টোটন রেগে বলল, “না। তোর ঠাণ্ডা পানি আনতে হবে না।”
তিতুনি বলল, “তাহলে লবণ পানি। লবণ পানি খেলে মাথা ঠাণ্ডা হয়।”
টোটন দাঁত কিড়িমিড়ি করে বলল, “লাগবে না লবণ পানি।”
তিতুনি মুখটা গম্ভীর করে বলল, “আম্মু। আমার মনে হয় ভাইয়াকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়া উচিত।”
আম্মু চিন্তিত মুখে মাথা নাড়লেন। আব্বু বললেন, “একটা ঘুমের ওষুধ খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিলেই হবে। সকালবেলা ঠিক হয়ে যাবে।”
টোটন বলল, “আমার ঘুমের ওষুধ খেতে হবে না। আমার কিছু হয় নাই। আমি দেখেছি এই ঘরের ভেতরে আরেকটা তিতুনি আছে।”
তিতুনি মুখ গম্ভীর করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল, বলল, “ভাইয়া পাগল হয়ে যাচ্ছে।”
আব্বু বললেন, “আমার কী মনে হচ্ছে জানো?” আম্মু আর তিতুনি একসাথে জিজ্ঞেস করল, “কী?”
“টোটন যেহেতু একেবারে জোর দিয়ে বলছে ঘরের ভেতরে আরেকটা তিতুনি আছে আমাদের তিতুনির ঘরে গিয়ে টোটনকে দেখানো উচিত যে আসলে সেখানে কিছু নাই। তখন টোটন বিশ্বাস করবে।”
তিতুনির মুখটা হাঁ হয়ে গেল। তোতলাতে তোতলাতে বলল, “আ-আ-আমার ঘরে?”
“হ্যাঁ তোর ঘরের দরজাটা খোল দেখি।”
তিতুনি আঁতকে উঠল, “দরজা খুলব?”
“হ্যাঁ। টোটনকে দেখাই তোর ঘর ফাঁকা। আর কেউ নাই।” তিতুনি জানে তার ঘর মোটেও ফাঁকা নয়, তার ঘরে এলিয়েন তিতুনি বসে আছে। ঘরে ঢুকলেই তাকে পেয়ে যাবে। তখন কী ভয়ানক একটা কাণ্ড ঘটবে! বোঝা যাবে টোটনের কথাটাই সত্যি, আসলেই তিতুনি দুইজন। কোনটা খাঁটি কোনটা ভেজাল? কেমন করে কী বোঝাবে? যদি এলিয়েন তিতুনিকে খাঁটি মনে করে তাকে বিদায় করে দেয় তখন কী হবে? ভয়ে-আতঙ্কে তিতুনির হাত-পা কাঁপতে থাকে। সে দুর্বলভাবে তার আব্বকে থামানোর চেষ্টা করল, বলল, “আব্বু আমার ঘরে তোমাদের যাওয়া মনে হয় ঠিক হবে না।”
আব্বু ভুরু কুঁচকে বললেন, “কেন?”
“মানে ইয়ে তাহলে–”, তিতুনি কী বলবে বুঝতে পারছিল না, একটু ইতস্তত করে বলল, “তাহলে ভাইয়ার কথাকে বিশ্বাস করা হলো। ভাইয়াকে বোঝানো হলো উল্টাপাল্টা জিনিস বলা যায়-ভাইয়া আরো বেশি উল্টাপাল্টা জিনিস বলবে। কোনোদিন হয়তো বলবে—”
“কী বলবে?”
“বলবে আমি একটা এলিয়েন।”
“এলিয়েন?” আবু চোখ কপালে তুলে বললেন, “এলিয়েন? তোকে এলিয়েন কেন বলবে?”
আম্মু বললেন, “এত সব কথা না বলে টোটনকে নিয়ে তিতুনির বরে ঢুকে তাকে দেখাও, তাহলে টোটন শান্ত হবে।”
টোটন কাঁপা গলায় বলল, “আমি ঢুকতে চাই না। আমার ভয় করে।”
আব্বু অবাক হয়ে বললেন, “ভয় করে? কিসের ভয়?”
টোটন কাঁদো কাঁদো হয়ে বলল, “জানি না।”
আম্মু বললেন, “কোনো ভয় নাই। আয় আমার সাথে।”
তারপর টোটনের হাত ধরে তিতুনির ঘরের দিকে এগিয়ে গেলেন। প্রথমে আম্মু, তারপর আব্ব, সবার শেষে টোটন। তিতুনি নিঃশ্বাস বন্ধ করে বাইরে দাঁড়িয়ে রইল, যেকোনো মুহূর্তে তার ঘরের ভেতর থেকে ভয়ংকর একটা চিৎকার শোনা যাবে। সবাই আতঙ্কে ঘর থেকে ছুটে বের হয়ে আসবে। তখন সে কী করবে?
তিতুনি তার ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে একটা ভয়ংকর চিৎকারের জন্যে অপেক্ষা করতে থাকে। এক সেকেন্ড, দুই সেকেন্ড, তিন সেকেন্ড-কোনো চিৎকার নেই। দশ সেকেন্ড, বিশ সেকেন্ড, তিরিশ সেকেন্ড-তবু কোনো চিৎকার নেই, বরং খুবই নিরীহ কথা শোনা গেল। আব্বু বললেন, “দেখলি টোটন, এখানে কোনো তিতুনি নেই।”
আম্মু বললেন, “কেমন করে থাকবে? এটা কি সম্ভব?”
টোটন বিড়বিড় করে কিছু একটা বলল, তিতুনি সেই কথাটা ঠিক বুঝতে পারল না।
আব্বু বললেন, “আর কত দেখবি? সব তো দেখা হলো।”
আম্মু বললেন, “এখন বিশ্বাস হলো?”
টোটন আবার বিড়বিড় করে কিছু একটা বলল। তিতুনি এই কথাটাও বুঝতে পারল না। কিন্তু এতক্ষণে তার ভেতরে সাহস ফিরে এসেছে, সে তখন তার ঘরে ঢুকল। ঘরের ভেতর টোটন তখন নিচু হয়ে তার খাটের তলাটা দেখছে। তিতুনি বলল, “ভাইয়া, পেয়েছ আরেকজন তিতুনি?”
টোটন গরগর করে কিছু একটা বলল, যার অর্থ যা কিছু হতে পারে।
তিতুনি সাবধানে চারিদিকে তাকাল, এলিয়েন তিতুনির কোনো চিহ্ন নেই। তিতুনির ভয় কেটে গেছে, সে এবার টোটনকে জ্বালাতে শুরু করল, বলল, “ভাইয়া আমার ব্যাক পেকের ভেতরে দেখতে চাও?”
টোটন বলল, “চুপ কর। পাজি মেয়ে।”
“বালিশের তলায় দেখেছ? ড্রয়ারের ভেতরে?” টোটন চোখ লাল করে ফেলল, “ফাজলেমি করবি না। খবরদার।”
তিতুনি বলল, “কে ফাজলেমি করছে? আমি না তুমি? যদি বলো আমি ছাড়া আরো একজন তিতুনি আছে তাহলে সেটা ফাজলেমি হলো না?”
আম্মু বললেন, “থাক থাক, অনেক হয়েছে।”
আব্বু বললেন, “টোটন, যাও গিয়ে শুয়ে পড়ো।”
টোটনকে খুবই বিমর্ষ দেখাল, বলল, “আমি স্পষ্ট দেখলাম।”
আব্বু বললেন, “যত স্পষ্টই দেখো, এটা সত্যি হতে পারে না। এটা হয় চোখের ভুল না হয় মনের ভুল।”
তিতুনি বলল, “কিংবা মগজের গোলমাল।”
টোটন চোখ লাল করে তিতুনির দিকে তাকাল কিন্তু কিছু বলল না, সে এখন আসলেই মনে করতে শুরু করছে যে তার মগজে গোলমাল হতে শুরু করেছে।
তার ঘর থেকে সবাই বের হয়ে যাবার পর তিতুনি দরজা বন্ধ করে ছিটকিনি লাগিয়ে একটা বড় নিঃশ্বাস ফেলে তার বিছানার উপরে বসে এদিক-সেদিক তাকাল। সামনের দরজাটা ছাড়া এই ঘর থেকে বের হওয়ার কোনো উপায় নেই, আবার মেয়েটা এই ঘরেও নেই। তাহলে মেয়েটা গেল কোথায়?
