মিত্তিকা হিস্টিরিয়াগ্রস্তের মতো আবার চিল্কার করতে থাকে, তাড়াতাড়ি ইবান, তাড়াতাড়ি—
ইঞ্জিন চালু করতে গিয়ে আমি আবার থেমে গেলাম, ম্যাঙ্গেল ক্বাসের চোখে মুখে অনুনয়, তার জীবন ভিক্ষা চাইছে অস্ত্র দিয়ে গুলি করেও প্রাণীটির আলিঙ্গন থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারছে না। একজন মানুষ একটি মহাজাগতিক প্রাণী থেকে নিজেকে রক্ষা করতে চাইছে আমি মানুষ হয়ে সেখানে কি আরেকজন মানুষকে ধ্বংস হতে দিতে পারি?
আমি সুইচ থেকে নিজের হাত সরিয়ে নিয়ে উঠে দাঁড়ালাম। মিত্তিকা চিকার করে বলল, কী হলো?
ম্যাঙ্গেল ক্বাসকে সাহায্য করতে হবে।
কী বললে? মিত্তিকা নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারল না, তুমি কী বললে?
বলেছি ম্যাঙ্গেল ক্বাসকে এই মহাজাগতিক প্রাণীর হাত থেকে বাঁচাতে হবে।
কেন? মিত্তিকা চিকার করে বলল, কেন?
কারণ, ম্যাঙ্গেলা জ্বাস একজন মানুষ। একজন মানুষ সবসময় অন্য মানুষকে রক্ষা করে।
করে না। কক্ষনো করে না— ম্যাঙ্গেল ক্বাস মানুষ নয়। দানব। আমাদের শেষ করে দেবে।
সম্ভবত। আমি শান্ত গলায় বললাম, কিন্তু আমি একজন মানুষ হয়ে আরেকজন মানুষকে এভাবে ফেলে চলে যেতে পারব না।
কী বলছ তুমি? কী বলছ? মিত্তিকা চিৎকার করে উঠল, তুমি কীরকম মানুষ?
আমি মাথা নেড়ে স্কাউটশিপের দরজার দিকে এগিয়ে গেলাম, নিচু গলায় বললাম, আমি দুঃখিত মিত্তিকা। তুমি একটু আগেই বলেছ আমি অন্যরকম মানুষ আমি একটু থেমে যোগ করলাম, মনে হয় আসলেই অন্যরকম। অন্যরকম নির্বোধ।
আমি হঠাৎ করে আমার মায়ের উপর একধরনের অভিমান অনুভব করলাম। বিচিত্র একধরনের অভিমান কেন আমার মা আমাকে এরকম একজন অর্থহীন ভালোমানুষ হিসেবে জন্ম দিয়েছিল?
৬. স্কাউটশিপের প্লাজমা ইঞ্জিন
স্কাউটশিপের প্লাজমা ইঞ্জিন দুটো গুমগুম শব্দ করছে, আমরা উপগ্রহটা ঘুরে এসে এইমাত্র সেখান থেকে ফোবিয়ানের দিকে রওনা দিয়েছি। স্কাউটশিপের যোগাযোগ মডিউল ঠিকভাবে ফোবিয়ানের সাথে যোগাযোগ করে স্বয়ংক্রিয় ফিডব্যাক চালু করেছে নিশ্চিত হওয়ার পর আমি চেয়ারে হেলান দিয়ে বসেছি। ঠিক এরকম সময়ে আমি অনুভব করলাম আমার গলায় শীতল একটা ধাতব জিনিস স্পর্শ করেছে, জিনিসটা কী বুঝতে আমার অসুবিধে হলো না। ম্যাঙ্গেল ক্বাসের স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রটি। আমার কাছে ব্যাপারটি খুব অস্বাভাবিক মনে হলো না, আমি এরকম কিছুর জন্যে অপেক্ষা করছিলাম।
ম্যাঙ্গেল ক্বাস শীতল গলায় বলল, আহাম্মক কোথাকার।
আমি কোনো কথা বললাম না। ম্যাঙ্গেল ক্বাস দাঁতে দাঁত ঘষে বলল, আমাকে যে দরজা খুলে স্কাউটশিপে ঢুকতে দিয়েছ সেটা প্রমাণ করে তুমি কত বড় আহাম্মক। কত বড় নির্বোধ।
আমি এবারও কোনো কথা বললাম না। ম্যাঙ্গেল ক্বাস এবারে যেন একটু ক্রুদ্ধ হয়ে উঠল, তার অস্ত্রটি দিয়ে আমার গলায় একটা খোঁচা দিয়ে বলল, আমি এই মুহূর্তে তোমার মাথায় গুলি করে ঘিলু বের করে দিতাম। কেন সেটা করছি না জানো?
আমি মাথা নাড়লাম, বললাম, না, জানি না।
কারণ তা হলে কন্ট্রোল প্যানেলটা তোমার মস্তিষ্কের টিস্যু আর রক্তে মাখামাখি হয়ে যাবে। বুঝেছ?
আমি মাথা নাড়লাম, বললাম, বুঝেছি।
আমি নির্বোধ মানুষ সহ্য করতে পারি না।
আমি এবারে হাত দিয়ে ম্যাঙ্গেল ক্বাসের উদ্যত অস্ত্রটা অবহেলার সাথে সরিয়ে বললাম, ম্যাঙ্গেল ক্বাস— তুমি খুব ভালো করে জান কেন তুমি আমাকে সহ্য করতে পার না। আমি নির্বোধ সে-কারণে নয়।
তাহলে কেন?
কারণ আমি তোমার প্রাণ রক্ষা করেছি। সেজন্যে। আমি এবারে ঘুরে তার চোখের দিকে তাকিয়ে বললাম, তুমি বুঝতে পারছ না কেন আমি তোমার প্রাণ রক্ষা করেছি। সেটা বুঝতে না পেরে তুমি ছটফট করছ।
আমি খুব ভালো করে বুঝতে পারছি আহাম্মক।
না, তোমার বোঝার ক্ষমতা নেই ম্যাঙ্গেল ক্বাস। তবে তোমার মানসিক শান্তির জন্যে আমি সেটা তোমাকে বলব।
ম্যাঙ্গেল ক্বাস সর চেখে আমার চোখের দিকে তাকাল। আমি বললাম, এই উপগ্রহের প্রাণীরা বুদ্ধিমান। যদি এরা বুদ্ধিমান না হতো তাহলে ছয়জন মৃত মানুষের মস্তিষ্ক থেকে সকল তথ্য বের করে নিয়ে এসে তাদেরকে জীবন্ত মানুষের মতো ব্যবহার করতে পারত না। আমি নিশ্চিত এই প্রাণীদের সাথে আবার আমাদের দেখা হবে, যোগাযোগ। হবে এমনকি বন্ধুত্ব হবে। আমি তাদের একটা ভুল ধারণা দিতে চাই নি।
কী ভুল ধারণা?
যে বিপদের সময় একজন মানুষ অন্য মানুষের পাশে এসে দাঁড়ায় না।
ম্যাঙ্গেল ক্বাস কোনো কথা না বলে আমার দিকে জ্বলন্ত চোখে তাকিয়ে রইল তারপর হিসহিস করে বলল, আমি তোমাকে শেষ করব। ইবান প্রত্যেকটা শব্দে আলাদা করে জোর দিয়ে বলল, সারাজীবনের জন্যে শেষ করব।
আমি মাথা ঘুরিয়ে নিয়ন্ত্রণ প্যানেলের দিকে তাকিয়ে বললাম, তাতে কিছু আসে যায় না ম্যাঙ্গেল জ্বাস। আমি তোমাকে আগেই বলেছি, তাতে কিছু আসে যায় না।
স্কাউটশিপটা ফোবিয়ানের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে মনিটরে ফোবিয়ান ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠছে। আমি অনেকটা অন্যমনস্কভাবে সেদিকে তাকিয়ে রইলাম এরকম সময় হঠাৎ করে কান্নার শব্দ শুনতে পেলাম। স্কাউটশিপে কেউ একজন কাঁদছে। পিছনে ঘুরে না তাকিয়েও আমি বুঝতে পারলাম সেটি মিত্তিকা। মিত্তিকা কেন কাঁদছে?
রিতুন ক্লিস আমার ঘরের মাঝামাঝি দাঁড়িয়ে আছেন তিনি একটি হলোগ্রাফিক প্রতিচ্ছবি তাই তিনি দাঁড়িয়ে থাকতে পারেন প্রয়োজন হলে বসেও থাকতে পারেন। ভরশূন্য পরিবেশে একজন সত্যিকারের মানুষ দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না বা বসে থাকতে পারে না। তাকে ভেসে থাকতে হয়। আমি ঘরের দেওয়াল স্পর্শ করে তার সামনে স্থির হয়ে থাকার চেষ্টা করছিলাম। রিতুন ক্লিস আমার দিকে তাকিয়ে একটু হাসলেন। আমি বললাম, মহামান্য রিতুন, আপনার কী মনে হয়? আমি কি ভুল করেছি?
