মাটির নিচ থেকে উপরে উঠে দেখতে পেলাম চারদিকে অন্ধকার নেমে এসেছে। আমি এক ধরনের ক্লান্তি অনুভব করতে থাকি হঠাৎ করে নরম একটি বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে ঘুমে অচেতন হয়ে যাবার ইচ্ছে করতে থাকে। আমি শহরের উপকণ্ঠে আমার দুই হাজার তলা অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিঙে আমার ছোট খুপরির মতো ঘরটিতে এসে শরীরের কাপড় না খুলেই উপুড় হয়ে শুয়ে পড়লাম। প্রচণ্ড খিদে পেয়েছে কিন্তু আমার বিছানা থেকে ওঠার ক্ষমতা নেই।
এভাবে কতক্ষণ ঘুমিয়ে ছিলাম আমি জানি না। যখন আমার ঘুম ভেঙেছে তখন বাইরে রাত না দিন তাও আমি জানি না। আমি কোনোমতে বিছানা থেকে উঠে বাথরুমে গিয়ে চোখে–মুখে পানি ছিটিয়ে দিয়ে আমার শোবার ঘরে ফিরে এলাম। ভিডি মডিউলে১৭ একটা লাল বাতি জ্বলছে এবং নিবছে যার অর্থ এখানে আমার জন্য অসংখ্য তথ্য জমা হয়েছে। আমার পরিচিত মানুষ বলতে গেলে নেই এই তথ্যগুলোর বেশিরভাগ নানা ধরনের যন্ত্রপাতি থেকে এসেছে এর মাঝে কখনোই প্রয়োজনীয় কোনো তথ্য থাকে না। আমি একটি বোতাম স্পর্শ করে সেগুলো মুছে দিতে গিয়ে কেন জানি থেমে গেলাম–ঠিক কী কারণ জানি না, আমি তথ্যগুলো দেখতে শুরু করলাম। মাঝে মাঝে সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয় এবং অর্থহীন কাজের মাঝে এক ধরনের অর্থ খুঁজে পাওয়া যায়।
ভিডি মডিউলের বেশিরভাগ তথ্য সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয়–পৃথিবীর যাবতীয় অর্থহীন দ্রব্য মানুষকে গছিয়ে দেওয়ার এক ধরনের অসহনীয় প্রতিযোগিতা ছাড়া সেগুলো আর কিছু নয়। তথ্যগুলোর মাঝে হঠাৎ করে অবশ্য একটি পরিচিত মানুষের একটি ভিডিও ক্লিপ পেলাম, জিগি নামের একজন বাতিকগ্রস্ত মানুষ হলোগ্রাফিক স্ক্রিনে আমার প্রায় বুকের ওপর চেপে বসে চিৎকার করে বলল, কী খবর তোমার ত্রাতুল? তোমার কোনো দেখা নাই?
জিগি আবার অদৃশ্য হয়ে গেল, বাতিকগ্রস্ত এই মানুষটির যে আমার সাথে খুব ঘনিষ্ঠতা আছে তা নয়–আমার পরিচিত বন্ধুবান্ধব বলতে গেলে একেবারেই নেই। জিগির সাথে আমার বন্ধুত্ব হওয়ার কথা নয়, তবুও একটি বিচিত্র কারণে তাকে আমার বন্ধু বলে মনে হয়। জিগির ভেতর যদি বিন্দু পরিমাণও শৃঙ্খলাবোধ থাকত তা হলেই তার প্রায় অস্বাভাবিক মেধাবী মস্তিষ্ক ব্যবহার করে একজন রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের গণিতবিদ কিংবা বিজ্ঞানী হতে পারত। কিন্তু তার প্রাতিষ্ঠানিক কোনো ব্যাপারে এতটুকু কৌতূহল নেই–তার প্রতিভাবান মস্তিষ্ককে প্রকৃতির রহস্য উন্মোচনের কাজে না লাগিয়ে এন্ড্রয়েড আর সাইবর্গের মেটাফাইল খুঁজে বের করার কাজে ব্যস্ত রেখেছে। আমি আরো কিছুক্ষণ ভিডি মডিউলের একঘেয়ে এবং অর্থহীন তথ্যগুলো ঘাঁটাঘাঁটি করতে করতে ক্লান্ত হয়ে গেলাম–ঠিক যখন ভিডি মডিউলটি বন্ধ করে দিচ্ছি তখন হঠাৎ করে একটি ভিডিও ক্লিপে আমার দৃষ্টি আটকে গেল। এলোমেলো চুল, বিষণ্ণ চেহারার একজন যুবকের ত্রিমাত্রিক ছবি ভেসে এসেছে, যুবকটি কয়েক মুহূর্ত আমার দিকে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে তারপর একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, ত্রাতুল, আমি ভ্রাতুল।
আমি ভয়ানক চমকে উঠে তাকালাম, এলোমলো চুলের বিষণ্ণ চেহারার যুবকটিকে আমি চিনতে পারি নি–সে আসলে আমি। আমি বিস্ফারিত দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে রইলাম। দেখতে পেলাম সে একবার দৃষ্টি সরিয়ে নিয়ে আবার ঘুরে তাকাল, কী ভয়ংকর শূন্য একটি দৃষ্টি–সেই দৃষ্টিতে আমার বুকের ভেতরে কী যেন হাহাকার করে ওঠে। সে ক্লান্ত গলায় বলল, আমাদের খুব বিপদ ত্রাতুল। আমার আর রিয়ার। সে একটা নিশ্বাস ফেলে বলল, আমরা কী করব বলবে তুমি?
আমি দেখতে পেলাম এলোমেলো চুলের বিষণ্ণ চেহারার যুবকটি–যে আসলে আমি, হলোগ্রাফিক স্ক্রিন থেকে ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল।
আমি স্তম্ভিত হয়ে বসে রইলাম, দেখতে পেলাম আমার হাত থরথর করে কাঁপছে।
০৬. জিগি
জিগির বাসাটি খুঁজে পেতে আমার খুব কষ্ট হল। সে নানা ধরনের বেআইনি এবং অবৈধ কাজে লেগে থাকে বলে নিজের থাকার জায়গাটি কখনো কাউকে জানাতে চায় না। দরজায় শব্দ করার পরও সে দরজা খোলার আগে নানাভাবে নিশ্চিত হয়ে নিল মানুষটি সত্যিই আমি।
আমাকে দেখে সে প্রয়োজন থেকে জোরে চিৎকার করে বলল, আরে ত্রাতুল–সত্যিই দেখি তুমি! আমি ভেবেছি একটা নিরাপত্তা বাহিনীর এন্ড্রয়েড।
আমি মাথা নাড়লাম, বললাম, না, আমি এন্ড্রয়েড না।
তোমাকে দেখতে এরকম লাগছে কেন? জিগি ভুরু কুঁচকে বলল, দেখে মনে হচ্ছে অনেক দিন তোমাকে কেউ কিছু খেতে দেয় নি?
আমাকে কেন এরকম দেখাচ্ছে তার একটা ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করলাম কিন্তু মুখ খোলার আগেই জিগি চোখ বড় বড় করে বলল, কী মজা হয়েছে জান?
আমি জিজ্ঞেস করার আগেই জিগি বলতে শুরু করল, চতুর্থ মাত্রার হাইব্রিড সাইবর্গের কপোট্রনের বাইরের শেলে দুইটা মডিউলে ক্রস কানেক্ট!
জিগি হা–হা করে আনন্দে উচ্চৈঃস্বরে হাসতে শুরু করল। সাইবর্গের কপোট্রনের ক্রটিতে জিগি যেরকম আনন্দ পেতে পারে আমি সেরকম পেতে পারি না–কিন্তু জিগি সেটা লক্ষ করল বলে মনে হল না। হঠাৎ করে আমাকে ঘরের কোনায় টেনে নিয়ে একটা মাঝারি এন্টেনাকে অনুরণিত করতে শুরু করে বলল, দেখো কী মজা হয়?
সবুজ স্ক্রিনে কিছু সংখ্যা ছোটাছুটি করতে থাকে, আমি সেদিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, কী মজা হবে?
