রিদি মানুষের ভিড়ে হাঁটতে হাঁটতে বলল, রুহান জায়গাটা আমার পছন্দ হয়েছে।
রুহান হেসে বলল, আমরা যেরকম জায়গা থেকে এসেছি তারপর সরাসরি নরক না হলেই জায়গাটা আমাদের পছন্দ হবার কথা।
রিদি বলল, একটা জিনিস লক্ষ্য করেছ? এখানকার মানুষের চোখে মুখে সেই ভয় আর আতঙ্ক নেই।
হ্যাঁ। অনেকের মুখে হাসি। রুহান নিজেও হাসার চেষ্টা করে বলল, হাসতে কেমন লাগে ভুলেই গেছি।
রিদি বলল, পেটে কিছু পড়লে তুমিও হাসতে পারবে।
খুঁজে খুঁজে দুজনে একটা ভালো খাওয়ার জায়গা বের করল। পাথরের একটা বাসার সামনে চেয়ার টেবিল সাজানো। কাছেই পাথরের চুলোতে গনগনে আগুনে সত্যিকারের মাংস মশলা মাখিয়ে ঝলসানো হচ্ছে। অনেক মানুষের ভিড় তার মধ্যে দুজনে ঠেলেঠুলে একটা টেবিল দখল করে নিল। কমবয়সী একটা মেয়ে তাদের টেবিলে উত্তেজক পানীয়ের একটা জগ দিয়ে গেল। পাথরের গ্লাসে ঢেলে এক চুমুক খাওয়ার পরেই তাদের মন ভালো হয়ে যায়। তারা বসে বসে পা দুলিয়ে চারপাশের মানুষগুলোকে দেখতে থাকে।
তোমাদের সাথে বসতে পারি? গলার স্বর শুনে দুজনে তাকিয়ে দেখে মাঝবয়সী একজন মানুষ, উষ্কখুষ্ক চুল, চোখ দুটো জ্বলজ্বলে এবং অস্থির।
রুহান পা দোলানো বন্ধ করে বলল, হ্যাঁ, পার।
রিদি বলল, ইচ্ছে করলে আমাদের পানীয়ও এক ঢোক খেতে পার।
মানুষটি তাদের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে বলল, তোমরা নিশ্চয়ই এই এলাকার মানুষ নও।
কেন?
এই এলাকার মানুষেরা পরিচয় হবার আগেই কাউকে তার পানীয়তে ভাগ বসাতে দেয় না।
রিদি আর রুহান দুজনেই শব্দ করে হাসল। রুহান বলল, অন্যদিন তোমাকে এত সহজে আমাদের পানীয়তে ভাগ বসাতে দেব না। আজ দিচ্ছি। আজ আমাদের মনটা খুব ভালো।
মানুষটা জিজ্ঞেস করল, কেন? তোমাদের মন ভালো কেন?
রুহান সরাসরি উত্তর দিল না, বলল, অনেকগুলো কারণ আছে, তোমাকে কোনটা ছেড়ে কোনটা বলি? তা ছাড়া মন ভালো হতে কী আর কারণের দরকা। হয়? এই উত্তেজক পানীয় এক ঢোক খেলেই মন ভালো হয়ে যায়।
মানুষটি মাথা নেড়ে তার পানীয়ে চুমুক দিয়ে বলল, সেটা ঠিকই বলেছ। একটা সময় ছিল যখন সবসময়ে মানুষের মন খারাপ থাকত–কখন কী হয় সেটা নিয়ে দুশ্চিন্তা করত। এখন উল্টো। ধরেই নিয়েছে জীবনটা যে কোনো সময় শেষ হয়ে যাবে। তাই যে কয়দিন আছে সেই কয়দিন ফূর্তি করে নাও।
রিদি আর রুহান দুজন কোনো কথা না বলে অন্যমনস্কভাবে মাথা নাড়ল। মানুষটি বলল, তোমরা এখানে নতুন এসেছ?
রুহান মাথা নেড়ে বলল, হ্যাঁ।
লাল পাহাড় ঘুরে দেখেছ?
না। এখনো দেখি নি। এখানে কী আছে দেখার মতো?
মানুষটি চোখ বড় বড় করে উৎসাহ নিয়ে বলল, এই এলাকার সবচেয়ে বড় বাজারটি এখানে। এমন কোনো জিনিস নেই যেটা এখানে পাওয়া যায় না। অস্ত্র পাতি গোলাবারুদ থেকে শুরু করে মানুষ মেয়েমানুষ সবকিছু এখানে পাওয়া যায়।
তাই নাকি?
হ্যাঁ। মানুষটি একটু ঝুঁকে বলল, কিনবে তোমরা কিছু? সুন্দরী মেয়েদের একটা চালান আসছে শুনেছি।
রিদি মাথা নেড়ে বলল, না আমরা কিছু কিনব না।
মানুষটার একটু আশাভঙ্গ হলো বলে মনে হলো। বলল, তোমরা এত ক্ষমতাশালী মানুষ, তোমরা যদি কিছু ইউনিট খরচ না কর তাহলে বাজার চালু থাকবে কেমন করে?
রুহান সোজা হয়ে বসে বলল, ক্ষমতাশালী? আমরা? তোমার এরকম ধারণা হলো কেমন করে?
বাহ্! মানুষটা দুই হাত তুলে বলল, তোমরা কী রকম অস্ত্র নিয়ে ঘুরছ দেখেছ? এরকম একটা অস্ত্র কত ইউনিটে বিক্রি হয় জান?
রুহান কিংবা রিদি দুজনের কেউই সেটা জানে না, তবে তারা সেটা প্রকাশ করল না, সাবধানে মাথা নাড়ল।
মানুষটা বলল, সারা লাল পাহাড়ে কারো কাছে এই অস্ত্র নেই, আর তোমাদের একজনের কাছেই আছে তিনটা করে! ক্ষমতা না থাকলে এগুলো হয় না।
রুহান আর রিদি একজন আরেকজনের দিকে তাকাল তারা এই বিষয়টা আগে। এভাবে চিন্তা করে নি। মানুষটা বলল, তোমরা কী কিছু কিনবে? ফূর্তি-ফার্তা করবে?
উঁহু। রুহান মাথা নাড়ল।
মানুষটা মাথা আরেকটু এগিয়ে আনল, নিচু গলায় ষড়যন্ত্রীর মতো বলল, কোনো গোপন রোগের চিকিৎসা করাতে চাও? আমার পরিচিত ভালো ডাক্তার আছে।
রুহান মাথা নাড়াতে গিয়ে হেসে বলল, না, আমাদের কোনো গোপন রোগ নেই।
আজকাল খুব একটা জনপ্রিয় অপারেশন হচ্ছে। পুরুষ মহিলা হওয়ার অপারেশন। মাত্র সাতদিন ক্লিনিকে থাকতে হয়—
রিদি আর রুহান দুজনেই মাথা নাড়ল। রিদি বলল, রক্ষে কর। এতদিন থেকে পুরুষ মানুষ হয়ে আছি অভ্যাস হয়ে গেছে। এখন আমি মহিলা হতে পারব না।
মানুষটি তবু হাল ছাড়ল না, বলল, আমারও তাই ধারণা। এরকম হাট্টাকাট্টা জোয়ান পুরুষ মানুষ, খামোখা অপারেশন করে মেয়ে হতে যাবে কেন? তোমাদের বরং দরকার বাড়তি পৌরুষত্ব। খুব ভালো হরমোন আছে এখানে। ব্ল্যাক মার্কেটের এক নম্বর জিনিস। লাগবে?
রুহান মাথা নেড়ে বলল, না লাগবে না।
তাহলে দুই নম্বর হৃৎপিণ্ড? ছোট্ট শিশুর ভালো হৃৎপিণ্ড আছে। বুকের ভতর বসিয়ে দেবে টেরও পাবে না। আসল হৃৎপিণ্ডের সাথে সাথে চলবে। এখন যত পরিশ্রম করতে পার তার ডবল পরিশ্রম করতে পারবে।
রুহান হেসে বলল, না, আমার মনে হচ্ছে একটা হৃৎপিণ্ডতেই আমার বেশ কাজ চলে যাচ্ছে।
মানুষটি এবারে রীতিমতো হতাশ হয়ে চেয়ারে হেলান দিয়ে মনমরা হয়ে বসে পড়ল।
রিদি বলল, যদি একান্তই আমাদের সাহায্য করতে চাও তাহলে বলো রাত কাটানোর জন্যে ভালো একটা জায়গা কোথায় পাব? কোনো হাঙ্গামা হুঁল্লোড় চাই না, শুধু নিরিবিলি ঘুমাব।
