রিতুন ক্লিস মাথা নাড়লেন, বললেন, না ইবান। তুমি ভুল করো নি।
আপনি কি সত্যিই বলছেন, নাকি আমাকে সান্ত্বনা দেয়ার জন্যে বলছেন।
মহামান্য রিতুন হেসে মাথা নাড়লেন, আমি যখন একজন সত্যিকার মানুষ ছিলাম তখনো মিছিমিছি কাউকে সান্ত্বনা দিই নি এখন তো কোনো প্রশ্নই আসে না!
শুনে খুব শান্তি পেলাম। ম্যাঙ্গেল ক্বাসকে ফিরিয়ে নিয়ে আসার পর থেকে খুব অশান্তিতে ছিলাম, শুধু মনে হচ্ছিল কাজটা কি ঠিক করলাম? বিশেষ করে যখন মিত্তিকার কান্নার কথা মনে হচ্ছিল তখন নিজেকে খুব অপরাধী মনে হচ্ছিল।
সেটা খুবই স্বাভাবিক। মহামান্য রিতুন নরম গলায় বললেন, পুরোপুরি একশ ভাগ বিবেকহীন অপরাধী যখন হাইব্রিড মানুষ হয়ে একটা মহাকাশযান দখল করে ফেলে তখন সেটা খুব ভয়ের ব্যাপার হতে পারে। তুমি যে নিজেকে অপরাধী ভাবছ সেটা এমন কিছু অস্বাভাবিক নয়।
কিন্তু কিন্তু মিত্তিকা এত ভেঙে পড়ল কেন?
সম্ভবত সে কিছু একটা জানে যেটা তুমি জানো না। সে কিছু একটা অনুভব করতে পারছে যেটা তুমি অনুভব করতে পারছ না।
আমি চমকে উঠে বললাম, আপনি কী বলছেন মহামান্য রিতুন?
রিতুন ক্লিস একটা নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, আমি কিছুই বলছি না ইবান, আমি অনুমান করার চেষ্টা করছি।
আপনি কী অনুমান করেছেন?
মিত্তিকা অপূর্ব সুন্দরী একটি মেয়ে। ম্যাঙ্গেল ক্বাস নিঃসঙ্গ একজন পুরুষ মানুষের আদিম প্রবৃত্তি অনুমান করা তো কঠিন কিছু নয়।
আমি কয়েক মুহূর্ত কোনো কথা বলতে পারলাম না, হতবাক হয়ে রিতুন ক্লিসের দিকে তাকিয়ে রইলাম। শুকনো ঠোট জিব দিয়ে ভিজিয়ে বললাম, আপনি বলেছিলেন জীবনকে সহজভাবে নিতে। আমি নিজের জীবনকে সহজভাবে নিতে পারি কিন্তু মিত্তিকার জীবন?
রিতুন ক্লিস কিছু বললেন না। আমার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলেন। আমি কাতর গলায় বললাম, ম্যাঙ্গেল ক্বাসকে যদি ঐ ভয়ঙ্কর উপগ্রহটাকে ছেড়ে আসতাম তাহলে আমরা বেঁচে যেতাম! আমি নিজের হাতে এই দানবটাকে নিয়ে এসেছি
রিতুন ক্লিস মাথা নাড়লেন, বললেন, হ্যাঁ। এই দানবটাকে এখন তোমার নিজের হাতে খুন করতে হবে।
এটি কি একটি স্ববিরোধী কাজ হলো না? একজন মানুষকে বাঁচিয়ে এনেছি তাকে খুন করার জন্যে?
কোনো হিসেবে নিশ্চয়ই স্ববিরোধী। তুমি সেই হিসেবে যেও না ইবান।
আমি অসহায়ভাবে মাথা নেড়ে বললাম কিন্তু ম্যাঙ্গেল ক্বাসকে খুন করা যায় না মহামান্য রিতুন। তার শরীর থেকে গুলি ফিরে আসে।
আমি দুঃখিত ইবান, মানুষকে কীভাবে খুন করতে হয় সে-সম্পর্কে আমার বিন্দুমাত্র ধারণা নেই।
কিন্তু তাহলে কেমন করে হবে? আমি মাথা ঝাঁকিয়ে বললাম, আপনার আমাকে সাহায্য করতে হবে মহামান্য রিতুন। দোহাই আপনাকে–
আমি একটি হলোগ্রাফিক প্রতিচ্ছবি ইবান। আমার অস্তিত্ব একটি নিউরাল নেটওয়ার্কে।
কিন্তু আপনি নিজেই বলেছেন আপনি সত্যিকার রিতুন ক্লিস। আপনি সর্বকালের সবচেয়ে প্রতিভাবান মানুষ—
সেটি অতিরঞ্জন। সেটি ভালোবাসার কথা। আমি আসলে সাধারণ মানুষ।
কিন্তু আপনি যেটা জানেন সেটা নিশ্চিতভাবে জানেন, সেটা বিশ্বাস করেন। আপনি বলুন আমি কী করব?
রিতুন ক্লিস দীর্ঘ সময় চুপ করে থেকে বললেন, ম্যাঙ্গেল ক্বাসের সবচেয়ে বড় শক্তি হচ্ছে সে হাইব্রিড মানুষ। সেই শক্তিকে তার দুর্বলতায় পরিণত করে দাও।
কীভাবে করব সেটা।
আমি জানি না। সেটা আমি জানি না ইবান। সেটা তোমাকে ভেবে বের করতে হবে।
রিতুন ক্লিস চলে যাবার পরও আমি স্থির হয়ে একজায়গায় ভেসে রইলাম। আমি এখন কী করব? ম্যাঙ্গেল ক্বাসের। শক্তিকে কীভাবে আমি দুর্বলতায় পরিণত করব? আমি ঠাণ্ডামাথায় পুরো ব্যাপারটি ভাবতে চাইলাম এবং হঠাৎ করে আবিষ্কার করলাম আমার হাঁটার ইচ্ছে করছে, আমি যখন কোনো কিছু নিয়ে ভাবি তখন আমি একা-একা হাঁটি। এই ভরশূন্য পরিবেশে ভেসে থাকা যায় কিন্তু হাঁটা যায় না— আমি তাই ভেসে ভেসে মহাকাশে শরীর ঠিক রাখার জন্যে ছোট ব্যায়ামের ঘরটিতে গিয়ে হাজির হলাম। গোলাকার এই ঘরটিকে তার অক্ষের উপর ঘুরিয়ে এর ভেতরে কম বা বেশি মাধ্যাকর্ষণ তৈরি করা যায়। দীর্ঘ মহাকাশ অভিযানে যেতে হলে সবাইকে সময় করে নিয়মমাফিক এখানে প্রবেশ করতে হয়। আমি দেয়ালে সুইচটি স্পর্শ করতেই গোলাকার ঘরটি ঘুরতে শুরু করল এবং আমি কিছুক্ষণের মাঝেই ঘরের দেয়ালে পা দিয়ে দাঁড়ালাম। দুই হাত ছড়িয়ে শরীরে রক্ত চলাচল করিয়ে আমি এবারে হাঁটতে শুরু করি, হাঁটতে হাঁটতে পুরো ব্যাপারটি একেবারে গোড়া থেকে ভাবা দরকার।
ম্যাঙ্গেল ক্বাস একজন হাইব্রিড মানুষ যার অর্থ সে একই সাথে মানুষ এবং যন্ত্র। তার শরীরে কী ধরনের যান্ত্রিক ব্যাপার আছে আমি জানি না। কিন্তু তার মস্তিষ্কে একটা কপোট্রন বসানো আছে সে-ব্যাপারে আমি নিশ্চিত। তাই যখন। তার দেহের তাপমাত্রা শীতল করে তাকে ক্যাপসুলে ভরে রাখা হয়েছিল সে তার ভেতর থেকে বের হতে পেরেছিল। একজন সাধারণ মানুষ অচেতন হয়ে যায় ম্যাঙ্গেল জ্বাস কখনো অচেতন হয় না— তার কপোট্রন তখন তার শরীরের দায়িত্ব নিয়ে নেয়। সেই কপোট্রনটি কতটুকু বুদ্ধিমান? যেহেতু তার মাথার মাঝে বসানো আছে সেটি বাড়াবাড়ি কিছু হতে পারে না, নিশ্চয়ই কাজ চালানোর মতো একটি কপোট্রন। যদি কোনোভাবে ম্যাঙ্গেল ক্বাসকে অচেতন করে তার। কপোট্রনকে বের করে আনা যেত তাহলে কী বুদ্ধিমত্তার একটা প্রতিযোগিতা করা যেত না?
