গুনগুন করে গান গাইতে-গাইতে বাথরুম থেকে বেরোলাম। এবং বিছানার দিকে চোখ পড়তেই জমে গেলাম। আমার হাত থেকে ভেজা কাপড়গুলো মেঝেতে পড়ে গেল। বিছানায় দুপা তুলে বসে আছে অভিজিৎ!
মনে হলো আমার গলার কাছে হৃৎপিণ্ডটা উঠে এসেছে। ধকধক করছে। নিজেই শুনতে পাচ্ছি নিজের হৃৎপিণ্ডের ধুকধুকানি শব্দ।
কী রে? এভাবে তাকিয়ে আছিস কেন? মনে হয় ভূত দেখছিস! হাসল অভিজিৎ। বিছানা থেকে নামল। এই প্রথম খেয়াল করলাম সে খুঁড়িয়ে-খুঁড়িয়ে হাঁটে।
তুই-তুই কোত্থেকে এলি? আমি নিজেকে সামলে নিয়ে বললাম।
কোত্থেকে এলাম মানে? আমি দোতলায় ঘুমোচ্ছিলাম। তুই এসে ডাকলিও না। পথে কোন সমস্যা হয়নি তো? এখানে, আসতে কোন অসুবিধা
না, না, কোন সমস্যাই হয়নি। বরং সবাই খুব হেলপফুল।।
তুই খেয়ে রেস্ট নে। একটা ঘুম দে। ভাল লাগবে।
আয়, তুইও খা আমার সাথে। একসাথে খেতে-খেতে গল্প করি।
না রে। উপোস রয়েছি। একমাত্র বোনের বিয়ে। বড় ভাই হিসাবে কত দায়িত্ব থাকে। হাসল অভিজিৎ। কেন জানি আমার সেই হাসি ভাল লাগল না।
কাপড়গুলো বারান্দায় গিয়ে একটা দড়িতে মেলোম। আকাশে মেঘ জমছে। এত বড় বাড়িতে মাত্র দুজন প্রাণী থাকে। অভিজিৎ ও নন্দিতা। অভিজিতের বাবা কি এই বাড়িতে থাকেন না, নাকি আগেই মারা গেছেন। মাথার মধ্যে নানা প্রশ্ন খেলছে। গতকাল অভিজিতের দাওয়াত দেয়া থেকে শুরু করে এখানে আসা-ভ্যানওয়ালার কথাগুলো-ভ্যানওয়ালা কি মিথ্যে বলেছে আমাকে? মজা করেছে? করতেও পারে। গ্রামের এসব অশিক্ষিত মানুষ উল্টোপাল্টা কথা বলে খুব মজা পায়।
ভ্যানওয়ালার কথা মনে পড়তেই নিজের প্রতি রাগ হলো খুব। আমি কি তবে তার কথা বিশ্বাস করে ফেলেছি? কী হাস্যকর! জলজ্যান্ত একজন মানুষকে কেউ মৃত বলল, আর আমার মত উচ্চশিক্ষিত একজন মানুষ সেটাকে বিশ্বাস করে কত কী ভাবতে শুরু করেছি।.ভ্যানওয়ালা বলেছিল তার ভ্যানে করে অভিজিতের লাশ পোড়াতে নিয়ে যাচ্ছিল শ্মশানে। সে বলল, আর আমিও বিশ্বাস করলাম। কী সব ফালতু কথা। হাস্যকর।
কাপড় মেলে এসে দেখি অভিজিৎ সেভাবেই দাঁড়িয়ে রয়েছে। এক পায়ে ভর দিয়ে।
নন্দিতা একেবারে সেজেগুজেই আসবে, পায়ের ভর বদল করে বলল সে। ওর জন্য অপেক্ষা করে লাভ নেই। তুই খেয়ে-দেয়ে ঘুমিয়ে নিস। সন্ধ্যায় উঠলেই হবে।
বর কী করে? প্রশ্ন করলাম আমি।
দাঁত বের করে হাসল অভিজিৎ। তার হাসিটা যে এত বিশ্রী লাগে দেখতে-আমার জানা ছিল না।
বায়ো মেডিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার, বলল অভিজিৎ। ছেলেটা ভালই। আত্মীয়-স্বজন কেউ নেই। নন্দিতাই পছন্দ করেছে। কপালে ডাক্তার জুটল না তো, তাতে কী? ওই লাইনেরই ইঞ্জিনিয়ার ধরেছে।
আমি কিছু বললাম না।
অভিজিৎ বলল, তোর বউ কী করে?
আমি বললাম, আমি তো বিয়েই করিনি। বউ আসবে কোত্থেকে?
অভিজিৎ বলল, তা হলে তো আরও ভাল হলো। ওই ছেলে না এলে তোর হাতেই নন্দিতাকে তুলে দেয়া যাবে। অবশ্য তুই যে মানের লুচ্চা, নন্দিতা রাজি হবে বলে মনে হয় না।
আমি বললাম, দেখ, অভিজিৎ, এভাবে বারবার আমাকে
হা-হা করে হাসল অভিজিৎ, কেন জানি না শিউরে উঠলাম আমি।
একাই খেলাম আমি। চমৎকার সব রান্না। অভিজিৎ খেল না। দোতলায় চলে গেল।
খেয়ে-দেয়ে বিছানায় শুয়ে পড়লাম। প্রায় সাড়ে তিনটা বাজে। মোবাইল বের করলাম। এখন পর্যন্ত একটাও কল আসেনি। দেখলাম স্ক্রিনে ইমার্জেন্সি লেখা। অর্থাৎ নেটওয়ার্ক নেই। বুঝলাম এদিকটায় মোবাইলের টাওয়ার নেই। কয়েকবার অফ-অন করলাম মোবাইল। লাভ হলো না। বালিশের নিচে মোবাইল রেখে এক সময় ঘুমিয়ে পড়লাম।
হঠাৎ করেই আমার ঘুম ভেঙে গেল।
ধড়মড় করে বিছানায় উঠে বসলাম।
প্রচণ্ড পিপাসায় বুক ফেটে যাচ্ছে।
ঘড়ির দিকে তাকালাম। রাত নটা বেজে গেছে!
এতক্ষণ আমি ঘুমিয়েছি!
কেউ ডাকল না আমাকে?
কোলাহলের শব্দ শুনতে পাচ্ছি। মনে হলো ঘরের বাইরে। একসঙ্গে অনেক মানুষ কথা বলছে। ঘরের বাইরে নাকি দোতলায়? মনে হচ্ছে তর্ক-বিতর্ক চলছে কিছু নিয়ে। আসলেই? নাকি কল্পনা? আমি বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালাম। মুহূর্তে সব শব্দ থেমে গেল। ঘরে অল্প পাওয়ারের বাতি জ্বলছে।
আমি টেবিলের কাছে গিয়ে জগ থেকে পানি ঢেলে খেলাম। কেমন যেন অস্বস্তি লাগছে।
জানালার পর্দা সরিয়ে বাইরে তাকালাম। নিকষ অন্ধকার।
এটা একটা বিয়ে বাড়ি, সেটা মনেই হচ্ছে না।
কোন আয়োজন নেই, কোন অতিথি নেই, এমনকী এখন পর্যন্ত নন্দিতারও কোন দেখা নেই।
অভিজিৎ বলেছে, লগ্ন রাত দুটোয়। আসলেই কি তাই?
আমি অবশ্য এসব লগ্নের বিষয় জানি না। বুঝিও না। নিজের ধর্মেরই খোঁজ রাখি না-আবার অন্যের ধর্ম!
আবার কোলাহলের শব্দ শুনলাম। কান খাড়া করলাম। আমি। মনে হলো কারা যেন ধাক্কাধাক্কি করছে। প্লেট ভাঙার শব্দ হলো। চেয়ার আছড়ে পড়ল কোথাও। কেউ একজন আউ করে উঠল। আমি ঘরের ভেতর চোখ বুলালাম। সব কেমন স্থির। খুব বেশি স্থির। আমি পা টিপেটিপে দোতলার সিঁড়ির কাছে গেলাম। দোতলায় নন্দিতার ঘর।
একটু ইতস্তত করলাম আমি। তারপর সিঁড়ি বেয়ে উঠতে শুরু করলাম। কতদিন নন্দিতাকে দেখিনি।
দোতলায় উঠে বড় ধরনের ধাক্কা খেলাম। নিচ থেকে আসা আবছা আলোয় দেখলাম দরজায় বড়সড় একটা তালা মারা। দুপুরে অভিজিৎ বলছিল সে এ ঘরেই ছিল, তা হলে কি তালা মেরে বাইরে গিয়েছে? আমার ঘরে ডিম লাইটটাও কি জেলে রেখে গেছে সে? আমি তালার গায়ে হাত রাখলাম। মনে হলো ধুলো পড়ে আছে।
