রিদি কয়েক মুহূর্ত রুহানের দিকে তাকিয়ে রইল তারপর হঠাৎ শব্দ করে হাসতে শুরু করল।
রুহান ভুরু কুঁচকে বলল, তুমি বোকার মতো হাসছ কেন?
রিদি কষ্ট করে হাসি থামিয়ে বলল, তুমি বোকার মতো কথা বললে দোষ নাই কিন্তু আমি বোকার মতো হাসলে দোষ?
আমি কখন বোকার মতো কথা বলেছি?
রুহান মুখ শক্ত করে বলল, আমি বলি নি এই ঘরের এই পোকা খাওয়া বইগুলো পড়বে।
তাহলে কী বলেছ?
বলেছি দরকার হলে এই রকম বই পড়বে। ক্রিস্টালে যেরকম তথ্য রাখা যায় সেরকম বইয়েও তথ্য রাখা যায়। ক্রিস্টাল রিডার যদি না থাকে তাহলে বইয়ের তথ্য দিয়ে কাজ চালানো যাবে। সবাইকে আবার বর্ণমালা শিখতে হবে–
রিদি আবার হাসতে শুরু করল। রুহান চোখ পাকিয়ে বলল, তুমি আবা। বোকার মতো হাসছ কেন?
তোমার কথা শুনে। আমি এবারে কোন কথাটা হাসির কথা বলেছি?
এই যে বলছ সবাইকে বর্ণমালা শিখতে হবে। তারপর বলবে সবাই গাছের বাকল পরে থাকতে হবে। গুহার ভেতরে কাঁচা মাংস আগুনে ঝলসে খেতে হবে–বিবর্তনে বানর থেকে যেরকম মানুষ হয়েছে, সেরকম আবার উল্টো বিবর্তনে আমরা সবাই মানুষ থেকে বানর হয়ে যাব। আমাদের সবার ছোট ছোট লেজ গজিয়ে যাবে!
এবারে রুহানও হেসে ফেলল, হাসতে হাসতে বলল, তোমার সাথে কথা বলার কোনো অর্থ নেই। তুমি কোনো কিছুকে গুরুত্ব দাও না।
রিদি রুহানের দিকে তাকিয়ে বলল, তুমি তো ভবিষ্যতে অনেকদূর তাকাতে পার তাই সবকিছুকে গুরুত্ব দিতে পার। আমার সমস্যাটা কী জান?
কী?
আমি একদিন একদিন করে বেঁচে থাকি। তাই কোনো কিছুকে গুরুত্ব দিতে পারি না।
রুহান কিছুক্ষণ রিদির দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, আমারও কী মনে হয় জান?
কী?
তুমি খুব একটা অদ্ভুত মানুষ।
রিদি চোখ বড় বড় করে বলল, কী আশ্চর্য! আমার ঠিক তাই মনে হচ্ছিল।
ঠিক কী মনে হচ্ছিল?
যে তুমি খুব আজব একজন মানুষ।
ঠিক কী কারণ জানা নেই হঠাৎ করে দুজনেই অকারণে হেসে ওঠে। পুরনো বিধ্বস্ত একটা ঘরে আবছা অন্ধকারে ধূলি ধূসরিত বইয়ের স্তূপের মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা দুইজনের হাসির শব্দটি অত্যন্ত বিচিত্র শোনায়।
দুপুরবেলা একটা ছোট খাবার দোকানে রিদি আর রুহান এক বাটি গরম স্যুপের শুকনো রুটি চিবিয়ে চিবিয়ে খাচ্ছে, তখন রুহান প্রথমে বিষয়টা লক্ষ করল। তাদের টেবিল থেকে দুই টেবিল দূরে বসে থাকা একজন মানুষ তাদের দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে আছে। রুহানের সাথে চোখাচোখি হওয়া মাত্রই মানুষটি চোখ সরিয়ে নিল। রুহান চোখের কোনা দিয়ে মানুষটাকে লক্ষ্য করে, খাওয়া শেষ না করেই মানুষটি উঠে গেল। সম্ভবত তাদের চিনে ফেলেছে—এত বড় একটা কাণ্ড করে এসেছে তাদের পরিচয়টা কেউ জানবে না সেটা তো হতে শারে না। আগে হোক পরে হোক এটা জানাজানি হবেই।
রুহান একটা নিঃশ্বাস ফেলে রিদিকে বলল, রিদি আমাদের পরিচয় কিন্তু এখানে জানাজানি হয়ে যাবে।
রিদি বলল, এখনও হয়নি সেটাই আশ্চর্য।
একটা মানুষ খুব সন্দেহজনক ভাবে উঠে গেল।
আবার ফিরে না আসা পর্যন্ত খেতে থাক। হালকা অস্ত্রটা খুলে রাখা যাক। দরকার হলে ব্যবহার করা যাবে।
রুহান বলল, যদি আমাদের পরিচয় জেনে থাকে তাহলে কিছু করার আগে অনেকবার চিন্তা করবে।
তা ঠিক।
রুহান চোখের কোনা দিয়ে চারদিকে এক নজর দেখে বলল, আমি এভাবে থাকতে পারব না।
কীভাবে থাকতে পারবে না?
এই যে সবসময় সতর্ক হয়ে, চোখ কান খোলা রেখে একটা হাত ট্রিগারের পর রেখে।
রিদি হেসে বলল, এখন বেঁচে থাকার এটাই হচ্ছে নিয়ম।
আমি এভাবে বেঁচে থাকতে চাই না।
তাহলে তুমি কীভাবে বেঁচে থাকতে চাও?
আমি আমার গ্রামে ফিরে যেতে চাই। সেখানে থাকতে চাই।
তোমার গ্রামে কে আছে রুহান?
আমার মা। আমার ছোট দুটি বোন। নুবা আর ত্রিনা।
রিদি কিছু না বলে কিছুক্ষণ রুহানের দিকে তাকিয়ে রইল। রুহান জিজ্ঞেস। করল, তোমার কে আছে রিদি?
আমার কেউ নেই।
কেউ নেই?
না।
কেন নেই সেটা জিজ্ঞেস করতে গিয়ে রুহান থেমে গেল। সে নিজে থে যদি বলতে না চায় তাহলে হয়তো জিজ্ঞেস করা ঠিক হবে না। রুহান বল, তাহলে তুমিও চল আমার সাথে। আমাদের গ্রামটা খুব সুন্দর, তোমার ভালো লাগবে।
রিদি কোনো কথা না বলে নিঃশব্দে রুহানের দিকে তাকিয়ে রইল। রুহা। বলল, সারা পৃথিবীর সবাই বলছে যার জোর বেশি সে যেটা বলবে সেটাই হচ্ছে নিয়ম। মানুষ আর পশুর মধ্যে এখন কোনো পার্থক্য নেই। আমরা বলল সেটা ভুল। আমাদের গ্রাম দিয়ে সেটা শুরু করব। ছোট একটা স্কুল বানাব। ছেলে-মেয়েরা সেখানে পড়বে। ক্রিস্টাল রিডার না থাকলে আমরা বর্ণমা! শেখাব, বই বানাব, বই পড়াব। আবার জ্ঞান চর্চা শুরু করব। একজন মানুষ আরেকজনকে ভালোবাসবে-
রুহান হঠাৎ থেমে গেল। রিদি জিজ্ঞেস করল, কী হলো? শুনতে তো ভালোই লাগছিল, থামলে কেন?
ঐ লোকটা ফিরে এসেছে সাথে আরো দুইজন। একজন পুরুষ অন্য মহিলা।
রিদির শরীরটা একটু শক্ত হয়ে যায়। নিচু গলায় জিজ্ঞেস করে, কী করতে ওরা?
কিছু করছে না, দেখছে। আমাদের দেখছে।
রুহান আর রিদি নিঃশব্দে বসে থাকে। মানুষগুলো কিছুক্ষণ তাদের দেখে আবার বের হয়ে গেল। রুহান একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, ভালো লাগে না। আমার একেবারেই ভালো লাগে না। এভাবে বেঁচে থাকার কোনো অর্থ নেই।
রিদি কিছু না বলে নিঃশব্দে রুহানের দিকে তাকিয়ে রইল।
সন্ধ্যেবেলা দুজন আবার বের হয়েছে। গান বাজনার বিকট সুর থেকে সরে গিয়ে তারা মূল বাজারটার দিকে এগিয়ে যায় উজ্জ্বল আলোতে বিচিত্র পোশাক পরা মানুষজন হাঁটাহাঁটি করছে, জিনিসপত্র দরদাম করছে কিনছে। এখানে এলে ঠাৎ করে মনে হয় পৃথিবীতে বুঝি কোনো সমস্যা নেই।
