নিশীতা নিশ্বাস বন্ধ করে খবরটা কয়েকবার পড়ে ফেলল। তাকে কেউ বলে দেয় নি কিন্তু সে একেবারে নিশ্চিত হয়ে যায় এটিও ঠিক আগের মতো একটি মহাকাশযান। ব্যাপারটি নিয়ে কারো সাথে কথা বলতে পারলে হত কিন্তু সেরকম একজন মানুষও নেই। একটা মহাকাশযান পৃথিবীতে চলে এসেছে এই কথাটি গুরুত্ব দিয়ে শুনেছে, হেসে উড়িয়ে দেয় নি সেরকম একমাত্র মানুষ হচ্ছে রিয়াজ হাসান। কিন্তু রিয়াজ হাসানও কোনো একটা বিচিত্র কারণে এই ব্যাপারটায় মাথা ঘামাতে চাইছে না। নিশীতা নাশতার টেবিলে বসে চা খেতে খেতে ঠিক করে ফেলল সে আবার রিয়াজ হাসানের সাথে দেখা করতে যাবে।
তাড়াহুড়ো করে বের হয়ে সে তার মোটর সাইকেলে বসতেই তার সেলুলার ফোন বেজে উঠল, বাংলাদেশ পরিক্রমার সম্পাদক মোজাম্মেল হক ফোন করেছেন। দুপুর বারোটার সময় প্রধানমন্ত্রীর সাংবাদিক সম্মেলন, তাকে যেতে হবে। তথ্যপ্রযুক্তির নতুন ইনস্টিটিউট তৈরি হবে, সাংবাদিক সম্মেলনে সে ব্যাপারে একটি মহাপরিকল্পনার কথা ঘোষণা করা হবে। মোজাম্মেল হক নিশীতাকে দায়িত্ব দিলেন তথ্যপ্রযুক্তির ক্ষেত্রে যেসব সমস্যা আছে সেগুলো আগে থেকে জেনে নিতে, সাংবাদিক সম্মেলনে যেন ঠিকভাবে প্রয়োজনীয় প্রশ্ন করতে পারে। নিশীতা মনে মনে একটা হিসাব করে বুঝতে পারে রিপোর্টটি লিখে শেষ করে জমা দিয়ে রিয়াজ হাসানের কাছে যেতে যেতে তার রাত হয়ে যাবে। এমনও হতে পারে যে আজ হয়তো যেতেই পারবে না।
নিশীতা মাথা থেকে রহস্যময় আলোর রেখা ব্যাপারটি এক রকম জোর করে সরিয়ে দিয়ে মোটর সাইকেলে চেপে বসল, কয়েক মুহূর্ত পরেই দেখা গেল তার সুজুকি এক্স এল ২০০ গর্জন করে বিজয় সরণি দিয়ে ছুটে চলছে।
প্রধানমন্ত্রীর সাংবাদিক সম্মেলনটি খুব প্রাণবন্ত সম্মেলন হল, এতজন প্রবীণ সাংবাদিকের মাঝে তাকে প্রশ্ন করার সুযোগ দেওয়া হবে কি না সে ব্যাপারে নিশীতার একটু সন্দেহ ছিল,
কিন্তু শার্ট-প্যান্ট পরা মেয়ে বলেই কি না কে জানে, প্রধানমন্ত্রী তাকে বেশ সুযোগ দিলেন। জনশক্তি নিয়ে নিশীতার প্রশ্নটি ছিল খুব সুন্দর এবং একেবারে যথাযথ উত্তর দিতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রীরও একটু চিন্তা করতে হল।
সাংবাদিক সম্মেলনের রিপোর্টটা টাইপ করে জমা দিয়ে বার্তা সম্পাদকের সাথে কথা বলে সে যখন পত্রিকা অফিস থেকে বের হয়েছে তখন রাত দশটা, রিয়াজ হাসানের বাসায় যাবার জন্য বেশ দেরি হয়ে গেছে। পরদিন সকালেই যাবে ঠিক করে সে যখন তার মোটর। সাইকেলে বসেছে তখন তার সেলুলার ফোনটি আবার বেজে উঠল, নিশীতা অবাক হয়ে দেখল টেলিফোন নম্বরের জায়গায় বিচিত্র তারকা চিহ্ন! সে ফোনটি কানে লাগাতেই শুনল পুরুষ কণ্ঠে কেউ একজন বলল, নিশীতা?
গলার স্বরটি সে আগে শুনেছে কিন্তু কোথায় শুনেছে মনে করতে পারল না। নিশীতা ভুরু কুঁচকে বলল, হ্যাঁ, কথা বলছি।
আপনি কি এক্ষুনি আসতে পারবে?
আমি? কোথায় আসব?
আপনি বুঝতে পারছেন না?
না। বুঝতে পারছি না।
রিয়াজ হাসানের কথা মনে আছে?
আছে। অবশ্যই মনে আছে। কী হয়েছে তার?
নিশীতার প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে মানুষটি বলল, আপনি কি তার বাসায় আসতে পারবেন?
মানুষটির কথোপকথনে একটা বিচিত্র ব্যাপার রয়েছে কিন্তু সেটি কী নিশীতা ঠিক ধরতে পারল না। কিন্তু এই মুহূর্তে সেটা নিয়ে সে মাথা ঘামাল না, বলল, আসছি। আমি এক্ষুনি আসছি।
নিশীতার কথা শেষ হবার আগেই অন্য পাশের মানুষটি টেলিফোন রেখে দিল। নিশীতা কয়েক মুহূর্ত টেলিফোনটা হাতে নিয়ে বসে থাকে এবং খানিকটা বিভ্রান্তভাবেই টেলিফোনটা তার ব্যাগে রেখে দিয়ে মোটর সাইকেলের ইঞ্জিন স্টার্ট করল। কিছুক্ষণের মাঝেই দেখা গেল নিশীতার সুজুকি এক্সএল ২০০ গর্জন করে এয়ারপোর্ট রোড ধরে উত্তরার দিকে ছুটে যাচ্ছে।
রিয়াজ হাসানের বাসায় পৌঁছানোর আগেই নিশীতা বুঝতে পারল সেখানে কিছু একটা সমস্যা হয়েছে। তার নির্জন বাসার সামনে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বেশ কিছু গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। অন্ধকারে বোঝা যায় না কিন্তু কেন জানি নিশীতার মনে হল গাড়িগুলোর মাঝে এক ধরনের অশুভ ইঙ্গিত লুকিয়ে রয়েছে।
নিশীতা রিয়াজ হাসানের বাসার সামনে মোটর সাইকেল থামিয়ে গাড়িগুলোর ভিতরে তাকাল। আবছা অন্ধকারে ভালো করে দেখা যায় না, কিন্তু মনে হল ভিতরে পুলিশ কিংবা মিলিটারি। নিশীতা তাদের না দেখার ভান করে গেটের দিকে এগিয়ে যেতেই প্রায় অন্ধকার থেকে একজন মানুষ গেটের সামনে এসে দাঁড়াল, মানুষটি পুলিশ কিংবা মিলিটারির পোশাক পরে নেই কিন্তু তার হাঁটা বা দাঁড়িয়ে থাকার ভঙ্গি দেখেই বোঝা যায় সে সশস্ত্র বাহিনীর লোক।
গেটে দাঁড়ানো মানুষটি নিশীতার পথ আটকে দাঁড়াল, নিশীতা মোটর সাইকেল থামিয়ে মাথা থেকে হেলমেট খুলে নিতেই মানুষটি একটু অবাক হয়ে তার দিকে তাকাল, শার্ট–প্যান্ট এবং হেলমেট পরে থাকায় নিশীতাকে সে মেয়ে ভাবে নি।
নিশীতা মানুষটির দিকে তাকিয়ে বলল, আপনি একটু সরুন আমি ভিতরে যাব।
মানুষটি রুক্ষ গলায় বলল, আপনি এখন ভিতরে যেতে পারবেন না।
কেন?
মানুষটি একটু অবাক হয়ে নিশীতার দিকে তাকাল, তাকে যে এ ব্যাপারে প্রশ্ন করা যায় সে যেন সেটাই বুঝতে পারছে না। খানিকক্ষণ চেষ্টা করে আগের থেকেও রুক্ষ গলায় বলল, কারণ অর্ডার আছে।
