কার অর্ডার?
আমার কমান্ডারের।
আপনার কমান্ডারের অর্ডার আপনার জন্য আমার জন্য নয়। আপনি সরে দাঁড়ান আমি ভিতরে ঢুকব।
মানুষটি নিশীতার কথা শুনে এত অবাক হল যে, সে প্রথমে রেগে উঠতেই ভুলে গেল। খানিকক্ষণ হাঁ করে নিশীতার দিকে তাকিয়ে হঠাৎ সে রেগে উঠল, নিশীতার কথার জন্য যেটুকু তার চাইতে অনেক বেশি একজন মেয়ে হয়ে একজন পুরুষের সাথে এই ভাষায় কথা বলার জন্য। মানুষটি প্রায় চিৎকার করে বলল, এখান থেকে যান। না হলে–
না হলে কী?
না হলে ঝামেলা হবে।
কী ঝামেলা?
মানুষটি মুখ খিঁচিয়ে বলল, আমি আপনার সাথে রং-তামাশা করার জন্য এখানে দাঁড়িয়ে নেই। এখান থেকে যান এটা আমার অর্ডার। তারপর দাঁত চিবিয়ে নিচু স্বরে এক দুটি শব্দ বলল যেটা নিশ্চিতভাবেই মেয়েদের সম্পর্কে একটি কুৎসিত গালি।
নিশীতা শীতল চোখে মানুষটির দিকে তাকাল, হঠাৎ করে মনে হল তার মাথার ভিতরে একটা বিস্ফোরণ ঘটে গেছে। সে নিশ্বাস আটকে রেখে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করতে থাকে। মানুষটি এবার তার দিকে প্রায় এক পা এগিয়ে এল, ভাবভঙ্গি দেখে মনে হয় তার গায়ে হাত দিয়ে ধাক্কা দেবে। নিশীতা খুব ধীরে ধীরে তার মাথায় হেলমেটটি পরে নেয়, তারপর স্টার্টারে কিক দিয়ে সেটাকে চালু করা মোটর সাইকেলটিকে ঘুরিয়ে নেয়। রিয়াজের বাসা থেকে এক শ গজ দূরে গিয়ে সে মোটর সাইকেলটি আবার ঘুরিয়ে রিয়াজের বাসার। দিকে মুখ করে দাঁড়াল। গেটের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটি তখনো বুঝতে পারছে না। নিশীতা কী করার পরিকল্পনা করছে।
নিশীতা ক্লাচে পা দিয়ে মোটর সাইকেলের এক্সেলেটারে চাপ দিয়ে ইঞ্জিনের গর্জনটা শুনে নিল। তার সুজুকি এক্সএল ২০০ এই এক শ গজে প্রায় আশি মাইল বেগ তুলতে
পারবে, তাকে নিয়ে মোটর সাইকেলের যে ভরবেগ হবে সেটা দিয়ে খুব সহজেই পলকা গেটটাকে কজা থেকে খুলে নিতে পারবে। রিয়াজের বাসার সামনে প্রচুর ফাঁকা জায়গা, একবার ভিতরে ঢোকার পর সে সহজেই মোটর সাইকেল থামিয়ে নিতে পারবে।
নিশীতা ক্লাচ ছেড়ে দিয়ে এক্সেলেটর ঘুরিয়ে তার সুজুকিকে গর্জন করিয়ে ছুটিয়ে নিয়ে গেল। গেটের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটি কল্পনাও করতে পারে নি যে একজন মানুষ এ রকম একটা কাজ করতে পারে। শেষ মুহূর্তে লাফ দিয়ে সে ছুটন্ত মোটর সাইকেল থেকে নিজেকে রক্ষা করল, নিশীতার সুজুকি এক্সএল ২০০ প্রচণ্ডবেগে গেটে আঘাত করে, হালকা ছিটকিনি ছিটকে গিয়ে গেটটি হাট হয়ে খুলে গেল। প্রচণ্ড শব্দে পুরো এলাকা কেঁপে ওঠে এবং এর মাঝে নিশীতা তার মোটর সাইকেল নিয়ন্ত্রণ করে একেবারে বাসার দোরগোড়ায় এসে মোটর সাইকেলটিকে থামাল।
বাইরের ঘরে আলো জ্বলছে, সেখানে বেশ কিছু মানুষ, গেট ভাঙার প্রচণ্ড শব্দ শুনে সবাই জানালা এবং দরজার কাছে এসে দাঁড়িয়েছে। নিশীতা তার হেলমেট খুলে মোটর সাইকেলের ওপর রেখে সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে এল। তার বুকের ভিতর হৃৎপিণ্ড ধকধক শব্দ করছে কিন্তু সে জোর করে মুখের ওপর কিছুই হয় নি এ রকম একটা ভাব ধরে রাখল। গেটের মানুষটা এবং আরো অনেকে তার পিছনে পিছনে ছুটে আসছে টের পেলেও সে পিছনে ফিরে তাকাল না।
বাইরের ঘরের মাঝামাঝি রিয়াজ বসে আছে, তাকে ঘিরে কয়েকজন সাদা পোশাকের পুলিশ কিংবা মিলিটারি। কয়েকজন বিদেশী মানুষ হতচকিত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। নিশীতা সবাইকে পুরোপুরি উপেক্ষা করে রিয়াজ হাসানের দিকে তাকিয়ে বলল, ড. হাসান, আমি খুব দুঃখিত আপনার গেট ভেঙে ঢুকতে হল। গেটে একজন ব্রেন-ডেড মানুষ দাঁড়িয়ে আছে, আমাকে ঢুকতে দিচ্ছিল না!
রিয়াজ হাসান খানিকক্ষণ অবাক হয়ে নিশীতার দিকে তাকিয়ে রইল, তার চেহারায় এক ধরনের বিপর্যস্ত ভাব, নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, আমি–আমি–মানে ঠিক বুঝতে পারছি না কী হচ্ছে।
রিয়াজ হাসানকে ঘিরে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোর মাঝে একজন এবারে নিশীতার দিকে এগিয়ে আসে, দেখে মনে হয় মানুষটি ইন্টেলিজেন্সের বড় কর্মকর্তা, মানুষটির মুখ কঠিন, চোখের দৃষ্টি ক্রুদ্ধ। মানুষটি শীতল গলায় বলল, আপনি কে? এখানে কেন এসেছেন?
নিশীতা মাথা ঝাঁকিয়ে তার চুলকে পিছনে সরিয়ে বলল, আমি ডঃ রিয়াজ হাসানের বাসায় এসেছি, তিনি যদি চান তা হলে তিনি আমাকে এই প্রশ্নটি করতে পারেন–আপনি পারেন না। নিশীতা তার মুখে একটা মধুর হাসি টেনে বলল, কিন্তু আপনি যদি সত্যি জানতে চান আমি বলতে পারি। আমার নাম নিশীতা জানীন। আমি একজন সাংবাদিক।
নিশীতা তার গলায় ঝুলিয়ে রাখা কার্ডটি বের করে মানুষটিকে দেখাল এবং প্রথমবার মানুষটিকে একটু হতচকিত হতে দেখা গেল। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একজন মানুষ বলল, আপনাকে আজ বিটিভিতে দেখেছি। প্রাইম মিনিস্টারের নিউজ কনফারেন্সে আপনি ছিলেন।
তাকে টেলিভিশনে দেখিয়েছে তথ্যটি নিশীতা জানত না, আজকের পরিবেশে এই তথ্যটি খুব কাজে লাগবে ভেবে নিশীতা মনে মনে খুশি হয়ে উঠল। মুখের হাসি বিস্তৃত করে বলল, হ্যাঁ ছিলাম। প্রাইম মিনিস্টার আমাকে খুব পছন্দ করেন।
গেটে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটি এতক্ষণে ভিতরে হাজির হয়েছে, সাহস করে এবার বলার চেষ্টা করল, স্যার এই মহিলা জোর করে—
কঠিন চেহারার মানুষটি সম্পূর্ণ বিনা কারণে তাকে একটা প্রচণ্ড ধমক দিয়ে বলল, শাট আপ, ইউ স্টুপিড। যাও এখান থেকে। গেট আউট।
