ঈশিতা এই প্রথমবার মুখ খুলল। বব লাস্কির দিকে তাকিয়ে বলল, সত্যিই যদি আমি বেআইনি কাজ করে থাকি, আমাকে পুলিশে দাও। আরও ভালো হয়, যদি পুলিশকে এখানে ডেকে নিয়ে এস।
বব লাস্কি বলল, তুমি খুব ভালো করে জানো, আমরা তোমাকে পুলিশে দেব না। তোমাদের দেশের আইন-কানুনের ওপর ভরসা করে আমরা এখানে এত বড় একটা প্রতিষ্ঠান শুরু করিনি। যেটুকু আইনের সাহায্য দরকার, সেটুকু আমরা ডলার দিয়ে কিনে নিয়েছি, ক্যাশ ডলার।
ঈশিতা জোর করে মুখে হাসি ফুটিয়ে বলল, আমাকে এই তথ্যটুকু দেওয়ার জন্য তোমাকে ধন্যবাদ, মিস্টার লাস্কি।
তোমাকে এই তথ্যটা দিচ্ছি, কারণ এটা কোনো দিন তোমার ভেতর থেকে বের হবে না।
ঈশিতার বুক কেঁপে উঠল, মুখে সেটা সে প্রকাশ হতে দিল না। জিজ্ঞেস করল, কেন বের হবে না?
কারণ, তুমি বলে এই পৃথিবীতে কারও অস্তিত্ব থাকবে না।
তুমি আমাকে মেরে ফেলার হুমকি দিচ্ছ?
বব লাস্কি বলল, হুমকি নয়, আমি তোমাকে জানাচ্ছি।
ঈশিতা টেবিলের দুই দিকে বসে থাকা মানুষগুলোর দিকে তাকিয়ে বলল, তোমরা নিশ্চয়ই অনেক বড় বিজ্ঞানী কিংবা ইঞ্জিনিয়ার কিংবা ম্যাথমেটিশিয়ান। পৃথিবীর সেরা সেরা জার্নালে নিশ্চয়ই তোমাদের গবেষণা পেপার ছাপা হয়েছে। অথচ তোমরা চুপচাপ বসে দেখছ, এই মানুষটি আমাকে খুন করে ফেলার কথা বলছে। তোমাদের কারও ভেতর এটা নিয়ে কোনো প্রতিক্রিয়া নেই?
নীল চোখের মানুষটি শব্দ করে হেসে উঠে বলল, মেয়ে, তুমি ব্যাপারটাকে কেন ড্রামাটিক করার চেষ্টা করছ, কোনো লাভ নেই। হিরোশিমার ওপর যখন এনোলা গে থেকে পৃথিবীর প্রথম নিউক্লিয়ার বোমা ফেলা হয়েছিল, তখন সেই পাইলটদের হাত একটুও কাঁপেনি। তারা এক মুহূর্তে এক লাখ লোক মেরেছিল, কিন্তু তাদের কারও মনে হয়নি, তারা হত্যাকারী। বিশ্বযুদ্ধ শেষ করার জন্য সেই হত্যাকাণ্ডের দরকার ছিল। এখানেও তা-ই।
ঈশিতা অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে বলল, এখানেও তা-ই?
হ্যাঁ। পৃথিবীর সভ্যতা আর কম্পিউটার এখন সমার্থক। মাইক্রোপ্রসেসরের ক্ষমতা বাড়তে বাড়তে এক জায়গায় থেমে যাচ্ছে, কোয়ান্টাম মেকানিকস বলছে, আর ক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব নয়। অথচ আমাদের মানুষের মস্তিষ্ক এসব কম্পিউটার থেকে হাজার-লক্ষ গুণ শক্তিশালী। আমরা সেটাকে যন্ত্রপাতির সঙ্গে জুড়ে দিতে শিখিনি। যখন জুড়ে দিতে পারব, তখন পৃথিবী থেকে কনভেনশনাল কম্পিউটার উঠে যাবে। এই কম্পিউটারের তুলনায় সেটা হয়ে যাবে একটা খেলনা।
বব লাস্কি বলল, জর্জ, তুমি যেন শুধু শুধু এই মেয়েটার সঙ্গে এসব বিষয় নিয়ে কথা বলে সময় নষ্ট করছ।
জর্জ নামের নীল চোখের মানুষটি বলল, সময় নষ্ট করছি, কারণ এই মেয়ে আমাদের সততা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। আমি তাকে বোঝানোর চেষ্টা করছি, মানুষের ভবিষ্যৎ সভ্যতার জন্য যে গবেষণার দরকার, আমরা সেই গবেষণা করছি। পৃথিবীর মানুষ সেই গবেষণার কথা শুনতে এখনো প্রস্তুত হয়নি, সে জন্য আমরা থেমে থাকব না।
জর্জ আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু ল্যাপটপ হাতে মানুষটি একটা আর্তচিৎকারের মতো শব্দ করল। বব লাস্কি বলল, কী হয়েছে?
মানুষটা ভাঙা গলায় বলল, আমি এটা বিশ্বাস করি না।
তুমি কী বিশ্বাস করো না?
এখানে যেটা ঘটেছে।
এখানে কী ঘটেছে?
গতকাল সকাল নয়টা তিরিশ মিনিটে কেউ আমাদের সিস্টেমে ঢুকেছে। ডেটাবেস থেকে এনক্রিপটেড পাসওয়ার্ড ডাউনলোড করেছে নয়টা সাতান্ন মিনিটে। দশটা বিয়াল্লিশ মিনিটে পাসওয়ার্ডকে ডিক্রিস্ট করে সিস্টেম ব্রেক করেছে।
টেবিলের চারপাশের সব মানুষ পাথরের মূর্তির মতো স্থির হয়ে গেল। মনে হলো, ঘরের মধ্যে একটা বজ্রপাত হয়েছে। বব লাস্কি অনেক কষ্ট করে বলল, কী, কী বললে? আমাদের এনক্রিপশান ডিকোড করেছে?
হ্যাঁ।
আ-আ-আমাদের এনক্রিপশন?
হ্যাঁ।
এক ঘণ্টার কম সময়ে?
হ্যাঁ।
কোন পদ্ধতিতে? কোন কম্পিউটার ব্যবহার করেছে?
ল্যাপটপের মানুষটি দীর্ঘশ্বাসের মতো একটা শব্দ করল। তারপর বলল, কোনো পদ্ধতি নয়, সরাসরি। কোনো একজন মানুষ কি-বোর্ডে একটা একটা সংখ্যা টাইপ করেছে।
বব লাস্কি এখনো ব্যাপারটা বিশ্বাস করতে পারল না। বলল, কোনো একজন মানুষ? এক ঘণ্টার ভেতর আমাদের এনক্রিপশন ভেঙেছে?
হ্যাঁ।
আমরা হাফ বিলিয়ন ডলার দিয়ে যেটা তৈরি করিয়েছি? যেটা সারা পৃথিবীতে ব্যবহার করে?
হ্যাঁ। কোনো একজন মানুষ সেটা ভেঙেছে।
বব লাস্কি একবার ঈশিতার দিকে তাকাল, তারপর টেবিলের চারপাশে বসে থাকা মানুষগুলোকে বলল, আমরা যে নিউরাল কম্পিউটার তৈরি করার চেষ্টা করছি, তার থেকে লক্ষ-কোটি গুণ ক্ষমতার মানুষ আছে?
ল্যাপটপের সামনে বসে থাকা মানুষটি বলল, একবার সিস্টেমে ঢোকার পর তারা এই মেয়েটির পুরো তথ্য ডেটাবেসে ঢুকিয়ে দিয়েছে।
আঙুলের ছাপ আর রেটিনা স্ক্যানিং?
ওভার রাইট করে দিয়েছে।
তার মানে?
তার মানে, আমাদের এনডেভার এখন কারও আঙুলের ছাপ আর রেটিনা চেক করে না। সবাইকেই ঢুকতে দিচ্ছে!
বব লাস্কি নিজের মাথা চেপে ধরে বলল, ও মাই গড!
ল্যাপটপের সামনে বসে থাকা মানুষটি বলল, আমাদের এনডেভার আর একটা ফাস্টফুডের দোকানের সিকিউরিটি এখন একই সমান!
বব লাস্কি তার মাথা চাপড়ে দ্বিতীয়বার বলল, ও মাই গড!
নীল চোখের সুদর্শন মানুষটি বলল, বব, তোমার এত বিচলিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। বলতে পার, আমরা পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ একটা সুযোগ পেয়েছি।
