কী?
তুমি আমার খুব কাছে এসে দাঁড়াও।
কেন?
এখন বলতে পারব না প্রস্তুত হয়ে থাকো।
কীসের জন্যে প্রস্তুত হয়ে থাকব?
জানি না।
আমি সাবধানে অস্ত্রটা হাতে নিয়ে চোখের কোনা দিয়ে চারপাশে তাকালাম, মানুষগুলো খুব নিঃশব্দ আমাদের ঘিরে ফেলে চারপাশ থেকে এগিয়ে আসছে এবং হঠাৎ আমার মনে হলো, এই প্রথম ম্যঙ্গেল ক্বাস একটু ভয় পেয়েছে। ভয়টা লুকানোর জন্যে সে চিল্কার করে বলল, দাঁড়াও সাবাই যে যেখানে আছ দাঁড়াও।
কেউ দাঁড়াল না, বরং আরো এক পা এগিয়ে এল, ম্যাঙ্গেল ক্বাস হিংস্র স্বরে চিৎকার করে তার স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের ট্রিগার টেনে ধরল। প্রচণ্ড শব্দে একঝাঁক গুলি বের হয়ে সামনে দাঁড়ানো মানুষগুলোকে ঝাঝরা করে ফেলল, কিন্তু একজন মানুষও থমকে দাঁড়াল না, কারো মুখে যন্ত্রণার একটু চিহ্নও ফুটে উঠল না। ইরি হঠাৎ করে অপ্রকৃতস্থের মতো হেসে উঠল।
ম্যাঙ্গেল ক্বাস এই প্রথম আতঙ্কিত হয়ে উঠল, সে ফ্যাকাসে মুখে একবার আমার দিকে তাকাল তারপর আবার ঘুরে মানুষগুলোর দিকে তাকিয়ে আবার হিংস্রভাবে গুলি করতে লাগল।
আমি দেখতে পেলাম মানুষগুলোর শরীর ছিন্নভিন্ন হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু সেখান থেকে কোনো রক্ত বের হচ্ছে না। আমি তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে সবিস্ময়ে দেখতে পেলাম শরীরের ভেতর থেকে কিলবিলে কালচে রংয়ের কোনো একটা জীবন্ত প্রাণী বের হয়ে আসছে। বিভিন্ন ক্ষতস্থান থেকে অক্টোপাসের পায়ের মতো আঠালো কিলবিলে কিছু একটা বের হয়ে আসছে, আবার ভিতরে ঢুকে যাচ্ছে। ঘরের ভেতরে জান্তব চাপা একধরনের হিসহিস শব্দ শোনা যেতে থাকে।
মিত্তিকা আতংকে চিৎকার করে আমাকে আঁকড়ে ধরল, আমি একহাত দিয়ে তাকে শক্ত করে ধরে রেখে বললাম, আমাকে ধরে রেখ।
আমি অন্য হাত দিয়ে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রটা উপরের দিকে তাক করলাম, এটিকে এটমিক ব্লাস্টার হিসেবে ব্যবহার করলে মহাকাশযানের ছাদটুকু উড়িয়ে দিয়ে যাবার কথা। আমি নিঃশ্বাস আটকে রেখে ট্রিগার টেনে ধরতেই প্রচণ্ড বিস্ফোরণ এবং আগুনের হলকায় ঘরটি কেঁপে উঠল, মহাকাশযানের ছাদের একটা বড় অংশ উড়ে ফাঁকা হয়ে গেছে সেই ফাঁকা অংশ দিয়ে বিচিত্র উপগ্রহের কুৎসিত আকাশ দেখা যাচ্ছে।
আমি একহাতে অস্ত্রটাকে ধরে রেখে অন্য হাতে জেট প্যাকটার সুইচ স্পর্শ করলাম সাথে সাথে জেট প্যাকের ক্ষুদ্র ইঞ্জিন দুটো গর্জন করে উঠল। জেট প্যাক একজন মানুষকে নিয়ে উড়ে যেতে পারে, দুজনকে নিয়ে উড়তে পারবে। কি না আমি পুরোপুরি নিঃসন্দেহ নই কিন্তু এখন সেটা নিয়ে চিন্তা করায় সময় নেই। মিত্তিকা নিজে থেকে তার জেট প্যাক চালাতে পারবে না— সে আগে কখনো ব্যবহার করে নি, আমি জেট প্যাকের ইঞ্জিনের উপর পুরোপুরি নির্ভর না করে সেটাকে একটা শক্তিশালী ধাক্কা দেবার জন্যে প্রাণপণে লাফিয়ে উঠলাম। ঠিক সময়ে জেট প্যাকের ইঞ্জিন কান ফাটানো শব্দে গর্জন করে উঠল এবং আমরা দুজন মুহুর্তের মাঝে বিধ্বস্ত মহাকাশযানের বিস্ফোরণে উড়ে যাওয়া ছাদ। দিয়ে বের হয়ে এলাম। আমার মনে হলো শেষ মুহূর্তে নিচের মানুষগুলো ছুটে এসে আমাদের ধরার চেষ্টা করেছিল কিন্তু আমরা ততক্ষণে তাদের নাগালের বাইরে চলে এসেছি। আমি নিচে গোলাগুলির শব্দ শুনতে পেলাম, একধরনের হুটোপুটি হচ্ছে বলে মনে হলো। কিন্তু ততক্ষণে আমরা অনেক দূর চলে এসেছি।
আমি মিত্তিকাকে এক হাতে কোনোভাবে ধরে রেখে বললাম, আমাকে শক্ত করে ধরে রেখো মিত্তিকা।
মিত্তিকা আমাকে ধরে রেখে কাপা গলায় বলল, আমার এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না আমরা বের হয়ে আসতে পেরেছি।
এখনই এত নিশ্চিত হয়ো না মিত্তিকা–
কেন নয়?
এই প্রাণীগুলি এত সহজে আমাদের ছেড়ে দেবে না।
মিত্তিকা ভয়-পাওয়া-গলায় বলল, কেন? একথা বলছ কেন?
প্রাণীগুলি এতদিন শুধু মৃত মানুষদের দেখেছে এই প্রথমবার তারা জীবিত মানুষ দেখছে। বুদ্ধিমান প্রাণী হলে কৌতূহল হবার কথা।
সর্বনাশ!
হ্যাঁ, প্রস্তুত থেকো। অস্ত্রটা হাতে রেখো–
কিন্তু আমি বলেছি আমি গুলি করতে পারি না। কীভাবে করতে হয় আমি জানি না—
তোমার জানতে হবে না। যখন সময় হবে তুমি জানবে।
কেমন করে জানব?
বেঁচে থাকার আদিম প্রবৃত্তি থেকে।
আমি আর মিত্তিকা মাটি থেকে শ-খানেক মিটার উপর দিয়ে উড়ে যেতে লাগলাম, চারপাশে সবুজাভ একধরনের কুয়াশা এবং ধুলো, আমি টের পেলাম আমার শরীরে বৈদ্যুতিক চার্জ জমা হতে শুরু করেছে। আমরা তার মাঝে উড়ে যেতে লাগলাম। মিত্তিকা আমাকে শক্ত করে ধরে রেখেছে, আমি টের পাচ্ছি সে এখনো থরথর করে কাঁপছে।
কিছুক্ষণের মাঝে আমি স্কাউটশিপটা দেখতে পেলাম— অস্থিতিশীল গ্রহটির আবছা আলোতে সেটিকে একটি প্রাগৈতিহাসিক প্রাণীর মতো লাগছিল। আমি স্কাউটশিপের সাথে যোগাযোগ করে একটা নিঃশ্বাস ফেলে বললাম, আমরা কাছাকাছি এসে গেছি মিত্তিকা। নামার জন্যে প্রস্তুত হও।
আমি প্রস্তুত আছি।
আমি জেট প্যাকের সুইচ স্পর্শ করে ইঞ্জিন দুটো নিয়ন্ত্রণ করে সাবধানে নিচে নেমে এলাম। হাতে অস্ত্রটি ধরে রেখে আমি দ্রত চারপাশে একবার তাকিয়ে নিই, কোথাও কিছু নেই। মিত্তিকা আমাকে শক্ত করে ধরে রেখেছে আমি শুনতে পেলাম তার স্পেস স্যুটের ভিতরে সে জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিচ্ছে।
আমরা স্কাউটশিপের দরজার কাছে এসে দাঁড়াতেই ঘরঘর শব্দ করে দরজাটা খুলে গেল। আমি মিত্তিকাকে সামনে এগিয়ে দিয়ে বললাম, যাও ভেতরে ঢোকো।
