আমি গোলাকার ঘরের মাঝে আরো দ্রত হাঁটতে থাকি এবং আমার হাঁটার সাথে তাল মিলিয়ে ঘরটি আরো দ্রত ঘুরতে থাকে এবং মাধ্যাকর্ষণ শক্তিও বেড়ে যায় আমার মনে হতে থাকে আমার শরীর ভারী হয়ে আসছে। ম্যাঙ্গেল কাসকে অচেতন করতে হলে তাকে বিষাক্ত কোনো গ্যাস দিয়ে অচেতন করতে হবে কিংবা খাবারের মাঝে কোনো বিষাক্ত জিনিষ মিশিয়ে দিতে হবে। কিন্তু এগুলো তৃতীয় শ্রেণীর অপরাধীর কাজ আমি কেমন করে সেটা করব?
আমি আরো দ্রত হাঁটতে থাকি এবং অনুভব করতে থাকি আমার শরীরের ওজন আরো বেড়ে যাচ্ছে মাধ্যাকর্ষণ শক্তি নিশ্চয়ই অনেকগুণ বেড়ে গেছে। আমার হঠাৎ একধরনের ছেলেমানুষি ঝোক চাপল, আমি আমার শারীরিক ক্ষমতা পরীক্ষা করার জন্যে আরো দ্রত হাঁটতে থাকি এবং দেখতে দেখতে আমার শরীর সিসার মতো ভারী হয়ে আসে, আমার মাথা হালকা লাগতে থাকে এবং আমার মনে হয় আমি বুঝি অচেতন হয়ে পড়ব। আমি তবুও দাঁতে দাঁত চেপে নিজেকে টেনে নিতে থাকি আমার নিঃশ্বাস ভারী হয়ে আসে আমার সারা শরীর ঘামতে থাকে। আমি পাথরের মতো ভারী দুটি পাকে আরো দ্রত টেনে নিতে থাকি, ধাতব দেয়ালে পায়ের শব্দ প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরে আসতে থাকে আমার মনে হতে থাকে লাল একটা পর্দা বুঝি চোখের সামনে নেমে আসতে চাইছে, তবু আমি থামলাম না, আমি ছুটেই চললাম।
হঠাৎ করে কোথায় জানি কর্কশ স্বরে একটা এলার্ম ভেজে ওঠে এবং একটা লাল বাতি জ্বলতে-নিভতে শুরু করে। আমি সাথে সাথে ফোবিয়ানের কথা শুনতে পেলাম, মহামান্য ইবান, আপনি থামুন না হয় অচেতন হয়ে যাবেন।
আমি বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মতো চমকে উঠে বললাম, কী বললে তুমি ফোবি? কী বললে?
বলেছি আপনি এক্ষুনি যদি না থামেন তাহলে অচেতন হয়ে যাবেন, আপনার মস্তিষ্কে রক্তপ্রবাহ কমে আসছে।
অচেতন? তুমি বলছ অচেতন হয়ে যাব?
হ্যাঁ।
ফোবি আমি দেখতে চাই আমি অচেতন না হয়ে কতদূর যেতে পারি—
কেন মহামান্য ইবান?
কারণ আছে, একটা কারণ আছে।
কী কারণ?
সময় হলেই তোমাকে বলব। এখন আমাকে আরো বেশি মাধ্যাকর্ষণে নিয়ে চলো–আরো বেশি–
ব্যাপারটি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে যাচ্ছে। আপনি যে ভয়ঙ্কর মাধ্যাকর্ষণ শক্তিতে দাঁড়িয়ে আছেন, বেশিরভাগ মানুষ এখানে দাঁড়িয়ে থাকতে পারবে না। তার অনেক আগেই অচেতন হয়ে পড়বে।
আমি হিংস্রভাবে একটু হেসে বললাম, আমি সেটাই চাই ফোবি, সব মানুষ যে মাধ্যাকর্ষণ বলে অচেতন হয়ে পড়বে আমি সেখানে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে চাই।
আমি বুঝতে পারছি না মহামান্য ইবান।
তোমার বোঝার দরকার নেই। তুমি মূল তথ্যকেন্দ্র থেকে সব তথ্য নিয়ে এসে আমাকে সাহায্য করো ভয়ঙ্কর মাধ্যাকর্ষণ শক্তির মাঝে আমাকে স্থির থাকার শক্তি এনে দাও। মানুষের শরীরের যেটুকু শক্তি থাকতে পারে, যেটুকু সহ্য করার ক্ষমতা থাকতে পারে তার পুরোটুকু আমার মাঝে এনে দাও। আমাকে পাথরের মতো শক্ত করে দাও।
সেজন্যে সময়ের প্রয়োজন মহামান্য ইবান। রাতারাতি মানুষকে অতি-মানবে রূপান্তর করা যায় না।
আমার কতটুকু সময় আছে আমি জানি না, কিন্তু আমি জানি নষ্ট করার জন্যে এক মাইক্রোসেকেন্ডও নেই।
ফোবি খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, বেশ।
আমি মুখ হা করে বড় বড় নিঃশ্বাস নিয়ে গোলাকার ঘরটিতে নিজেকে টেনে নিতে থাকি আমাকে যেভাবেই হোক জ্ঞান না হারিয়ে থাকতে হবে। মানুষের পক্ষে যেটা অসম্ভব আমাকে সেই অসম্ভব শক্তি অর্জন করতে হবে। মিত্তিকাকে বাঁচানোর এছাড়া আর কোনো উপায় নেই।
ঘুম থেকে উঠে আমি মিত্তিকাকে খুঁজে বের করলাম। মহাকাশযানের এক নির্জন কোনায় গোল জানালার পাশে শুয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে। বাইরে অসংখ্য নক্ষত্র কালো মহাকাশের মাঝে জ্বলজ্বল করে জ্বলছে। মহাকাশযানটি নিউট্রন স্টারের কাছাকাছি চলে আসছে, আমরা বুঝতে পারছি না কিন্তু মহাকাশযানটির গতিবেগ দ্রত বেড়ে যাচ্ছে। নিউট্রন স্টারটি এত ছোট যে এটিকে দেখা যাচ্ছে না। দূরে একটি নেবুলা তার সমস্ত বিচিত্র রূপ নিয়ে ফুটে আছে। আমি মিত্তিকার পাশে গিয়ে নরম গলায় ডাকলাম, মিত্তিকা।
সে ঘুরে আমার দিকে তাকাল, কিছু বলল না।
আমি হাসার চেষ্টা করে বললাম, তুমি আমার উপর খুব রেগে আছ তাই না?
মিত্তিকা এবারেও কোনো কথা বলল না। আমি অপরাধীর মতো বললাম, তোমার সাথে আমি একটু কথা বলতে চাইছিলাম মিত্তিকা।
মিত্তিকা বড় বড় চোখে আমার দিকে তাকিয়ে অদ্ভুতভাবে একটু হেসে বলল, তোমার মতো একজন মহাপুরষ আমার মতো তুচ্ছ একজন মানুষের সাথে কথা বলবে?
আমি একটু হতচকিত হয়ে বললাম, তুমি কী বলছ মিত্তিকা?
আমি ঠিকই বলছি। তুমি অন্য ধরনের মানুষ— তুমি দশজন সাধারণ মানুষের মতো নও বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের বড় বড় জিনিস নিয়ে তোমাকে ভাবতে হয়। মহাজাগতিক প্রাণীরা যেন মানুষকে ভুল না ভাবে সেজন্যে আমার মতো তুচ্ছ একজন মানুষকে তুমি আবর্জনার মতো জঞ্জালের মতো ফেলে দাও।
কী বলছ তুমি মিত্তিকা?
মিত্তিকা গলার স্বরে শ্লেষ ফুটিয়ে এনে বলল, আমি ভুল বলেছি? নিশ্চয়ই ভুল বলেছি। আমি তুচ্ছ সাধারণ অশিক্ষিত মূখ একজন মেয়ে, আমি কি এই মহাজগতের বড় বড় জিনিস বুঝতে পারি? পারি না–
মিত্তিকা–
মিত্তিকা মুখ ফিরিয়ে বলল, আমাকে একা থাকতে দাও ইবান। দোহাই তোমার—
কিন্তু মিত্তিকা তোমার সাথে আমার কথা বলতেই হবে।
না ইবান। মিত্তিকা মাথা নেড়ে বলল, আমার সাথে তোমার কথা বলার কিছু নেই ইবান। আমাকে একা থাকতে দাও। দোহাই তোমার।
