজিৎ!
সারা বাড়িতে প্রতিধ্বনি তুলল আমার ডাক।
আমি আবার চিৎকার দিলাম, অভিজিৎ!!
দেয়ালে-দেয়ালে বাড়ি খেল সেই শব্দ।
আমি দ্রুত নিচে নেমে এলাম। ভয় পেয়েছি আমি!
তাড়াতাড়ি প্যান্ট-শার্ট পরে নিলাম।
দ্রুত জুতো জোড়া পরে দরজার ছিটকিনির দিকে হাত বাড়ালাম। ছিটকিনি খোলা। খোলাই তো থাকবে। দয়াল আমাকে এখানে রেখে চলে যাবার পর আমি তো ছিটকিনি আটকাইনি।
আমি দরজা টান দিয়ে খুললাম। বাইরের ঠাণ্ডা বাতাস ঝাঁপটা মারল আমার মুখে। ছোট্ট লোহার গেট। ওটা টান দিলাম। বন্ধ। দয়াল কি বাইরে থেকে আমাকে আটকে দিয়ে গেছে? আমি পাগলের মত লোহার গেটটি টানতে লাগলাম। পাল্লা নড়াতে পারলাম না এক চুলও। দৌড়ে ঘরে ঢুকলাম। বালিশের নিচ থেকে মোবাইল বের করলাম। দয়ালকে রিং করলাম। রিং যাচ্ছে না। নেটওয়ার্ক নেই। আবার দৌড়ে এসে দরজার বাইরের গেট টানাটানি করলাম। আবার ঘরে ঢুকলাম। এবার জানালার গ্রিল ধরে টানতে লাগলাম যদি খুলে আসে! হাত ব্যথা করে ফেললাম, তবু নড়াতে পারলাম না, এমন মজবুত।
জানালায় মুখ নিয়ে চিৎকার করলাম, বাইরে কি কেউ আছেন?
কোন উত্তর এল না।
শুধু বাতাসের শোঁ-শোঁ শব্দ।
ক্রমেই বাড়তে লাগল বাতাস। জানালার পর্দা উড়ে যেতে চাইল। ঝড় শুরু হয়েছে!
আমি জানালা বন্ধ করে দিলাম।
কড়াৎ করে কাছেই কোথাও বাজ পড়ল। আমি কেঁপে উঠলাম। উঠে দ্রুত ঘরের সব লাইট জ্বেলে দিলাম। উজ্জ্বল আলোয় ঘরটা ভরে উঠল। এতে ভয় কিছুটা কমলেও বুকের ধুকপুকানি টের পাচ্ছি। ঘরের চারপাশে চোখ বুলাতে লাগলাম অস্বাভাবিক কিছু চোখে পড়ে কিনা। না, তেমন কিছুই নেই। নিজেকে বুঝ দেয়ার চেষ্টা করলাম আসলে যা দেখেছি সব স্বপ্ন। অথবা সবই স্বাভাবিক। অযথা আমি ভয় পাচ্ছি।
বাইরে প্রচণ্ড বাতাস। গাছের ডাল বাড়ি খাচ্ছে জানালায়। এমন ঝড় হতে থাকলে যে কোন সময় কারেন্ট চলে যেতে পারে। আমি টেবিলের কাছে গিয়ে মোমবাতি আছে কিনা খুঁজতে লাগলাম। ম্যাচ আমার পকেটেই আছে।
টেবিলে কোন মোমবাতি নেই।
টান দিয়ে ড্রয়ার খুললাম। পুরানো কলম। একটা ভাঙা পেন্সিল। নিচের ড্রয়ার খুললাম। চার-পাঁচটা পুরানো ছেঁড়া বই। আতিপাতি করে খুঁজলাম। কোথাও কোন মোমবাতি নেই। অথবা বিকল্প কিছু।
ধীরে-ধীরে ঝড়ের গতি বাড়ছে।
আলোও কেঁপে-কেঁপে উঠল কয়েকবার। হঠাৎ দপ করে নিভে গেল।
গাঢ় অন্ধকারে ভরে গেল রুম।
শুধু ঝড়ের শব্দ।
হঠাৎ আমার পায়ের ওপর দিয়ে কী যেন চলে গেল। আমি ভয়ে চিৎকার দিলাম। বুঝলাম ওটা ইঁদুর। দ্রুত পকেট হাতড়ালাম। ম্যাচ খুঁজে পেলাম না। শার্টের পকেট, প্যান্টের পকেট বারবার হাতড়াতে লাগলাম। কোথাও ম্যাচ নেই। আসার সময় সম্ভবত কোথাও পড়ে গেছে।
মোবাইলটা হাতে নিলাম। বাটনে চাপ দিতে অল্প আলো জ্বলল। মোবাইলের টর্চ জ্বালানো ঠিক হবে না, দ্রুত চার্জ চলে এমন অবস্থা হবে, আগেই চার্জ দিয়ে রাখতাম।
মোবাইলের আলোয়, খাটে বসে রইলাম। অভিশাপ দিলাম ভাগ্যকে। সাজ্জাদ ভাইয়ের কথা শোনা উচিত ছিল। মনে হচ্ছে রাতে আর কারেন্ট আসবে না। মোবাইলের চার্জটুকু শেষ হয়ে গেলে কী হবে?
নাহ্, মিছেমিছি ভাবছি। নিজেকে সান্ত্বনা দিলাম। কিছুই হয়নি, বেশি-বেশি চিন্তা করছি আমি। হয়তো নন্দিতা সত্যিই তার পিসীর বাড়িতে-হয়তো ওখানেই বিয়ের আয়োজন হচ্ছে, হয়তো ধর্মীয়ভাবে ঝামেলা হতে পারে মনে করে অভিজিৎ আমাকে না ডেকেই সেখানে চলে গেছে। আর অভিজিতের সাথে আমার সত্যিই দেখা হয়েছে, এখানে উল্টোপাল্টা কিছু ভাবার সুযোগ নেই। আর যদি উল্টোপাল্টা কিছু হত, দয়াল নিশ্চয়ই আমাকে এখানে আনত না। আর ওই ভ্যানওয়ালা যা বলেছে, নিশ্চয়ই তার মাথার ঠিক নেই। গ্রামের দিকে এ ধরনের অনেক লোক আছে, খুব উল্টোপাল্টা বলে। নতুন লোক দেখলে এ ধরনের কথা বলে মজা পায়।
মোবাইলের আলো আস্তে-আস্তে ক্ষীণ হয়ে আসছে। বুঝতে পারছি বেশি চার্জ নেই। বাইরে কি ঝড় থেমে গেছে? আর কোন শব্দ পাচ্ছি না। শুধু টিপটিপ একটু বৃষ্টির আওয়াজ। গেটে মনে হলো ঠকঠক শব্দ হলো। কান খাড়া করলাম। না, আর কোন শব্দ নেই। শেয়াল বা কুকুর হতে পারে। আবার কোথাও কোলাহলের শব্দ পেলাম, চিৎকার, চেঁচামেচি। আবার নিশ্চুপ।
বিছানা থেকে উঠলাম। মোবাইলটা মনে হয় আর কিছুক্ষণ পরেই বন্ধ হয়ে যাবে।
টেবিলে গিয়ে বসলাম।
এক কোনায় পুরানো খবরের কাগজ। কিছুটা দোমড়ানো।
অনিচ্ছা সত্ত্বেও খুললাম। যদি কিছুটা সময় কাটানো যায়।
দেখি প্রথম পৃষ্ঠায় পুড়ে যাওয়া এক গাড়ির ছবি। নিচে বড় হেডলাইন-মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় বালু ব্যবসায়ীর মৃত্যু।
পড়তে লাগলাম খবরটা।
গতকাল আনুমানিক রাত একটার দিকে নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার উপজেলার খানাকান্দা ইউনিয়নের তাতুয়াকান্দা গ্রামের বিশিষ্ট বালু ব্যবসায়ী শ্রী অরিন্দম দাসের পুত্র শ্রী অভিজিৎ দাস এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন। উল্লেখ্য তিনি তার বোনকে নিয়ে একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে যাচ্ছিলেন। গাড়িটি তিনি নিজেই ড্রাইভ করছিলেন। গাড়ি যোগার দিয়া নামে এক গ্রামের পথ দিয়ে যাওয়ার সময় পেছন থেকে বালুবাহী একটি ট্রাক ধাক্কা মারে, গাড়িটি উল্টে গভীর খাদে পড়ে যায় ও গাড়িটিতে আগুন ধরে যায়। অভিজিতের লাশ উদ্ধার করা সম্ভব হলেও তার বোনের লাশ পুড়ে গাড়ির সিটের সাথে লেগে থাকে। তার বোনের নাম নন্দিতা রানি দাস। পুলিশ বলছে
