রায়ীনা তার বুকের ভেতর আটকে থাকা একটা নিঃশ্বাস বের করে দিল। সে পৃথিবীটাকে রক্ষা করতে পেরেছে। পৃথিবীর সাত বিলিয়ন মানুষকে রক্ষা করতে পেরেছে। তার আদরের ত্রাতিনাকে রক্ষা করতে পেরেছে। রায়ীনা ভেসে ভেসে কন্ট্রোল ঘরে ফিরে আসে। তাকে এখন দশ মিনিট অপেক্ষা করতে হবে। দশ মিনিট অনেক সময়। এই দশ মিনিট সময় সে কেমন করে কাটাবে?
রায়ীনা তার সিটে কিছুক্ষণ নিঃশব্দে বসে রইল। তারপর প্রায় হঠাৎ করেই ঠিক করল, সে গ্রহকণাটিতে নামবে। যে কোনো হিসেবে কাজটি অনেক বিপজ্জনক। কিন্তু যখন দশ মিনিটেরও কম সময়ে একশ কিলোটনের একটা থামো নিউক্লিয়ার বোমার বিস্ফোরণে সবকিছু ভস্মীভূত হয়ে যাবে, তখন বিপজ্জনক আর নিরাপদ অবস্থার কোনো অর্থ নেই।
রায়ীনা ইলন শাটলের দরজা খুলে একটা লাফ দিয়ে নিচে নেমে এলো। গ্রহকণার সাথে ধাক্কা খেয়ে সে প্রায় উড়ে যাচ্ছিল। কোনোভাবে একটা সুচালো পাথরকে ধরে সে নিজেকে থামাল এবং কোনোভাবে নিজের পায়ের উপর দাঁড়ানোর চেষ্টা করল। শেষ পর্যন্ত সে যখন নিজের পায়ের উপর দাঁড়াতে পারল, তখন হঠাৎ করে সে অত্যন্ত বিচিত্র একটা জিনিস লক্ষ্য করল। গ্রহকণাটি থরথর করে কাঁপছে। মনে হচ্ছে, এর ভেতরে একটা শক্তিশালী ইঞ্জিন কাজ করছে। কী আশ্চর্য! সে যে চিন্তাটি জোর করে মাথা থেকে সরিয়ে দিয়েছিল, সেই চিন্তাটিই সঠিক। এটি একটি গ্রহকণা নয়। এটি পৃথিবীর দিকে ছুটে যাওয়া বিশাল একটি মহাকাশযান।
রায়ীনা কয়েক মুহূর্ত স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। সে ঠিক ভাবে চিন্তা করতে পারছিল না, কষ্ট করে সে নিজেকে শান্ত করল। তারপর নিচু গলায় ডাকল, “কমান্ডার।”
প্রায় সাথে সাথে রায়ীনা কমান্ডার লীয়ের গলার স্বর শুনতে পেলো।”বল রায়ীনা।”
“থামো নিউক্লিয়ার বোমাটি বিস্ফোরণের জন্যে প্রস্তুত করা হয়েছে। এটি আর সাত মিনিট তেতাল্লিশ সেকেন্ডের মাঝে বিস্ফোরিত হবে।”
কমান্ডার লী বলল, “আমরা জানি। তোমার প্রতি কৃতজ্ঞতা রায়ীনা। পৃথিবীর মানুষ হয়তো কখনোই জানতে পারবে না তুমি কেমন করে তাদের রক্ষা করেছ।”
“তার প্রয়োজনও নেই কমান্ডার।” রায়ীনা এক মুহূর্ত অপেক্ষা করে বলল, “আমি অন্য একটি কারণে তোমার সাথে কথা বলতে চাই।”
“বল রায়ীনা।”
“আমি শুধুমাত্র তোমার সাথে কথা বলতে চাই। সর্বোচ্চ গোপন চ্যানেলে।”
কমান্ডার লী এক মুহূর্তের জন্যে ইতস্তত করল। তারপর বলল, “ঠিক আছে রায়ীনা। আমি গোপন চ্যানেল চালু করেছি। তোমার কথা আমি ছাড়া আর কেউ শুনতে পারবে না। বল তুমি কী বলতে চাও।”
“কমান্ডার লী, আমরা সবাই যেটাকে একটি গ্রহকণা ভেবে আসছি, সেটি আসলে গ্রহকণা নয়।”
কমান্ডার লী কাঁপা গলায় বলল, “তাহলে এটা কী?”
“এটা একটা মহাকাশযান। আমি এর উপর দাঁড়িয়ে আছি এবং এর ইঞ্জিনের কম্পন অনুভব করছি।”
“কী বলছ তুমি?”
“আমি কোনো প্রস্তুতি ছাড়া নেমে এসেছি। তাই ভিডিও চ্যানেলটি চালু করতে পারিনি, তাই তোমাকে দেখাতে পারছি না।”
“তুমি বল, তোমার কথা শুনেই আমি বুঝে নেবার চেষ্টা করছি।”
রায়ীনা অনেকটা ধারাবর্ণনা দেওয়ার মতো করে বলল, “আমি যেখানে দাঁড়িয়ে আছি, সেই জায়গাটা মোটামুটি সমতল, একটু সামনে অনেকগুলো উঁচু নিচু পাথর। আমি সেদিকে এগিয়ে যাই। কারণ—
“কারণ কী?”
“কারণ আমার মনে হচ্ছে ওদিক দিয়ে একটু আলো বের হয়ে আসছে।”
“আলো?”
“হ্যাঁ। নীলাভ আলো। সম্ভবত ওটা এই মহাকাশযানের কন্ট্রোল রুম।”
কমান্ডার লী কাঁপা গলায় বলল, “কন্ট্রোল রুম?”
রায়ীনা একটা বড় পাথর ধরে সামনে এগিয়ে যায়। সাবধানে নিচে দাঁড়িয়ে বলল, “আমার অনুমান সঠিক। একটা চতুষ্কোণ গর্ত থেকে আলো বের হচ্ছে। এটা সম্ভবত ভেতরে ঢোকার দরজা।”
কমান্ডার লী কোনো কথা বলল না। রায়ীনা বলল, “আমি নিচে নামছি।”
“নামো। কী দেখো আমাকে জানাও।”
“জানাব।”
রায়ীনা চতুষ্কোণ ফুটো দিয়ে ভিতরে ঢুকে গেল। একটা সুড়ঙ্গের মতো জায়গা। রায়ীনা হেঁটে যেতেই জায়গাটা আলোকিত হয়ে গেল। সে বড় একটা হলঘরে দাঁড়িয়ে আছে। চারপাশের দেওয়ালে বিচিত্র এক ধরনের কারুকার্য। সেগুলো নড়ছে এবং আকার পরিবর্তন করছে। মাঝে মাঝে কোনো কোনো অংশ আলোকিত হয়ে উঠছে।
হঠাৎ রায়ীনার মাথাটা ঘুরে উঠল। শুনতে পেল কমান্ডার লী তাকে ডাকছে, “রায়ীনা। রায়ীনা, তুমি কোথায়?”
রায়ীনা কোনোমতে নিজেকে সামলে নিল। বলল, “আমি সম্ভবত কন্ট্রোল রুমে। চারপাশে যেগুলো দেখছি সেগুলো সম্ভবত যন্ত্রপাতি, যদিও দেখতে একেবারে অন্যরকম।”
“কোনো এলিয়েন? কোনো প্রাণী?”
রায়ীনা হঠাৎ অনুভব করলো তার পিছনে কিছু একটা এসে দাঁড়িয়েছে। রায়ীনা ঘুরে দাঁড়ালো, এবং সাথে সাথে একটা আর্ত শব্দ করল। রায়ীনা হতবাক হয়ে দেখল, ঘরটার মাঝামাঝি ত্রাতিনা দাঁড়িয়ে অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছে। ত্রাতিনা! তার মেয়ে ত্রাতিনা।
কমান্ডার লী জিজ্ঞেস করল, “কী হয়েছে রায়ীনা? তুমি কী দেখছ?”
“হ্যালুসিনেশান। এই মহাকাশযানের প্রাণী আমাকে নিয়ে খেলছে।”
“কেন? তুমি কী দেখছ?”
“আমার মেয়ে ত্রাতিনা।”
কমান্ডার লী চিৎকার করে বলল, “তোমার মেয়ে ত্রাতিনা?”
“হ্যাঁ। একটু আগে আমার মাথা ঘুরে উঠেছিল। তখন নিশ্চয়ই আমার মস্তিষ্ক থেকে তথ্য নিয়েছে। সেই তথ্য ব্যবহার করে ত্রাতিনাকে তৈরি করেছে। অবিকল ত্রাতিনা।”
