“কী বলছ তুমি?”
“হ্যাঁ কমান্ডার লী। আমি ত্রাতিনাকে একটু আদর করি? আমি জানি এটা হ্যলুসিনেশান। আমি জানি এটি সত্যি নয়, কিন্তু তবু আমি একটু আদর করি ত্রাতিনাকে?”
কমান্ডার লী কিছু একটা বলতে চাইছিল। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে একশ কিলোটন থার্মো নিউক্লিয়ার বোমাটির প্রচণ্ড বিস্ফোরণে মুহূর্তে সবকিছু ভস্মীভূত হয়ে গেল।
২. দ্বিতীয় পর্ব (ষোল বছর পর)
দ্বিতীয় পর্ব (ষোল বছর পর)
২.০১
অনাথ আশ্রমের ডাইনিংরুমে ছেলে মেয়েরা হই চই করে রাতের খাবার খাচ্ছে। আশ্রমের ডিরেক্টর ক্লারা নিঃশব্দে ডাইনিং রুমের এক কোণায় দাঁড়িয়ে মুখে এক ধরনের কৌতুকের হাসি নিয়ে ছেলেমেয়েগুলোর দিকে তাকিয়েছিল। এই প্রাণোচ্ছল ছেলেমেয়েগুলোকে দেখে ডিরেক্টর ক্লারা মাঝে মাঝে এক ধরনের হিংসা অনুভব করে। এই কমবয়সী ছেলে মেয়েগুলোর কেমন করে এতো প্রাণশক্তি থাকতে পারে? কেমন করে এতো সহজে তারা জীবনটিকে এতো আনন্দময় করে ফেলতে পারে?
ডিরেক্টর ক্লারার মাঝে মাঝেই মনে হয়, অনাথ আশ্রমের দায়িত্ব পাওয়াটি মনে হয় তার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। শুধুমাত্র এজন্যেই বুঝি সারাটি জীবন ছোট ছোট শিশুদের সাথে কাটাতে পেরেছে। তাদেরকে কিশোর-কিশোরী হয়ে উঠতে দেখেছে। তারপর এক সময় তরুণ তরুণী হওয়ার পর বাইরের পৃথিবীতে যাওয়ার জন্যে অশ্রুসজল চোখে তাদের বিদায় দিয়ে এসেছে।
এবারে আরো একটি মেয়েকে বিদায় দেবে। মেয়েটির নাম ত্রাতিনা। ষোল বছর আগে তার মহাকাশচারী মা ক্লারার হাতে এই মেয়েটিকে তুলে দিয়েছিল। এতো বছর পরেও ডিরেক্টর ক্লারা সেই দিনটির কথা ভুলতে পারে না। মহাকাশচারী রায়ীনা তার মেয়েকে রেখে চলে যাচ্ছে, ছোট মেয়েটি কী বুঝেছে কে জানে, সে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছিল। ডিরেক্টর ক্লারা তাকে বুকে চেপে ধরে রেখেছিল। মহাকাশচারী রায়ীনার কী হয়েছিল কে জানে, সে আর কোনোদিন ফিরে আসেনি। ত্রাতিনা অনাথ আশ্রমের অন্য দশজন ছেলেমেয়ের সাথে বড় হয়েছে। মেয়েটি কখনো তার বাবা মায়ের কথা জানতে চায়নি। হয়তো ধরেই নিয়েছে তার মা-বাবার কথা কেউ জানে না। তা না হলে কেন সে অনাথ আশ্রমে থাকবে?
ডিরেক্টর ক্লারা ডাইনিং হলে ত্রাতিনাকে খুঁজে বের করল। মাঝামাঝি একটা টেবিলে আরও কয়েকজন ছেলেমেয়েকে নিয়ে খেতে বসেছে। মেয়েটি মায়ের মতো কালো চুল আর কালো চোখ নিয়ে বড় হয়েছে। হাসিখুশি প্রাণশক্তিতে ভরপুর একটি মেয়ে। ক্লারা লক্ষ্য করল, ড্রিংকিং স্ট্রয়ের ভেতর একটা মটরশুটি ঢুকিয়ে ত্রাতিনা ফুঁ দিয়ে সেই মটরশুটিটি পাশের টেবিলের একজন ছেলের ঘাড়ে ছুঁড়ে দিচ্ছে। ছেলেটি চমকে উঠে তার ঘাড়ে হাত দিয়ে এদিক সেদিক তাকাচ্ছে। তার ঘাড়ে কী এসে আঘাত করছে বুঝতে না পেরে ছেলেটি ঘাড়ে হাত বুলাচ্ছে এবং পাশের টেবিলে অন্য বন্ধুদের নিয়ে ত্রাতিনা হেসে কুটি কুটি হচ্ছে।
ডিরেক্টর ক্লারা আরো একটু এগিয়ে টেবিল থেকে একটা গ্লাস আর একটা চামুচ তুলে নেয়। তারপর চামুচ দিয়ে গ্লাসটাকে টোকা দিয়ে টুং টুং শব্দ করে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করল। ছেলেমেয়েরা ক্লারার এই শব্দটির সাথে পরিচিত। সবাই প্রথমে থেমে গেল, তারপর ক্লারার দিকে তাকিয়ে আনন্দের মতো একটি শব্দ করল।
ডিরেক্টর ক্লারা বলল, “ছেলেমেয়েরা, আমি তোমাদের সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।”
সবাই তখন চুপ করে উৎসুক চোখে তার দিকে তাকায়। ক্লারা হাসি হাসি মুখ করে বলল, “আমি তোমাদের একটা সুসংবাদ দিতে এসেছি।”
সুসংবাদটি কী না শুনেই ছেলেমেয়েগুলো আনন্দে চিৎকার করতে থাকে। ডিরেক্টর ক্লারা হেসে বলল, “সুসংবাদটি না শুনেই তোমরা আনন্দে চিৎকার করছ, ব্যাপার কী?”
একজন বলল, “সুসংবাদটি শুনে আমরা কীভাবে চিৎকার করব, সেটি একটু প্র্যাকটিস করে নিলাম।”
অন্যেরা বলল, “বল, বল সুসংবাদটি বল। শুনতে চাই, আমরা শুনতে চাই।”
ডিরেক্টর ক্লারা বলল, “কিন্তু তোমরা শান্ত না হলে আমি কীভাবে বলব?”
সবাই তখন শান্ত হয়ে ক্লারার দিকে তাকিয়ে রইল। ক্লারা সবার দিকে এক নজর তাকিয়ে বলল, “তোমাদের ত্রাতিনা কেন্দ্রীয় মহাকাশ ইনস্টিটিউটে পুরো স্কলারশীপ পেয়ে পড়ার সুযোগ পেয়েছে। এই মাত্র আমি তার খবর পেয়েছি।”
ক্লারা কথা শেষ করার আগেই ডাইনিং হলের ছেলেগুলো শুধু চিৎকার করে শান্ত হলো না। তারা ছুটে এসে ত্রাতিনাকে ধরে হুটোপুটি করতে লাগল। সবাই মিলে তাকে মাথার ওপরে তুলে নিয়ে নাচানাচি করতে থাকে।
ক্লারা আনন্দোৎসবে বাধা দিল না। একটু শান্ত হওয়ার পর সে এগিয়ে গিয়ে ত্রাতিনার মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, “ত্রাতিনা মা, তোমাকে দুই সপ্তাহের মাঝে ইনস্টিটিউটে যোগ দিতে হবে।”
ত্রাতিনা নিঃশব্দে ক্লারার দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর নিচু গলায় বলল, “দুই সপ্তাহ?”
“হ্যাঁ মা। তোমাকে আমাদের বিদায় দিতে হবে। আমরা সবাই তোমার অভাবটুকু অনুভব করব।”
হঠাৎ করে ডাইনিং হলের সব ছেলেমেয়ে চুপ করে যায়। একটি আনন্দ সংবাদের সাথে সাথে যে এরকম একটি বেদনার সম্পর্ক থাকতে পারে সেটি আগে তারা কখনো অনুমান করেনি।
দুই সপ্তাহ পর একটি শীতল, কুয়াশাচ্ছন্ন, বৃষ্টিভেজা দিনে ত্রাতিনা ডিরেক্টর ক্লারার কাছ থেকে বিদায় নিতে গেল। তার হাতে একটা ছোট ব্যাগ, অনাথ আশ্রমের গেটে একটা বাইভার্বাল তাকে পাতাল ট্রেন স্টেশনে নেওয়ার জন্যে অপেক্ষা করছে। সেই বাইভার্বালকে ঘিরে অনাথ আশ্রমের অন্যান্য ছেলেমেয়েরা ত্রাতিনাকে বিদায় দেওয়ার জন্যে দাঁড়িয়ে আছে।
