রুহান বলল, ঘুমানোর আগে গরম পানিতে ভালো করে রগড়ে গোসল করব।
রিদি মাথা নেড়ে বলল, হ্যাঁ, সেটাও করতে হবে।
এলোমেলো চুলের মানুষটা এবারে সোজা হয়ে বসল। চোখ বড় বড় করে বলল, এখানে চাররকম থাকার জায়গা আছে। প্রথমটা হচ্ছে দামি, অনেক ইউনিট লাগে–
না না না। রুহান বাধা দিল, আমরা খুব কম ইউনিটে থাকতে চাই। সম্ভব হলে কোনো ইউনিট খরচ না করে।
মানুষটা অবাক হয়ে বলল, কোনো ইউনিট খরচ না করে?
হ্যাঁ। মনে করো কাজের বিনিময়ে খাদ্য। কিংবা কাজের বিনিময়ে নিদ্রা।
মানুষটা কিছুক্ষণ তাদের দুজনের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর বল, সত্যি তোমাদের কোন ধরনের কাজ দরকার?
রিদি আর রুহান দুজনেই মাথা নাড়ল। মানুষটা জিজ্ঞেস করল, কা ধরনের কাজ?
রুহান বলল, সেটা ভালো করে জানি না।
তোমাদের কাছে এত রকম অস্ত্র –সেগুলো নিশ্চয়ই ব্যবহার করতে পার?
রুহান আর রিদি একজন আরেকজনের দিকে তাকাল, রিদি হাসি গোপ করে বলল, একটু একটু পারি।
তাহলে তোমরা হয়তো কোনো ব্যবসায়ীর বডিগার্ড হিসেবে কাজ করতে পারবে। কিংবা কোনো দোকানে নিরাপত্তা কর্মী। কী বলো?
রিদি আর রুহান কোনো কথা না বলে একটু কাঁধ ঝাঁকাল।
তোমরা ইচ্ছে করলে নিজেদের একটা দল খুলতে পার। কিছু মানুষ নিয়ে তাদের ট্রেনিং দিয়ে—
রুহান বলল, ডাকাতের দল? রক্ষে করো!
ডাকাত? ডাকাত বলছ কেন।
অস্ত্র নিয়ে ট্রেনিং দিয়ে হামলা করাকে বলে ডাকাতি।
মানুষটা শব্দ করে হেসে বলল, তোমরা খুব মজার মানুষ। এটা ডাকাতি হবে কেন? এটা এখন সবাই করে।
রিদি কিংবা রুহান কোনো কথা না বলে পানীয়ের গ্লাসে চুমুক দিল। রুহান বলল, তার চাইতে ভালো থাকার জায়গা কোথায় আছে বলো।
তোমরা যদি সোজা হেঁটে যাও, একেবারে পাহাড়ের নিচে দেখবে ছোট ছোট ঘর আছে। রাতের জন্যে ভাড়া দেয়। পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। পাহাড়ের নিচে। বলে অবশ্যি রাতে ঝড়ো বাতাসের খুব শব্দ হয়।
হোক। রুহান বলল, ঝড় বাতাস আমার ভালোই লাগে।
মানুষটি এবারে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে দুজনকে লক্ষ্য করে বলল, আচ্ছা। তোমরা বলবে তোমরা কারা? কী করো, কোথায় থাক?
রিদি বলল, এখনো জানি না। যখন জানব তখন বলব। নিশ্চয়ই বলব।
জান না মানে?
আমাদের দুজনের দেখা হয়েছে আজ দুপুরে। একজন আরেকজনকে ভালো করে চিনিই না। শুধু একজন আরেকজনের নামটা জানি।
মানুষটি কিছুক্ষণ তাদের দিকে তাকিয়ে হা হা করে হেসে বলল, তোমরা খুব মজার মানুষ। তারপর চোখ টিপে বলল, বুঝতে পারছি সত্যি কথাটি বলতে চাইছ না। না বললে নাই–এখানে কেউ সত্যি কথা বলে না। শুধু আমি বলি। আমার নাম দ্রুচেন। এজেন্ট দ্রুচেন। সবাই চেনে আমাকে। কোনো দরকার হলে আমাকে খবর দিও। আমি নিয়ম মেনে চলি, তোমাদের কাজ জোগাড় করে দেব। দশ ভাগ কমিশন আমার।
ঠিক আছে।
তাহলে তোমরা ডিনার করো, আমি যাই। পানীয়ের জন্যে ধন্যবাদ।
রুহান হাসিমুখে বলল, লাল পাহাড়ের ভেতরের খবর দেবার জন্যে তোমাকেও ধন্যবাদ।
খাওয়া শেষ করে রিদি আর রুহান এলাকাটাতে খানিকক্ষণ ইতস্তত হাঁটে। বাজারের কাছাকাছি এলাকায় নাচ গান হচ্ছে। মানুষজন তাল-লয়হীন বিকট সঙ্গীতের সাথে নাচানাচি করছে। নেশা করে তাদের চোখ মুখ রক্তাভ, চালচলন কথাবার্তা সংযত। তারা সেখানে বেশি সময় না থেকে সরে এলো, আশেপাশে নানা ধরনের দোকানপাট। অস্ত্রের দোকান সবচেয়ে বেশি, সেখানে নানারকম স সাজানো আছে, মানুষজন সেগুলো নেড়েচেড়ে দেখছে, কিনছে। পাশাপাশি বেশ কয়েকটা বড় নার্সিং হোম। সেখানে শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বেচা-কেনা tlk। গাড়ির বেশ বড় বড় দোকান। নানা ধরনের গাড়ি সাজানো রয়েছে। পোশকের অনেকগুলো দোকান। মনে হয় পোশাকের এক ধরনের পরিবর্তন হয়েছে, বেশিরভাগই বিদঘুটে রঙের বিচিত্র সব পোশাক।
রিদি আর রুহান হাঁটতে হাঁটতে শহরের এক পাশে চলে এলো, সেখানে ছোট ছোট দোকান। রাস্তার পাশে স্থপ করে রেখে নানা ধরনের বিচিত্র পত্র বিক্রি হচ্ছে। ঘরে সাজিয়ে রাখার জন্যে ফর্মালিনে ড়ুবিয়ে রাখা মানুষের আঙুল, চোখ, জিব। জিনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং ব্যবহার করে তৈরি করা কিছু বিচিত্র জন্তু। সীসার কৌটায় ভরে রাখা তেজক্রিয় মৌল। বিভিন্ন জাদুঘর থেকে চুরি করে আনা প্রাচীন মূর্তির অংশ। রুহান হঠাৎ অবাক হয়ে দেখল কমবয়সী একজন মানুষ অনেকগুলো বই নিয়ে বসে আছে। সে কৌতূহলী হয়ে এগিয়ে যায়। রিদি জিজ্ঞেস করল, এগুলো কী?
কমবয়সী মানুষটি বলল, জানি না। তাহলে এগুলো বিক্রি করছ কেন?
কমবয়সী মানুষটি দাঁত বের করে হেসে বলল, আমি না জানলে ক্ষতি কী অন্য কেউ তো জানতে পারে।
রুহান বলল, আমি জানি। এগুলোকে বলে বই। আগে যখন মানুষের কাছে ক্রিস্টাল রিডার ছিল না তখন তারা এভাবে তথ্য বাঁচিয়ে রাখত।
রিদি অবাক হয়ে বলল, কী আশ্চর্য! এখানে কীভাবে তথ্য বাঁচিয়ে রাখবে?
রুহান বিষয়টা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে থেমে গেল। কমবয়সী মানুষটা যদি বুঝতে পারে সে বই নামের বিষয়টা সম্পর্কে জানে এমনকী সে অল্প বিস্তর পড়তেও পারে তাহলে শুধু শুধু বইগুলোর দাম বাড়িয়ে দেবে। সে দুই-একটা বই কিনতে চায়। বইগুলো উল্টে পাল্টে সে কয়েকটা বই বেছে নেয়। দাম নিয়ে কিছুক্ষণ দরাদরি করে বইগুলো কেনে। রিদি ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল, তুমি কী করবে এগুলো দিয়ে?
রুহান কিছু বলার আগেই কমবয়সী মানুষটা বলল, ঘরে সাজিয়ে রাখা যায়। আর নেশা করার কাজে লাগে। কাগজ ছিঁড়ে গোল করে পাকিয়ে ভিসুবিচিরাস নাক দিয়ে টানা যায়। হাশিস খাবার জন্যে আগুন জ্বালাতেও খুব সুবিধা। একটা একটা করে কাগজ ছিঁড়ে আগুন জ্বালাবে।
