রিদি বলল, এখানে দাঁড়িয়ে না থেকে চল হাঁটি। পাহাড় ঘিরে পথটা গেছে, অনেকদূর হেঁটে যেতে হবে।
উঁহু। রুহান মাথা নেড়ে বলল, আমাদের এখন রওনা দেয়া ঠিক হবে না।
কেন?
অনেকটা পথ। কমপক্ষে তিন চার ঘণ্টা তো লাগবেই। এখন এই রাস্তা আমাদের এতক্ষণ থাকা ঠিক না।
কেন? রাস্তায় থাকলে কী হবে?
ক্ৰিভনকে আমরা যেভাবে ধরে এনেছি সেটা একটা যুদ্ধবাজ নেতার জন্যে খুব বড় অপমান। বিশেষ করে এত হাজার হাজার মানুষের সামনে-
হ্যাঁ। সেটা ভুল বল নি।
রুহান বলল, সেই অপমান থেকে রক্ষা পাবার তার এখন একটাই পথ।
রিদি মাথা নেড়ে বলল, আমাদের ধরে নিয়ে দশ হাজার মানুষের সামনে একটা ভয়ঙ্কর শাস্তি দেয়া?
হ্যাঁ। আমরা ক্ৰিভনকে এখানে ছেড়ে দিয়েছি। ক্ৰিভন জানে আমরা এখন এই পথ দিয়ে হেঁটে হেঁটে যাব। ঘণ্টা তিনেক লাগবে পৌঁছাতে। সে নিশ্চয়ই এই সময়ে তার দলবল নিয়ে আমাদের ধরতে ফিরে আসবে। কাজেই আমাদের এখন এই রাস্তায় থাকা ঠিক হবে না।
রিদি কিছুক্ষণ রুহানের দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, ঠিকই বলেছ।
রুহান বলল, রাস্তা দিয়ে না হেঁটে আমরা এই পাহাড়ের ঢালু দিয়ে হেঁটে যাই। আমার মনে হয় আমরা তাহলে অনেক তাড়াতাড়ি পৌঁছে যাব।
রিদি আবার মাথা নেড়ে বলল, চমৎকার বুদ্ধি।
যদি দরকার হয় আমরা তাহলে ভালো একটা জায়গায় অপেক্ষা করতে পারি। যদি ক্ৰিভনের দলের সাথে যুদ্ধ করতেই হয় আমরা সেটা করব একটা সুবিধাজনক জায়গা থেকে।
রিদি বলল, রুহান, তোমার মাথা খুব পরিষ্কার। তোমার মাথায় ইলেকট্রড বসিয়ে যে সক্রেটিস বানায় নি সেটাই আশ্চর্য।
চেষ্টা করেছিল। রুহান বলল, আমি ধোকা দিয়ে বের হয়ে এসেছি। রিদি চোখ বড় বড় করে বলল, আশ্চর্য!
আশ্চর্যের কিছু নেই। এখন চল ঢালু বেয়ে হাঁটতে শুরু করি। অন্ধকার হবার আগে পৌঁছে গেলে খারাপ হয় না।
চল।
দুজন তখন পাহাড়ী ছাগলের মতো পাথরের উপর লাফিয়ে লাফিয়ে নামতে শুরু করে। এই পথ দিয়ে মানুষ হাঁটে না, তাই চারদিক গাছপালা ঝোপঝাড়ে ঢেকে আছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই তারা গভীর জঙ্গলে অদৃশ্য হয়ে গেল। পাহাড়ী পথে ক্রিভনের লোকজন চলে এলেও তারা কোনোদিন তাদের খুঁজে পাবে না।
একটা পাহাড়ী ঝর্ণার কাছে বসে তারা যখন ঘষে ঘষে তাদের মুখের রং ওঠানোর চেষ্টা করছিল তখন তারা অনেকগুলো সাজোয়া গাড়ির শব্দ শুনতে পেল। গাড়িগুলো কর্কশ শব্দ করতে করতে রাস্তায় ছোটাছুটি করছে। অনেক মানুষের উত্তেজিত কণ্ঠস্বর এবং কিছু বিক্ষিপ্ত গোলাগুলির শব্দও তারা শুনতে পেল। নিশ্চয়ই ক্রিভনের বাহিনী এসে তাদের খোঁজ করছে, তারা যেখানে আছে সেখানে কখনোই তারা খুঁজে পাবে না। ঘণ্টাখানেক পর রুহান আর রিদি আবার সাজোয়া গাড়িগুলোর কর্কশ শব্দ শুনতে পেল, তাদের খুঁজে না পেয়ে সেগুলো ফিরে যেতে শুরু করেছে।
রিদি রুহানের দিকে তাকিয়ে বলল, তোমার সন্দেহটা একেবারে একশ দশ ভাগ সত্যি ছিল।
রুহান বলল, তার অর্থ কী জান?
কী?
আমি এখন অপরাধীদের মতো চিন্তা করি।
রিদি শব্দ করে হেসে বলল, অপরাধীর মতো চিন্তা করা অপরাধ না, অপরাধীর মতো কাজ করা হচ্ছে অপরাধ।
রুহান বলল, কিন্তু তুমি আসল বিষয়টা ভুলে যাচ্ছ। অপরাধীর মতো চিন্তা করা অপরাধ না হতে পারে কিন্তু এটা খুব কষ্ট। আমি আগে এরকম ছিলাম না।
রিদি রুহানের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলল, তুমি কী একটা জিনিস লক্ষ্য করেছ?
কী?
আমরা দুজন একজন আরেকজন সম্পর্কে কিছুই জানি না।
রুহান মাথা নেড়ে বলল, হ্যাঁ। আমাদের একজন আরেকজনকে খুন করার কথা ছিল। অথচ এখন একজন আরেকজনকে ছাড়া থাকতে পারব না। বেঁচে থাকার জন্যে তোমার আমাকে আর আমার তোমাকে দরকার।
রিদি এক দৃষ্টে রুহানের দিকে তাকিয়ে রইল। রুহান জিজ্ঞেস করল, কী লো? তুমি এভাবে আমার দিকে তাকিয়ে আছ কেন?
তোমাকে দেখছি।
আমাকে কী দেখছ?
যে মানুষটার সাথে আমার থাকতে হবে তার চেহারাটা কেমন সেটা এখনো ভালো করে দেখতে পারি নি। তোমার চেহারাটা দেখার চেষ্টা করছিলাম, তুমি কী জান—
জানি।
রিদি অবাক হয়ে বলল, কী জান?
তুমি নিশ্চয়ই বলতে চাইছ ঝর্ণার পানি দিয়ে আমি আমার মুখের রং ধুতে পারি নি। উল্টো সেই রং ছড়িয়ে পড়ে এখন আমাকে একটা ভূতের মতো দেখাচ্ছে।
রিদি শব্দ করে হেসে বলল, হ্যাঁ, আমি সেটাই বলতে যাচ্ছিলাম। তবে তুমি যখন নিজেই এটা আবিষ্কার করেছ তার একটাই অর্থ। আমিও আমার মুখের রং ধুতে পারি নি। আমাকেও নিশ্চয়ই ভূতের মতোই লাগছে!
ঠিকই অনুমান করেছ। চেষ্টা করে লাভ নেই। চল আগে লোকালয়ে যাই। তখন একটা কিছু ব্যবস্থা হয়ে যাবে।
লোকালয়ের মানুষেরা আমাদের দেখে ভয় পেয়ে যাবে।
তোমার তাতে কোনো আপত্তি আছে?
না। কোনো আপত্তি নেই। রিদি উঠে দাঁড়াল। বলল, চল যাই। তুমি বিশ্বাস করবে কী না জানি না, আমার খিদে পেতে শুরু করেছে।
রুহান বলল, অবশ্যই বিশ্বাস করব। আমারও ভয়ঙ্কর খিদে পেয়েছে। লাল পাহাড়ে গিয়ে ভালো কিছু খেতে পাব তো?
পাব। নিশ্চয়ই পাব।
দুজন আবার ঝোপঝাড় ভেঙ্গে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নিচে নামতে থাকে।
রুহান এবং রিদি ভেবেছিল লাল পাহাড়ে পৌঁছানোর পর তাদের বিচিত্র পোশাক, রং মাখা মুখ এবং শরীরে ঝুলিয়ে রাখা নানা ধরনের অস্ত্র দেখে নিশ্চয়ই তাদের ঘিরে একটা ভিড় জমে যাবে, কিন্তু সেরকম কিছু হলো না। কিছুক্ষণের মধ্যেই তারা কারণটা বুঝে গেল। পুরো লাল পাহাড় এলাকাটাই আসলে বিচিত্র মানুষের এলাকা। অনেক মানুষই মুখে বিচিত্র রং লাগিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে, অনেকের পোশাক বিচিত্র, অনেকেই নানা ধরনের অস্ত্র নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। পুরো এলাকাটা একটা বড় মেলার মতো, নানা ধরনের আনন্দোৎসবের ব্যবস্থা রয়েছে। নানা ধরনের দোকানপাট ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। নানা ধরনের মানুষের ভিড়ে পুরো এলাকাটা গমগম করছে। এখানে নানা বয়সের নারী আর পুরুষ রয়েছে কিন্তু কোনো শিশু কিশোর নেই। দেখেই বোঝা যায় এই এলাকাটি ক্ষণস্থায়ী, মানুষ এখানে আসবে কিছু সময় কাটিয়ে চলে যাবে। কেউ এখানে পাকাপাকিভাবে থাকবে না।
