রিদি একটু চোখ বড় বড় করে মানুষটার দিকে তাকাল। মানুষটা মুখে। হাসি আরেকটু বিস্তৃত করে বলল, তা ছাড়া বাথরুম করার পর মুছে ফেলা। কাজেও লাগানো যায়–
রুহান রিদির হাত ধরে টেনে সরিয়ে নিতে নিতে বলল, চল, বইয়ে। ব্যবহার সম্পর্কে আরো জটিল কিছু বের হওয়ার আগে কেটে পড়ি।
মানুষটি আবার দাঁত বের করে হেসে বলল, আমার কাছে আরো মজার মজার সব বই আছে।
রুহান যেতে যেতে দাঁড়িয়ে গিয়ে বলল, তুমি এগুলো কোথা থেকে আনো।
মানুষটি চোখ মটকে বলল, জানতে চাও?
রুহান মাথা নেড়ে বলল, হ্যাঁ।
আমাকে কত ইউনিট দেবে বল?
এক ইউনিটও দেব না। কথা শুনতে ইউনিট দিতে হয় কে বলেছে?
মানুষটা চোখ মটকে বলল, কথার যদি দাম থাকে তাহলে দাম দেবে না?
রুহান মাথা নাড়ল। না, দাম দিয়ে কথা শুনতে হলে কথা শুনবই না।
এক হাজার ইউনিট। মানুষটা মুখ গম্ভীর করে বলল, আমাকে এক হাজার ইউনিট দিলে তোমাকে বলে দেব, এগুলো কোথায় পাওয়া যায়।
রুহান আবার মাথা নেড়ে বলল, কিছু প্রয়োজন নেই।
সে হেঁটে চলে যাচ্ছিল, লোকটা পিছন থেকে চিৎকার করে বলল, ঠিক আছে! পাঁচশ ইউনিট!
রুহান মাথা নেড়ে বলল, এক ইউনিটও না।
রিদি আর রুহান হাঁটতে হাঁটতে শুনতে পেল মানুষটা পিছন থেকে চিৎকার করে বলল, ঠিক আছে! একশ ইউনিট।
রুহান এবারে আর কথার উত্তর দিল না। মানুষজনের ভিড় ঠেলে হেঁটে একটু এগিয়ে যেতেই কে যেন রুহানের আস্তিন টেনে ধরে। রুহান মাথা ঘুরিয়ে দেখে ঢুলুঢুলু চোখের একজন মানুষ, রুহানের হাতের বইগুলো দেখিয়ে বলল, তুমি এইগুলো ইউনিট খরচ করে কিনেছ?
হ্যাঁ, কেন? কী হয়েছে?
পূর্ব দিকে জঙ্গলের কাছে একটা দালান ভেঙ্গে পড়ে আছে, সেখানে গুলো পড়ে থাকে–হাজার হাজার। পোকা মাকড়ে খায়। আর তুমি বেকুব, এগুলো ইউনিট খরচ করে কিনেছ! তোমাদের মতো বোকা মানুষ আছে বলে অন্যেরা খেয়ে পরে বেঁচে থাকে।
রুহান হাসি চেপে রেখে বলল, কথাটা তুমি ভুল বল নাই। তবে তুমি আমাকে যতটা বোকা ভেবেছ, আমি তত বোকা নই। এই বইগুলো কোথায় পাওয়া যায় সেই খবরের জন্যে আমি কিন্তু একটা ইউনিটও খরচ করি না!
ঢুলুঢুলু চোখের মানুষটা বলল, তোমরা এখানে নতুন এসেছ?
হ্যাঁ।
তোমাদের কিছু লাগবে? কিছু সুন্দরী মেয়ে বিক্রি হচ্ছে।
রুহান আর রিদি একসাথে মাথা নেড়ে বলল, না লাগবে না।
খুব ভালো ক্লিনিক আছে পরিচিত। জটিল অপারেশন করাতে পার। গোপন অসুখ থাকলে-–
রিদি মাথা নেড়ে বলল, না, কোনো গোপন অসুখ নেই আমাদের।
ঢুলুঢুলু চোখের মানুষটা আবার কী একটা বলতে যাচ্ছিল, রুহান আর রিদি তাকে কোনো সুযোগ না দিয়ে দ্রুত সামনে হেঁটে যেতে শুরু করল।
০৯. দরজাটা ধাক্কা দিতেই
দরজাটা ধাক্কা দিতেই ক্যাঁচ ক্যাঁচ শব্দ করে খুলে গেল। ঘরের ভেতরে ভ্যাপ। এক ধরনের গন্ধ। আবছা অন্ধকারে দেখা যায় সারি সারি তাক, সেই তাকের উপর অসংখ্য বই। বইগুলো অযত্নে পড়ে আছে, ধূলায় ধূসর।
রুহান একটু এগিয়ে গিয়ে একটা বই টেনে নেয়। পৃষ্ঠা খুলে কী নে? আছে পড়ার চেষ্টা করে, মাছ যেমন করে পানি থেকে অক্সিজেন নেয় সেখানে। তার একটা ব্যাখ্যা লেখা রয়েছে। রিদি একটু অবাক হয়ে রুহানের দি তাকিয়েছিল, জিজ্ঞেস করল, তুমি কী করছ?
বইয়ে কী লেখা আছে সেটা পড়ার চেষ্টা করছি।
রিদি বিস্ফারিত চোখে বলল, কী বললে? পড়ার চেষ্টা করছ?
হ্যাঁ।
তুমি পড়তে পার?
খুব ভাল পারি না। শিখছি।
রিদি ভুরু কুঁচকে বলল, এত কাজ থাকতে তুমি পড়া শিখছ কেন? এটা যেন অনেকটা অনেকটা–
রুহান মুখে হাসি টেনে বলল, অনেকটা কী?
অনেকটা হামাগুড়ি দিয়ে হাঁটতে শেখার মতো। তুমি যখন দুই পায়ে হাঁটতে পারো তখন হামাগুড়ি দিয়ে হাঁটতে শেখার চেষ্টা করবে কেন? ক্রিস্টাল রিডার দিয়ে সব রকম তথ্য বিনিময় করা যায় তখন কাগজে বর্ণমালা লিখে তথ্য বিনিময় করতে চাইছ কেন?
রুহান মাথা নেড়ে বলল, আমি জানি না। তবে—
তবে কী?
আমার কী মনে হয় জান?
কী?
রুহান বলল, আমার মনে হয় কিছুদিন পর আমাদের কাছে আর ক্রিস্টাল রিডার থাকবে না। পৃথিবীতে এত মারামারি কাটাকাটি হচ্ছে যে নতুন করে কেউ ক্রিস্টাল রিডার বানাতেও পারবে না। তখন কী হবে জান?
রিদি কেমন যেন বিচিত্র দৃষ্টিতে রুহানের দিকে তাকিয়ে রইল। খানিক্ষণ পর বলল, তুমি সত্যিই এটা মনে করো?
রুহান মাথা নেড়ে বলল, হ্যাঁ। আমি মনে করি। শুধু যে ক্রিস্টাল রিডার থাকবে নাম তা না। অস্ত্র থাকবে না। গাড়ি থাকবে না। কাপড় থাকবে না। খাবার থাকবে না!
কী বলছ তুমি?
আমি ঠিকই বলছি। রুহানের মুখটা অকারণেই গম্ভীর হয়ে যায়। সে থেমে থেমে বলল, আমাদের খুব দুর্ভাগ্য আমরা পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে খারাপ সময়ে জন্মেছি। যখন সবকিছু ধ্বংস হচ্ছে। চারপাশে সবাই ডাকাত। জ্ঞান-বিজ্ঞান নেই লেখাপড়া নেই–
রিদি বাধা দিয়ে বলল, সে কী! তুমি দেখি বুড়ো মানুষদের মতো কথা বলতে শুরু করেছ।
রুহান হেসে বলল, ঠিকই বলেছ। আমি মনে হয় বুড়ো হয়ে গেছি। কিন্তু কথাগুলো তুমি খুব ভুল বলে নি।
রুহানের চোখ কেমন জানি চকচক করে ওঠে, সে একটা বড় নিঃশ্বাস নিয়ে বলল, আমি তো ইতিহাস খুব বেশি জানি না কিন্তু যেটুকু জানি সেখানে কী দেখেছি জান?
কী দেখেছ?
যখন মানুষের অবস্থা খুব খারাপ হয়ে যায় তখন তারা আবার মাথা সোজা করে দাঁড়ায়। এখানেও নিশ্চয়ই দাঁড়াবে। যখন দাঁড়াবে তখন তো আবার জ্ঞান চর্চা করতে হবে। জানতে হবে, শিখতে হবে–তখন যদি ক্রিস্টাল রিডার না থাকে তখন তারা এই বই থেকে পড়বে।
