হাঁটতে হাঁটতে সামনে একটু ভিড় দেখে দুজনে এগিয়ে যায়, একটা খাঁচার ভেতরে বেশ কিছু ছেলেমেয়ে। পাশে একটা ছোট মঞ্চ, সেখানে একজন কিশোর দাঁড়িয়ে আছে। কিশোরটি এক ধরনের শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে, দেখে মনে হয় তার চারপাশে কী ঘটছে সে বুঝতে পারছে না। কিশোরটির পাশে একজন মানুষ হাতে মাইক্রোফোন নিয়ে কথা বলছে।
রুহান এবং রিদি শুনল, মানুষটি বলছে, এর নাম কিসি। কিসির বয়স বারো কিন্তু তোমরা দেখতে পাচ্ছ তার বাড়ন্ত শরীর। একদিন সে যে একজন হাট্টাকাট্টা জোয়ান হবে সেই বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। আমরা আমাদের নিজস্ব ডাক্তার দিয়ে কিসিকে পরীক্ষা করিয়েছি। কিসি একেবারে সুস্থ। সবল এবং নিরোগ তার শরীরে কোনো রোগ-জীবাণু নেই। কিসির পরিরারের জিনিসপত্র আমাদের কাছে আছে, ডি.এন.এ প্রোফাইলও আছে, ইচ্ছা করলে তোমরা দেখতে পার।
মানুষটি দম নেবার জন্যে একটু থামল, তখন রুহান আর রিদি বুঝতে পরল এখানে মানুষ বেচা-কেনা হচ্ছে। তারা আগে কখনো এটি দেখে নি, দুজনেই এক ধরনের কৌতূহল নিয়ে এগিয়ে যায়। মানুষটি মাইক্রোফোনটা গুখের কাছে নিয়ে আবার কথা বলতে শুরু করে, এই ছেলেটাকে আমরা এনেছি দক্ষিণের অঞ্চল থেকে। অনেক কষ্ট করে আনতে হয়েছে, তোমরা জান সারা পৃথিবীতে মারামারি কাটাকাটি চলছে। এর মধ্যে মানুষ ধরে আনা সোজা কথা না। যেভাবে চলছে তাতে মনে হচ্ছে কিছুদিন পর সাধারণ মানুষ আর মানুষের বাজারে হাত দিতে পারবে না, দাম কমপক্ষে তিন-চার গুণ বেড়ে যাবে। এখনই সময় আমি অনেক কম দামে ছেড়ে দিচ্ছি, এই বাড়ন্ত কিশোরটি মাত্র দুই ইজার ইউনিট!
পাশে থেকে একজন বলল, দুই হাজার ইউনিট কী মাত্র হলো নাকি? এই দমে একটা গাড়ি কেনা যায়।
মাইক্রোফোন হাতে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটা বলল, গাড়ি আর মানুষ কী এক জিনিস? আস্ত একটা মানুষ পেয়ে যাচ্ছ। যদি এর শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ খোলা বাজারে বিক্রি করো তাহলে কত দাম পাবে জান? আজকাল ভালো একটা হৃৎপিণ্ডই পাঁচশো ইউনিটের কমে পাওয়া যায় না। হৃৎপিণ্ড ছাড়া আছে কিডনি, লিভার, লাংস। চোখের কর্ণিয়া, ব্রেন আর রক্ত। একেবারে ফ্রেশ রক্ত। তুমি যদি মানুষটাকে সারা জীবন পালতে না চাও কেটেকুটে বিক্রি করে দিতে পারো। তাতে লাভ হবে আরো বেশি। কিনবে কেউ?
বুড়ো মতো একজন মানুষ বলল, ধুর! পোলাপান দিয়ে কী করব? মেয়েমানুষ থাকলে দেখাও।
মেয়েমানুষ? মেয়েমানুষ থাকবে না কেন? অবশ্যই আছে। আমাদে৷ কোম্পানির আসল বিজনেস হচ্ছে মেয়েমানুষের বিজনেস। আমাদের নেটওয়াএকেবারে গভীর গ্রাম পর্যন্ত ছড়িয়ে আছে। সারা দেশ খুঁজে আমরা সুন্দর মেয়েমানুষ ধরে আনি।
মানুষটি খাঁচা খুলে কিসি নামের কিশোরটাকে ভিতরে ঠেলে দিয়ে এ মেয়েকে হাত ধরে টেনে বাইরে নিয়ে আসে। মেয়েটার ভাবলেশহীন মুখ। চোখে মুখে এক ধরনের বিচিত্র কাঠিন্য। মাথায় এলোমেলো চুল, শরীরে কাপড় অবিন্যস্ত। মানুষটা মেয়েটির চারপাশে ঘুরে মুখে একধরনের পরিতৃপ্তি শব্দ করে বলল, এই মেয়েটার নাম ক্রিটিনা। মেয়েটার শরীরটা একবার ভালো করে দেখ! দেখলেই জিবে পানি চলে আসে।
মানুষটার কথা শুনে উপস্থিত অনেকেই শব্দ করে হেসে উঠল। উৎসাহ পেয়ে মানুষটা বলল, একেবারে গহীন একটা গ্রাম থেকে ধরে এনেছি, যেভ। এনেছি ঠিক সেইভাবে তোমাদের সামনে হাজির করেছি। তোমরা কল্পনা করা। নাও যখন এই মেয়েকে সাজিয়ে গুছিয়ে আনবে তখন তাকে দেখতে কেমন লাগবে। মনে হবে একেবারে আগুনের খাপরা।
মানুষটি একটু দম নিয়ে বলল, এই আগুনের খাপরার বয়স উনিশ। পরিরারের কাগজপত্র, ডি.এন.এ প্রোফাইল সবকিছু তৈরি আছে। ইচ্ছে করলে দেখতে পার। ডাক্তারী পরীক্ষা হয়েছে, একেবারে সুস্থ সবল নিরোগ। অনে কষ্ট করে অনেক দূর থেকে এনেছি তাই দাম একটু বেশি কিন্তু এই জিনিস কম দামে পাবে না।
বুড়ো মানুষটা মুখের লোল টেনে বলল, কত দাম?
পাঁচ হাজার ইউনিট।
পাঁচ হাজার? বুড়ো মানুষটা প্রায় আর্তনাদ করে বলল, পাঁচ হাজার ইউনিট কী ছেলেখেলা নাকি?
মাইক্রোফোন হাতে মানুষটা বলল, আমি কী বলেছি এটা ছেলেখেলা? ভালো জিনিস চাইলে তার দাম দিতে হয়। বুঝেছ?
বুড়ো মানুষটা বলল, আমাকে আগে ভালো করে দেখতে দাও।
দেখ দেখ, যত খুশি দেখ। এর মধ্যে কোনো ভেজাল নেই।
বুড়ো মানুষটি মঞ্চে উঠে মেয়েটাকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে। তারপর সন্তুষ্টির মতো একটা শব্দ করে পকেট থেকে ইউনিটের বান্ডিল বের করে গুনে গুনে দিতে থাকে।
রুহান মেয়েটির মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। তার চোখ মুখে কী গভীর একটা বিষাদের ছাপ। চোখ থেকে নেমে আসা পানি গালের উপর শুকিয়ে রয়েছে। বড় বড় চোখে এক ধরনের অবর্ণনীয় অবিশ্বাস নিয়ে সামনে তাকিয়ে আছে। সেই চোখে এক গভীর হতাশা।
বুড়ো মানুষটা তার ইউনিটগুলো মাইক্রোফোন হাতের মানুষটাকে ধরিয়ে দিয়ে মেয়েটার হাত ধরে টেনে আনতে শুরু করে। কী করছে বুঝতে না পেরেই রুহান হঠাৎ গলা উঁচিয়ে বলল, এই যে বুড়ো, তুমি দাঁড়াও।
বুড়ো মানুষটি দাঁড়িয়ে গেল, তার মুখে ক্রোধের একটা ছায়া পড়ে। সে কঠিন চোখে ভিড়ের মানুষগুলোর দিকে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করে কে তার সাথে এই অশোভন গলায় কথা বলছে। মানুষটা রুহান সেটা আবিষ্কার করে বুড়ো মানুষটা কেমন যেন থিতিয়ে যায়–তার সারা শরীর ঝুলে থাকা অস্ত্রগুলোই যে এর কারণ তাতে কোনো সন্দেহ নেই। সে শুকনো গলায় বলল, হয়েছে?
