প্রথমে মিত্তিকা এবং তার পিছু পিছু আমি ভিতরে ঢুকলাম এবং প্রায় সাথে সাথে ঘরঘর শব্দ করে দরজাটা বন্ধ হয়ে গেল। মিত্তিকা স্কাউটশিপের দেওয়ালে পিঠ লাগিয়ে জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিতে নিতে বলল, আমরা বেঁচে গেছি? বেঁচে গেছি ইবান?
সেটা এখনো জানি না, তবে মনে হচ্ছে বিপদের ঝুঁকি অনেকটা কমেছে। আমি নরম গলায় বললাম, নিরাপদে মহাকাশযান ফোবিয়ানে ফিরে যাবার সম্ভাবনা এখন শতকরা নব্বই ভাগ।
আমরা স্কাউটশিপের কোয়ারেন্টাইন কক্ষে দাঁড়িয়ে রইলাম, স্কাউটশিপের স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রপাতি আমাদের স্পেসস্যুট থেকে সকল রকম জৈব-অজৈব পদার্থ পরিষ্কার করতে শুরু করেছে। আমাদের ঘিরে নানারকম রাসায়নিক তরল ঘুরতে থাকে, শক্তিশালী আলট্রা ভায়োলেট রশ্মি এসে আঘাত করে সকল বাতাস শুষে নেয়া হয়। মিত্তিকা অধৈর্য হয়ে বলল, এটা কখন শেষ হবে? কখন আমরা স্কাউটশিপ চালু করব?
এই তো এক্ষুনি।
এত দেরি হচ্ছে কেন?
কিছু করার নেই মিত্তিকা, যতক্ষণ পর্যন্ত আমাদের পুরোপুরি পরিস্কার করা না হচ্ছে আমাদের এখান থেকে ভেতরে ঢুকতে দেয়া হবে না। অজানা কোনো জীবনের চিহ্ন, কোনো ভাইরাস কোনো জীবাণু নিয়ে আমরা ফোবিয়ানে। ফিরে যেতে পারব না।
কেন?
আমাদের নিরাপত্তার জন্যেই।
মিত্তিকা অধৈর্য হয়ে দাঁড়িয়ে ছটফট করতে লাগল। আমিও ভেতরে ভেতরে অস্থির হয়ে গেছি কিন্তু বাইরে সেটা প্রকাশ করলাম না, মহাকাশযানের অধিনায়কদের নিজেদের অনুভূতি এত সহজে প্রকাশ করার কথা নয়।
একসময় কোয়ারেন্টাইন ঘরে নিরাপত্তার সবুজ আলো জ্বলে উঠল। আমি আর মিত্তিকা বায়ু নিরোধক দরজা দিয়ে স্কাউটশিপের ভিতরে ঢুকলাম। আমরা দ্রত আমাদের স্পেস স্যুট খুলে নিতে শুরু করি, যদিও নতুন এই পোশাকগুলি পুরোপুরি বায়ু নিরোধক হয়েও আশ্চর্য রকম পেলব কিন্তু তারপরেও দীর্ঘ সময় একটি বায়ু নিরোধক পরিবেশের ভেতরে থেকে যন্ত্রপাতি দিয়ে কথা বলার ব্যাপারটি স্নায়ুর উপরে একধরনের চাপের সৃষ্টি করে। স্পেস স্যুট ভল্টের মাঝে ঢুকিয়ে, অস্ত্রগুলো খুলে নিরাপদ জায়গায় রেখে আমরা স্কাউটশিপের নিয়ন্ত্রণ প্যানেলের কাছে এসে দাঁড়ালাম। মিত্তিকা আমার কাছে এসে আমার হাত স্পর্শ করে বলল, ইবান–
কী হলো?
আমার প্রাণ রক্ষা করার জন্যে তোমাকে অনেক ধন্যবাদ।
তোমার প্রাণ তো আলাদাভাবে রক্ষা করি নি। আমি আমাদের প্রাণ রক্ষা করেছি।
কিন্তু তুমি তো আমাকে নিয়ে বের হয়ে এসেছ, তুমি তো ইচ্ছে করলে জেট প্যাক ব্যবহার করে একা বের হয়ে আসতে পারতে।
আমি অবাক হয়ে মিত্তিকার দিকে তাকিয়ে রইলাম, বললাম, আমি একা কেন বের হয়ে আসব?
মিত্তিকা আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, সেটাই নিয়ম। সবাই নিজের জন্যে বেঁচে থাকে। আমি সেটাই শিখেছি। সেটাই শেখানো হয়েছে।
সেটা নিয়ম না, মিত্তিকা। আমি সেটা শিখি নি।
মিত্তিকা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, তুমি অন্যরকম। তোমার জিনেটিক প্রোফাইল অন্যরকম। আমি লক্ষ করছি।
আমি কিছু না বলে নিয়ন্ত্রণ প্যানেলে স্কাউটশিপের ইঞ্জিনের অবস্থা লক্ষ করে সেটা চালু করার প্রাথমিক ব্যবস্থাগুলো শেষ করতে থাকি। মিত্তিকা আমার পাশে দাঁড়িয়ে একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, এর মাঝে সবচেয়ে ভালো
কী হয়েছে জানো?
আমি মাথা নাড়লাম, বললাম, জানি। ম্যাঙ্গেল ক্বাস দূর হয়েছে।
হ্যাঁ। আমি জানি না তাকে আর কোনোভাবে দূর করা যেত কি না–
মনে হয় এত সহজে যেত না। একজন খুব খারাপ মানুষকে শুধুমাত্র অন্য একজন খুব খারাপ মানুষ শায়েস্তা করতে পারে।
মিত্তিকা খুব সুন্দর করে হেসে বলল, তুমি খারাপ মানুষ নও। তুমি খুব চমৎকার একজন মানুষ। কাজেই তুমি ওর কিছু করতে পারতে না।
আমি হেসে বললাম, তুমি আমার সম্পর্কে কিছু জানো না, তুমি আমাকে দেখেছ মাত্র অল্প কয়েকদিন।
সেটাই যথেষ্ট। আমি অনেক মানুষকে দেখেছি, তুমি অন্যরকম। তোমার ভিতরে কিছু একটা আছে যেটা অন্যের ভেতরে নেই।
আমি সুইচ স্পর্শ করে মূল ইঞ্জিনে জ্বালানির প্রবাহ সৃষ্টি করে তাকিয়ে রইলাম, আর কিছুক্ষণের মাঝেই আমরা এই অশুভ গ্রহটাকে ছেড়ে চলে যেতে পারব। মিত্তিকা আরো একটু এগিয়ে এসে বলল, ম্যাঙ্গেল ক্বাসকে ওরা কী করছে বলে তোমার মনে হয়?
আমি মাথা নাড়লাম, বললাম, বলা কঠিন। তবে আমাদের চাইতে সে অনেক বেশি বিচিত্র। ভয়ঙ্কর মানুষ ছিল। ম্যাঙ্গেল ক্বাস। মস্তিষ্কে আরো একটা কপোট্রন বসিয়ে রেখেছে হাইব্রিড মানুষ। যখন তার মানুষের অংশটাকে কাবু। করে ফেলা হয়— তার যন্ত্রের অংশটা দায়িত্ব নিয়ে নেয়।
কী ভয়ানক!
আর চিন্তা নেই। যন্ত্রণা দূর হয়েছে। আমি কন্ট্রোল প্যানেল দেখে মিত্তিকাকে বললাম, ইঞ্জিন চালু করার সময় হয়েছে। মিত্তিকা তুমি নিরাপত্তা বেল্ট লাগিয়ে গিয়ে বসো।
মিত্তিকা তার বসার আসনের দিকে রওনা দিয়ে হঠাৎ একটা আর্তচিৎকার করে উঠল। আমি চমকে উঠে ঘুরে। তাকালাম এবং হঠাৎ করে আমার হৃৎস্পন্দন থেমে গেল। স্কাউটশিপের জানালায় ম্যাঙ্গেল ক্বাস দাঁড়িয়ে আছে সে ফিরে এসেছে!
মিত্তিকা চিৎকার করে বলল, ইবান! ইঞ্জিন চালু কর— এক্ষুনি।
আমি নিয়ন্ত্রণ প্যানেলের উপর ঝুঁকে পড়লাম— ম্যাঙ্গেল ক্বাস স্কাউটশিপের ভিতরে ঢুকতে পারবে না তার হাতের অস্ত্র দিয়েও সহজে আমাদের কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। আমি সুইচ স্পর্শ করতে গিয়ে থেমে গেলাম, ম্যাঙ্গেল ক্বাসকে কুৎসিত সাপের মতো কিছু একটা জড়িয়ে ধরেছে, সে প্রাণপণে সেই কিলবিলে জিনিসটি থেকে মুক্ত হওয়ার চেষ্টা করছে। তার মুখে আতঙ্ক, সে চিৎকার করছে।
