দাড়ি-গোঁফের জঙ্গল মানুষটি হাত নাড়িয়ে বলল, আমরা ওসব নিয়ে কথা না বললাম।
ঈশিতা বলল, হ্যাঁ, কথা না বললাম। সে দরজার দিকে এগোতে এগোতে থেমে গিয়ে বলল, তোমাদের যদি আমার কাছে কোনো প্রশ্ন থাকে আমার সঙ্গে যোগাযোগ কোরো। আমি সিস্টেমে আছি।
দাড়ি-গোঁফওয়ালা মানুষটি বলল, এক সেকেন্ড রাইসা, আমি একটু দেখে নিই। তুমি কিছু মনে কোরো না, এই ঘরে তোমার উপস্থিতি আমাদের জন্য খুব বড় একটা বিস্ময়ের ব্যাপার।
ঈশিতা সহৃদয়ভাবে হাসল। বলল, আমি কিছু মনে করব না। তুমি সিস্টেমে আমার প্রোফাইল দেখে নিশ্চিত হয়ে নাও যে আমি তোমাদের একজন। আমি পুলিশ বাহিনীর একজন সিক্রেট এজেন্ট না।
মানুষটা কম্পিউটারের স্ক্রিনে ঈশিতার ছবি, নাম-পরিচয় বের করে এনে একনজর দেখে মাথা নাড়ল। বলল, থ্যাংকু রাইসা। তুমি তোমার কাজ করো।
ঈশিতা ঘর থেকে বের হয়ে বড় একটা নিঃশ্বাস ফেলল। তার ক্যামেরায় যেটুকু তথ্য আছে, সেটা এদের ধরিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। ছেলেটির ছবি থেকে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে ওই মানুষগুলোর ভিডিও। ঘরের ভেতর যথেষ্ট আলো ছিল, ভিডিওটা খারাপ হওয়ার কথা নয়। যন্ত্রপাতির একটা শব্দ থাকলেও কথাবার্তা ভালোভাবে রেকর্ড হয়ে যাওয়ার কথা। এখন তাকে এখান থেকে বের হয়ে যেতে হবে। সিড়ি দিয়ে নেমে করিডর ধরে ডান দিকে।
ঈশিতা দ্রুত হাঁটতে থাকে। সিঁড়ি দিয়ে নেমে সে করিডর ধরে হেঁটে দরজার কাছে পৌঁছায়। ঢোকার সময় আঙুলের ছাপ, চোখের রেটিনা স্ক্যান করে ঢুকতে হয়েছিল। বের হওয়া খুব সহজ, দরজার নব ঘোরালেই দরজা খুলে যাবে। ঈশিতা নব ঘুরিয়ে দরজাটা খুলতেই চমকে উঠল। দরজার অন্য পাশে বব লাস্কি দাঁড়িয়ে আছে।
ঈশিতা বব লাস্কিকে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে যাচ্ছিল। বব লাস্কি তাকে থামাল, এই যে তুমি, শোনো।
ঈশিতা দাঁড়াল। বব লাস্কি বলল, তুমি কে?
আমি রাইসা সুলতানা। একজন নতুন এমপ্লয়ি।
সেটা অবশ্যি দেখতে পাচ্ছি। এনডেভার থেকে বের হতে চাইলে আগে সেখানে ঢুকতে হয়। আমাদের সিকিউরিটি সিস্টেম এমপ্লয়ি ছাড়া কাউকে ঢুকতে দেবে না। তুমি নিশ্চয়ই আমাদের এমপ্লয়ি।
ঈশিতা মাথা নাড়ল। বলল, হ্যাঁ। আমি কি এখন যেতে পারি? ছোট একটা ইমার্জেন্সি ছিল।
তুমি অবশ্যই যাবে রাইসা সুলতানা। কিন্তু আমাকে এক সেকেন্ড সময় দাও। এখানে যাদের নেওয়া হয়েছে, আমি তাদের সবার ইন্টারভিউ নিয়েছি। সবার চেহারা আমি মনে রেখেছি। তোমার চেহারাও আমার মনে আছে, তোমাকেও আমি দেখেছি। কিন্তু খুব আশ্চর্যের ব্যাপার কি জানো? ঈশিতার শরীর শীতল হয়ে আসতে থাকে। চেষ্টা করে বলল, কী?
তোমাকে আমি ইন্টারভিউ বোর্ডে দেখিনি। তোমাকে আমি দেখেছি আমার অফিসে। আমি তোমার ইন্টারভিউ নিইনি, তুমি আমার ইন্টারভিউ নিয়েছিলে।
ঈশিতা স্থির চোখে বব লাস্কির দিকে তাকাল। সে ধরা পড়ে গেছে। একেবারে শেষ মুহূর্তে সে ধরা পড়ে গেছে। বব লাস্কি নিচু গলায় বলল, রাইসা সুলতানা কিংবা যেটি তোমার আসল নাম—তুমি কি আমার সঙ্গে একটু ভেতরে আসবে? এটি একটি ভদ্রতার কথা, কারণ তুমি যদি আসতে চাও, তোমাকে জোর করে নেওয়া হবে। ওই দেখো দুজন সিকিউরিটি আমার ইঙ্গিতের জন্য দাঁড়িয়ে আছে।
ঈশিতা খুব সাবধানে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
০৮. বড় কালো একটা টেবিল
বড় কালো একটা টেবিলের এক মাথায় ঈশিতা বসে আছে। অন্য মাথায় বসেছে বব লাস্কি। ঈশিতার ঠিক পেছনে দুজন পাহাড়ের মতো মানুষ দাঁড়িয়ে আছে, একজন ধবধবে সাদা, অন্যজন কুচকুচে কালো। টেবিলের দুই পাশে বেশ কিছু মানুষ, সবাই বিদেশি। ঈশিতা তাদের অনেককেই চিনতে পারল, একটু আগে সে তাদের ধোকা দিয়ে ছবি এবং ভিডিও তুলে এনেছিল। মানুষগুলো এক ধরনের বিস্ময় নিয়ে ঈশিতার দিকে তাকিয়ে আছে।
বব লাস্কি একটু সামনে ঝুঁকে বলল, বলো মেয়ে, তুমি কেমন করে এনডেভারে ঢুকেছ?
ঈশিতা কোনো কথা না বলে স্থির দৃষ্টিতে বব লাস্কির দিকে তাকিয়ে রইল। মুখে দাড়ি-গোঁফের জঙ্গল মানুষটি বলল, বব, সে এখানকার এমপ্লয়ি। তার সর্বোচ্চ সিকিউরিটি ক্লিয়ারেন্স আছে। সে সেন্ট্রাল দরজা দিয়ে হেঁটে ঢুকে গেছে।
বব লাস্কি বলল, এটুকু আমিও জানি। কিন্তু সমস্যা হলো, সে এখানকার এমপ্লয়ি না। আমরা তাকে এখানে চাকরি দিইনি, সিকিউরিটি ক্লিয়ারেন্স তো দূরের কথা।
দাড়ি-গোঁফের জঙ্গল বলল, আমি নিজের চোখে দেখেছি, তার সিকিউরিটি ক্লিয়ারেন্স আছে।
আমি সেটাই জানতে চাচ্ছি, কেমন করে আমাদের সিস্টেম তাকে এত বড় ক্লিয়ারেন্স দিল। কে দিল?
টেবিলের এক কোনায় একজন একটা ল্যাপটপে ঝুঁকে কাজ করছিল। সে বলল, আমাদের কেউ দেয়নি, স্যার। আমি পুরো সিস্টেম চেক করেছি।
বব লাস্কি টেবিলে থাবা দিয়ে বলল, তাহলে কে দিয়েছে?
মানুষটা ল্যাপটপে আরও ঝুঁকে পড়ে বলল, আমাকে দুই মিনিট সময় দেন, স্যার। আমি সিস্টেমের পুরো লগ বের করে আনছি। ঠিক কীভাবে সে সিকিউরিটি ক্লিয়ারেন্স পেয়েছে, আমি বের করে ফেলছি।
বব লাস্কি এবার ঈশিতার দিকে তাকিয়ে বলল, আমি আমার রেকর্ড থেকে বের করে দেখেছি, তোমার নাম হচ্ছে ঈশিতা। তুমি আমার ইন্টারভিউ নিতে এসেছিলে।
ঈশিতা কোনো কথা বলল না। বব লাস্কি বলল, এনডেভার একটা প্রাইভেট কোম্পানি। এখানে বাইরের কেউ ঢোকার কথা নয়। তুমি এখানে ঢুকে পুরোপুরি বেআইনি কাজ করেছ।
